২২ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নক্সা, রং আর মনোলোভা কারুকাজের শাড়ি নজর কাড়ছে

রহিম শেখ ॥ রমজান শেষে আসছে ঈদ-উল-ফিতর। এ উপলক্ষে নারী ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে শাড়ির দোকানগুলোতে। ভিন্নধর্মী নক্সা, চোখ ধাঁধানো রং আর মনোলোভা কারুকাজের শাড়িগুলো নজর কাড়ছে নারীদের। বিশেষ করে এবার ঈদে ঐতিহ্যবাহী ও ভারি কাজের শাড়ির প্রতিই নারীদের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। বিক্রেতারা জানান, এ পর্যন্ত ভারতীয় বিভিন্ন কাতান শাড়িই বেশি বিক্রি হচ্ছে। বিক্রি তালিকায় এগিয়ে আছে আদি জামদানি। ভরা বর্ষায় ঈদ উদ্যাপনে গরম ও বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে দেশীয় বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসগুলো এনেছে হালকা ও আরামদায়ক শাড়ি। আধুনিকতার সঙ্গে মিল রেখে ঈদ উৎসব পালনে তরুণীরা বেছে নিচ্ছেন জর্জেট, শিফন ও সিল্কের কাপড়।

রাজধানীর সবচেয়ে বড় শাড়ির বাজার এখন মিরপুর বেনারসি পল্লী। কিন্তু ওই এলাকায় মেট্রোরেল কাজের জন্য সড়কের বেহাল অবস্থায় বিক্রি সেভাবে বাড়েনি। ক্রেতার ভিড়ও খুব বেশি চোখে পড়েনি। প্রতিবছর এই সময়টাতে যেখানে কথা বলারই সময় পান না বিক্রেতারা। সাধারণত শব-ই বরাতের পর থেকে বিক্রি শুরু হয়ে চাঁদ রাত পর্যন্ত চলে। মঙ্গলবার বেনারসি পল্লীতে ঢুকতেই বেনারসি কুঠিরের স্বত্বাধিকারী রেজওয়ানা বলেন, বর্তমানে ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্গে পণ্যের ডিজাইন ও কারুকার্যের অনেক পরিবর্তন এসেছে। এ ছাড়া বেনারসি কুঠিরের কিছু নিজস্বতার জায়গা থেকে এটার ডিজাইন ও কারুকার্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পণ্য থেকে অনেক আলাদা। কারণ আমাদের এই ডিজাইনগুলো নিজস্ব তাতে নিজস্ব ফ্যাশন ডিজাইনার ও অনেক ক্ষেত্রে বিদেশী ডিজাইনার দিয়ে করানো হয়। ফলে এটা অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। যদিও বর্তমানে অনেক বড় বড় শপিংমল ও কিছু নামকরা ব্রান্ড আমাদের প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিয়ে বিক্রি করে থাকে।

