২৭ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাহে রমাদানুল মুবারক ও সিয়াম

  • প্রসঙ্গ ইসলাম

(গত ১০ মে-এর পর)

অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম ॥ সিয়াম পালনের যে বিধান আল্লাহ জাল্লা শানুহু প্রদান করেছেন তাতে উল্লেখ রয়েছে যে, পূর্ব যামানার লোকদের ওপরও এ বিধান বলবত ছিল। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাব ইয়াহুদী, নাসারা, হিন্দু পারসিকদের মধ্যে এ ধরনের রীতি চালু আজও বিদ্যমান। সেগুলোর বৈশিষ্ট্য দেখে মনে হয় তার আদিকালের বৈশিষ্ট্য আর এখন নেই।

ইসলামে সিয়ামের যে বিধান রয়েছে তা সত্যিকার অর্থে সংযমী হওয়ার, আত্ম উন্নয়ন করার, আত্মশুদ্ধি অর্জন করার, সহমর্মিতা অর্জন করার, সাবধানী জীবন লাভ করার, ধৈর্যশীল ও বিনয়ী হওয়ার প্রশিক্ষণ প্রদান করে। সিয়ামকে ফরয করে যে আয়াতে কারীমা প্রথমে নাযিল হয় তাতে দেখা যায়, সিয়াম পালন করাকে আল্লাহ জাল্লা শানুহু এজন্য ফরয করেছেন যে, এর দ্বারা সিয়াম পালনকারী তাকওয়া অবলম্বনে অভ্যস্ত হতে পারবে।

ইসলাম হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত এবং মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এ জীবনব্যবস্থা মানুষকে প্রগতিশীল করে তোলে, মানুষকে সত্য সুন্দর পথে পরিচালিত করে এবং পরিপূর্ণ মানবিক মূল্যবোধে মানুষকে উজ্জীবিত করে, এ জীবনব্যবস্থা আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সুদৃঢ় করে, এ জীবনব্যবস্থা ধারণ এবং এর বিধি-বিধান পালন করার মধ্য দিয়েই কেবল আল্লাহর মনোনীত বান্দায় উন্নীত হওয়া যায়। এ জীবনব্যবস্থা অনুযায়ী তাকওয়া অবলম্বন করা অবশ্য কর্তব্য। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে প্রিয়নবী সাল্লালাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন : হে লোক সকল! তোমরা শোন, আজ আমার পদতলে অন্ধকার যুগের সমস্ত কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, অনাচার, শিরক, কুফর দলিত হলো। তিনি তাঁর সেই ভাষণে এও বলেন : হে লোক সকল! তোমরা শোন, কোন অনারবের ওপর কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন আরবের ওপর কোন অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন কালোর ওপর কোন সাদার শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন সাদার ওপর কোন কালোর শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সবাই আদম থেকে এবং আদম মাটি থেকে। শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া। একবার ফারুকে আযম উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু বিশিষ্ট সাহাবী হযরত উবায় ইবনে কা’ব রাদিআল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে তাকওয়ার সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা জানতে চাইলে তিনি তাঁকে পাল্টা জিজ্ঞাসা করলেন : আপনি কি কখনও কণ্টকাকীর্ণ-রাস্তা অতিক্রম করেছেন? হযরত উমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু বললেন : হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন : কিভাবে সেই রাস্তা অতিক্রম করলেন। হযরত উমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু বললেন : অতি সাবধানতার সঙ্গে দ্রুত সে পথ পারি দিয়েছি। হযরত উবায় ইবনে কা’ব রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু তখন বললেন : এটাই তাকওয়া। এ বিবরণ থেকে আমাদের সামনে তাকওয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা উদ্ভাসিত হয়ে যায়। এর দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সাবধানতার সঙ্গে জীবন পরিচালনা করাই হচ্ছে তাকওয়া।

ইসলামে পরিপূর্ণভাবে দাখিল হতে হলে অবশ্যই তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে। রমাদানুল মুবারকে সিয়াম পালনের মাধ্যমে সেই তাকওয়া অবলম্বনের প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ লাভ করার সুযোগ লাভ করে সিয়াম পালনকারী। যা করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, আল্লাহর রসূল নারাজ হন এমন কাজ না করার মধ্যে তাকওয়ার তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। তাকওয়া অবলম্বনের মূল অর্থ হচ্ছে : হালালকে গ্রহণ করা, হারামকে বর্জন করা, সকল প্রকার গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা, সন্দেহযুক্ত জিনিস ও কর্ম পরিহার করা, আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করা এবং আল্লাহর নিকট সত্যিকার অর্থে আত্মসমর্পণ করা। প্রিয়নবী সাল্লালাহু অলায়হি ওয়া সাল্লাম সিয়ামকে জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করার ঢাল বলে অভিহিত করেছেন।

