১৬ মে ২০১৯

রণাঙ্গনে মুক্তিফৌজের ব্যাপক সাফল্য ॥ ১৭ মে, ১৯৭১

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ ॥ ১৯৭১ সালের ১৭ মে দিনটি ছিল সোমবার। এই দিন মুক্তিবাহিনীর ৬০ জন যোদ্ধার একটি দল হাজীগঞ্জ থানা আক্রমণ করে। মুক্তিযাদ্ধাদের এই অভিযানে দু’জন পুলিশ ও নয় জন রাজাকার নিহত এবং বহু অস্ত্র উদ্ধার হয়। ৮ নং সেক্টরের অংশ হিসেবে কলারোয়া উপজেলার মুক্তিপাগল জনতাও পিছিয়ে ছিল না জীবন দেয়া-নেয়ার এই মহোৎসবে। একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে ৭ জন ছাত্র ও একজন সাধারণ কৃষক, যারা সবাই ছিল ফরিদপুর এলাকার। খুলনা-চুকনগর-মনিরামপুর-কেশবপুর হয়ে হেঁটে বিশ্রাম নিতে যাত্রা বিরতি করে কলারোয়া উপজেলার বামনখালি বাজারে। বামনখালি বাজারে তখন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল ডাক্তার মোকছেদ আলী নামক এক ‘শান্তি কমিটির সদস্য’। সে এদেরকে ধরে ফেলে এবং মুক্তিফৌজ হিসেবে চিহ্নিত করে। তখন এদের মধ্য থেকে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় ৩ জন ছাত্র। যারা তৎকালীন সময়ে দৌলতপুর বিএল কলেজের ছাত্র ছিল। তখন নরঘাতক ডাঃ মোকছেদের মরণথাবা এড়াতে সক্ষম হয়নি হতভাগ্য অধ্যাপকসহ ৪ ছাত্র ও ১ জন কৃষক। পাকিপ্রেমী মোকছেদ এদেরকে কলারোয়া থানার তৎকালীন মেজ দারোগা আব্দুস সালামের হাতে তুলে দেয়। বেলা ১০টার দিকে গণহত্যকারী হানাদার বাহিনীর একটি কনভয় থানা অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ ও মেজ দারোগা সালামের সঙ্গে অসংখ্য বাঙালীর রক্তস্নাত এই পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনের কয়েক মিনিটের কথোপকথনের মধ্যে নির্ধারিত হয়ে যায় হতভাগ্য ৫ জনের বিধিলিপি। হতভাগ্যদের দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো পাশাপাশি। ক্যাপ্টেনসহ এগিয়ে এলো ইতোপূর্বে উল্লিখিত ২ অবাঙালী পুলিশ কনস্টেবল, রাজাকার কমান্ডার নুরুল হক, ওমর আলি, আবু তালেবসহ অপর ৩ পাঞ্জাবী নরপশু। ক্যাপ্টেনের মুখ দিয়ে ‘তোম লোগ তৈয়ার হো যাও, পাকিস্তানকা দুশমনপর গোলি মার দো’। মুহূর্তের মধ্যে প্রায় একইসঙ্গে গর্জে উঠল ৬টি রাইফেল। গর্তের মধ্যে লুটিয়ে পড়ল ৫ জন বাঙালীর দেহ। এদিন পূর্ব পাকিস্তানের গবর্নর টিক্কা খান উপসামরিক আইন প্রশাসকদের পুলিশ অফিসার বা ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা ব্যবহারের অধিকার প্রদান করেন। এই ক্ষমতাবলে তারা যে- কোন ব্যক্তিকে আটক করে হাজতে প্রেরণ, সিভিল প্রিজনে প্রেরণ ও গ্রেফতারসহ অপরাধের তদন্ত করতে পারেন। এই কুখ্যাত আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্টসহ কোন আদালতে কেউ আপত্তি উত্থাপন করতে পারবে না। এদিন জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন সামাজিক কমিটিতে বলেন, ভারতে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী আগমনের ফলে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল ভারত-পাকিস্তানের সমস্যা নয়, একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সাবেক এমএনএ আবুল কাশেমের ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসভবনে শান্তি কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর জেনারেল (অব.) ওমরাহ খান সভাপতিত্ব করেন। এদিন শান্তি কমিটির নাম পরিবর্তন করে ‘শান্তি ও সংহতি কমিটি’ নামকরণ করা হয়। দেওয়ান ওয়ারাসাত আলী খান, সুলেমান ওসমানী, আনোয়ারুল হক, সাবির আলী, নইম মালিক এবং এ.