ব্যবসায়ীরা জানালেন, এবার পিওর সিল্ক, জর্জেট, বিয়ের কাতান, কাতান, বেনারসি সিল্ক, কাঞ্জিবরন, ক্যাটালগ, মেঘদূতসহ বিভিন্ন ধরনের শাড়ির জনপ্রিয়তা রয়েছে। এগুলোর দাম ১২ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এছাড়া বুটিক, স্টোন ও জরির বাহারি কাজের দেশীয় বস্ত্রের বিপুল সরবরাহ রয়েছে এই পল্লীতে। ঈদ উপলক্ষে সব শ্রেণীর ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে প্রতিটি কারখানাতে বিভিন্ন দামের ও মানের শাড়ি প্রস্তুত করা হয়। বিক্রেতারা জানান, ঈদে কাতান শাড়ির চাহিদা একটু বেশি থাকে। তবে ক্রেতাদেরকে দেশীয় পণ্যে ও ইন্ডিয়ান পণ্যের পার্থক্য বুঝাতে কিছু ইন্ডিয়ান শাড়িও রাখা আছে দোকানে বলে জানান বেনারসি রূপসিঙ্গারের ম্যানেজার মোঃ সাব্বির আহমেদ। এ বছর দোকানে বিক্রি কিছুটা কম হলেও খুব শীঘ্রই বেচাকেনা জমে উঠবে বলে তিনি জানান। এখানে কাতান, বেনারসি, জামদানি, কাড়িয়াল, খাড্ডি, কাটিয়াল, বেলগাঁও, ন্যানো কাতান, ফুলকলি, সামার, রিভারসিভার, ওতাদ জামদানি, ইটকাট, কানিআঁচল, দেবদারু, সামু সিল্কসহ একাধিক শাড়ি কালেকশন রয়েছে। এগুলোর নাম শুনলে ইন্ডিয়ান পণ্য মনে হলেও এগুলো আমাদের দেশেই নিজেস্ব তাঁতের তৈরি। শুধু কিছু নাম কপি করা হয়েছে। ভারতের কিছু কিছু পণ্যের নাম যেমন আমরা কপি করি একইভাবে তারাও আমাদের দেশীয় পণ্যের অনেক নাম কপি বা নকল করেন। তিনি আরও বলেন, ভারত যতই ভাল পণ্য তৈরি করুক না কেন, আমাদের দেশী ঢাকাই জামদানি তারা কোনদিনই শতভাগ মানসম্পন্ন তৈরি করতে পারবে না।

বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের জ্যোতি শাড়ির ম্যানেজার মাসুদ রানা জনকণ্ঠকে বলেন, উৎসবের মৌসুমে সব ধরনের ভারি কাজের শাড়ির প্রতিই ক্রেতাদের আগ্রহ থাকে। তবে এ মৌসুমে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী কাতান শাড়িগুলোই বেশি বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, এবার লেহেঙ্গা কম বিক্রি হলেও লেহেঙ্গা স্টাইলের শাড়ি বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই আবার পার্টি শাড়ি খুঁজছেন। বসুন্ধরার জামদানি শাড়ি কুটিরের বিক্রেতা সাইফুল আহমেদ জানান, তার দোকানে সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের জামদানি শাড়ি রয়েছে। বেচাকেনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এবার দামী শাড়ির প্রতি ক্রেতাদের ঝোঁক কম। বিক্রি আশানুরূপ হয়নি। বসুন্ধরা শপিংমলে ৪র্থ তলায় শালিমার শাড়ির শো-রুমে কথা হয় ধানমন্ডি থেকে আসা ক্রেতা ফারজানা ইসলামের সঙ্গে। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, ঈদের জন্য তিনি ভারতীয় বেঙ্গল কাতান শাড়ি কিনেছেন। তার মতে, উৎসবে জাঁকজমকপূর্ণ ভাব ফুটিয়ে তুলতে কাতান শাড়ির বিকল্প নেই। এ ছাড়া নগরীর ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, নিউমার্কেট, ইস্টার্ন প্লাজা, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিসহ বিভিন্ন মার্কেট, শপিংমল ও বিপণিবিতানগুলোতে এবার জামদানি, কাতান, সিল্ক, হাফসিল্ক ও বেনারসি শাড়ির দিকেই বেশি ঝুঁকছেন নারীরা। গরমের কথা মাথায় রেখে এবার শাড়িতে অল্প ডিজাইন ও হালকা রঙের কাজগুলো কমই প্রাধান্য পেয়েছে। তবে হাতের কাজের গর্জিয়াস শাড়িও আছে প্রচুর। এবার শাড়ির দোকানগুলোতে আকর্ষণীয় শাড়ির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে মসলিন শাড়িতে অলওভার কাজও। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের ঈদে চাহিদাসম্পন্ন শাড়ি হচ্ছে ‘চেন্নাই কাতান’ ও ‘বেঙ্গল কাতান’। এ শাড়ির আঁচলে ভারি কাজের পাশাপাশি সারা গায়ে হালকা কাজের সঙ্গে ভারি কাজও থাকছে। এর মূল্য ৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা।