তিনি বলেছেন : সিয়াম জাহান্নামের আগুনের ঢালস্বরূপ, যতক্ষণ সায়িম সিয়াম ত্যাগ না করে। ঢাল যেমন তীর, তলোয়ার প্রভৃতির আঘাত প্রতিহত করে তেমনি সিয়াম জাহান্নামের আগুনকে প্রতিহত করে (ইবনে মাজাহ)।

হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহ্ তাআলা আন্্হু বর্ণিত একখানি হাদিসে আছে যে, হযরত রসূলুল্লাহ্ সাল্লালাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ করে বলেন, আল্লাহ্ তাআলা আমার উম্মতকে রমাদান মাসে বিশেষ পাঁচটি জিনিস দান করেন যা অন্য কোন নবীর উম্মতকে দান করেননি। আমার সিয়াম পালনকারী উম্মতের মুখের গন্ধ আল্লাহ্র নিকট মিস্কের সুগন্ধি থেকেও অধিক সুগন্ধি, তাদের জন্য রমাদান মাসে সব জীব-জন্তু এমন কি পানির মাছও কল্যাণ কামনা করে।

প্রত্যেকটি জান্নাতকে সুসজ্জিত করে আল্লাহ্ তাআলা বলেন : আমার বন্ধুরা সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে অতিসত্বর তোমাদের দিকে আসছে। রমাদান মাসে শয়তানকে বন্দী করে রাখা হয়, ফলে সে অন্য মাসের মতো মুমিন বান্দাদের প্ররোচিত করতে পারে না, রমাদানের শেষ রাতে আল্লাহ্ তাআলা সিয়াম পালনকারীদের ক্ষমা করেন (বায়হাকী)। রমাদানের সিয়ামের পাশাপাশি সেহরি, ইফ্্তার ও তারাবির গুরুত্বও অপরিসীম। এই রমাদান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফ করার মধ্যে অশেষ সওয়াব রয়েছে। বিশেষ করে লায়লাতুল কদরকে ইতিকাফের মাধ্যমে অন্বেষণ করা সহজ হয়। যুগ শ্রেষ্ঠ সূফী কুতবুল আলম হযরত মওলানা শাহসূফী তোয়াজউদ্দীন আহমদ রহমাতুল্লাহি ‘আলায়হি বলেছেন : ইতিকাফ হালতে শবে কদরকে অতি নিকট থেকে অবলোকন করা যায়।

লায়লাতুল কদর উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর একটা খাস উপহার। এই রাত ইবাদত বন্দেগীর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে পারলে হাজার মাস ধরে লাগাতার ইবাদত-বন্দেগী করলে যে সওয়াব পাওয়া যেত তার চেয়েও অধিক সওয়াব লাভ হয়। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : লায়লাতুল কাদ্রী খায়রুম্ মিন্ আলফি শাহ্র- লায়লাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেয়।

মাহে রমাদানে দান-খয়রাত করলে ৭০ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। মাহে রমাদানে সিয়াম পালনের পাশাপাশি যে কোন ভাল কাজ করলে অশেষ সওয়াব লাভের সুযোগ আসে। যে কারণে আরবী চান্দ্রসনের নবম মাস এই রমাদান সর্বাধিক মুবারক মাসের এবং সর্বোত্তম মাসের বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। রমজান শব্দটি মূলত আরবী রমাদান শব্দের ফার্সী উচ্চারণ। রমাদান শব্দের শব্দমূল হচ্ছে রমদ যার অর্থ গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপ, পোড়ানো ইত্যাদি। সিয়াম পালনের মাধ্যমে সিয়াম পালনকারী তার পাপরাশি পোড়াতে সমর্থ হয় এই মাসে। রমাদান ও সিয়ামের মাহাত্ম্য সেখানেই এবং এর তাৎপর্য এরই মধ্যে নিহিত রয়েছে।

(সমাপ্ত)

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