এইচ. মালিককে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির নির্বাহী পরিষদে কো-অপ্ট করা হয়। দেওয়ান ওয়ারাসাত আলী খান, সৈয়দ খাজা খয়রুদ্দিন, শফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক গোলাম আযম, আফতাব আহমদ খান, আবুল কাশেম, মোঃ সাব্বির আলী, জহুর আহমদ, মেজর (অব.) আফসার উদ্দিন, এ. কে. রফিকুল হাসান, মোজাফফর আহমদ, এ.এ.মল্লিক, এস.এম.জিয়াউল হক, আফতাব আহমদ সিদ্দিকী, এ.এইচ. মালিক, মেঃ নুরুল আঈন, আনকার মালিক, মকবুল ইকবাল, এস.এইচ. হাসান, এ.এন.মালিক, আয়েশারুল হক, আখতার হামিদ খান, হাসান রাজা, সুলমান ওসমানী ও তোহা বিন হাবিবকে নিয়ে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট প্রাদেশিক শান্তি কমিটির সাধারণ পরিষদ গঠন করা হয়। একাত্তরের এই দিন দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় ‘মুক্তিফৌজ এখনও প্রচন্ড লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুভপুর সেতুর দখল নিয়ে প্রচন্ড লড়াই, দুশো পাক সৈন্য নিহত দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার সংযোগ রক্ষাকারী ফেনীর গুরুত্বপূর্ণ শুভপুর সেতুটির দখল নিয়ে মুক্তিফৌজের সঙ্গে লড়াইয়ে পাকবাহিনীর এক ব্রিগেড সৈন্যের অন্তত দু’শ’জন প্রাণ হারিয়েছে। গত দুদিন ধরে এখানে প্রচন্ড লড়াই চলছে। গত ১৪ মে মুক্তিফৌজের সঙ্গে ট্যাঙ্ক ও ভারী কামানের লড়াইয়ের পর পাকবাহিনী এখানকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দখল করে। এই যুদ্ধে মুক্তিফৌজের ৩৮ জন মারা যান। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে মুক্তিফৌজ পাকবাহিনীর সৈন্যদের বিপুল সংখ্যায় খতম করেছে। রাজশাহী অঞ্চলে মুক্তিফৌজ তিনজন পাক সেনাকে শেষ করেছে। বরিশালে মুক্তিফৌজ এক পাক শিবিরের ওপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং একজন অফিসার ও পাঁচজন সৈন্যকে খতম করে। পাকবাহিনী যাতে এগুতে না পারে সে জন্য মুক্তিফৌজ গত দু’দিনে রংপুরের কাকিনা অঞ্চলে ১১টি রেলসেতু ধ্বংস করেছে। দৈনিক স্টেটসম্যান পত্রিকা ‘ভুল সময়ে কোন স্বীকৃতি নয়’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। এদিন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, রবিবার দমদম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভায় স্পষ্টভাবে বলেন যে, বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার মতো বহুল আলোচিত বিষয়টি এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সরকার সবচেয়ে জরুরী বিষয় হিসেবে দেখছে না। তিনি বলেন, ‘প্রধান বিবেচনার ব্যাপার হলো কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক উক্ত স্বীকৃতি বাংলাদেশের মানুষকে এই মুহূর্তে কোন সাহায্য করবে কিনা।’