জানা গেছে, ঋতুর চাহিদায় আর উৎসবকে মাথায় রেখে তুলনামূলক উজ্জ্বল রঙের শাড়ি বেছে নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন ফ্যাশন ডিজাইনাররা। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোর শাড়িতেও লাল, কালো, নীল ও সবুজ রংকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শাড়ির মধ্যে রয়েছে জামদানি, টাঙ্গাইল ও পাবনার তাঁতের শাড়ি এবং মিরপুরের কাতান। টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি দেড় হাজার টাকা থেকে ছয় হাজার টাকা, রাজশাহী সিল্ক চার হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সুতি শাড়িতে ব্লক, বাটিক, হাতের কাজ ও এ্যাপ্লিক করা এক হাজার ৩০০ টাকা থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। তবে ঈদ কেন্দ্রিক শাড়ির বাজার এখনও ভারতীয় শাড়ির দখলে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো যদিও নিজেদের ফ্যাশনে ও মননে যুগোপযোগী করে তুলতে সচেষ্ট। কখনও সম্পূর্ণ দেশী ঢঙে, আবার কখনও ভিনদেশী ফ্যাশনের ধারার সঙ্গে দেশীয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণের মাধ্যমে তৈরি করছে ক্রেতা চাহিদার শাড়ি। কিন্তু দামে ভারতীয় শাড়ি তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় সেদিকেই ক্রেতারা ঝুঁকছেন বেশি। আজিজ সুপার মার্কেটে রয়েছে আরও কিছু শাড়ির দোকান। নবরূপা, দোয়েল সিল্ক, মনে রেখ শাড়িসহ বিভিন্ন দোকানে চলছে ক্রেতাদের যাওয়া-আসা। নগরদোলা এনেছে বৈচিত্র্যময় কিছু শাড়ি। আর যাদের বাজেট একটু বেশি তারা যেতে পারেন গুলশান এলাকার শপিংমল, বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কে। এখানে শাড়ি রয়েছে লাখ টাকা দামের।

এদিকে ডেমরার জামদানি কুটিরে ঘিরে রঙের জমিনে জরির হাতের কাজের শাড়ি বিক্রি হচ্ছে ৩২ হাজার টাকায়। টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরে তসরের ওপরে জামদানি কাজের শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার টাকায়। এ ছাড়াও মসলিনে জরির কাজের শাড়ি, ভেজিটেবল ডাইংয়ের শাড়ি ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামে পাওয়া যাচ্ছে। অঞ্জন’স-এর স্বত্বাধিকারী ও ফ্যাশন ডিজাইনার শাহীন আহম্মেদ বলেন, এবার রাজশাহী সিল্ক, কটন, এন্ডি সিল্ক, হাফ সিল্ক, মসলিন, তাঁত কটনসহ বিভিন্ন কাপড়ে স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক প্রিন্ট, এম্ব্রয়ডারি, কাঁথা স্টিচ, বিভিন্ন ম্যাটারিয়ালের কাজ করা হয়েছে। তবে এবার এম্ব্রয়ডারির প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বেশি। বেশির ভাগ শাড়িতে একাধিক মাধ্যমে কাজ করা হয়েছে। নিজস্ব বুনন ডিজাইনে তাঁতের শাড়ি করা হয়েছে। বয়স ও উৎসবকে মাথায় রেখে শাড়ি ডিজাইন বিন্যাস করা হয়েছে। এসব শাড়ির দাম পড়বে সুতি ১০০ থেকে ৫ হাজার টাকা, সিল্ক ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা, মসলিন ৪ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা, হাফ সিল্ক ২৫ শ’ থেকে ৬ হজার টাকা।