১৪ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাহে রমজান

অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম রফিক ॥ রহমত মাগফিরাত ও বরকতের মাস রমজানুল মুবারকের আজ ১১তম দিবস, আজ থেকে শুরু হলো মাগফিরাতের প্রতিশ্রুত মধ্যম দশক। গত রহমতের দশকে হেলাখেলা ও ব্যস্ততায় যাদের আল্লাহর দরবারে তাঁর করুণা ভিখারী হয়ে লুটোপুটি করা সম্ভব হয়নি, এখন ক্ষমার এই দশকে মহামহিম প্রভুর কাছে, তার সন্তুষ্টির পথ পরিক্রমায় ফিরে আসা দরকার এবং অনন্ত পরকালের পাথেয় অর্জনের যে সুযোগ মাহে রমজানে এসেছে তার যেন সদ্ব্যবহার হয়। এ মাসের পরিচয় দিতে গিয়ে কুরআনে বলা হয়েছে এ এমন এক মাস যে মাসে কুরআনুল কারীম নাযিল হয়েছে। সঙ্গত কারণে এ মাসে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা, কুরআনের আলোকে আমল করা অত্যন্ত ফযিলতের কাজ। তাই এই কাজে যেন আমরা সময় দানে কার্পণ্য না করি। আল্লাহ পাক কুরআন নাজিল করেছেন মানব জাতিকে সঠিক ও সৎপথ প্রদর্শনের জন্য। এ কুরআন মানুষের সামনে সত্য- মিথ্যা, ভাল- মন্দ, জান্নাত- জাহান্নাম এবং ইহকাল- পরকাল সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা তুলে ধরেছে।

মহানবী (স.)-এর নবুওয়্যাতের প্রধানতম দায়িত্ব ছিল কুরআন মাজিদ তিলাওয়াত করে শোনান, কুরআন মাজিদ শিক্ষা দেয়া এবং এরই ভিত্তিতে তাদের পরিশুদ্ধ করা। কুরআন মাজিদ সকল প্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভান্ডার। এমন কোন বিষয় নেই, যার তথ্য কুরআন মাজিদে পরিবেশিত হয়নি।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং মধুর কণ্ঠের তিলাওয়াত শ্রবণ করেন। কুরআন তিলাওয়াতের ফযিলত অনেক। এ প্রসঙ্গে নবী করিম (স.) বলেন : যে ঘরে কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, আসমানবাসীগণের নিকট সে ঘরটি এমন উজ্জ্বল দেখায় যেমন যমিনের অধিবাসীদের নিকট নক্ষত্ররাজি উজ্জ্বল দেখায়—(বায়হাকী)। এজন্য হযরত রাসুলে আকরাম (স.) ইরশাদ করেছেন : তোমরা আপন ঘরগুলোকে সালাত এবং কুরআন পাঠ দ্বারা আলোকোজ্জ্বল করে তোল (বায়হাকী)।

কুরআন তিলাওয়াতের ওপর জাতির বরকত ও সফলতা নির্ভর করে। এ সফলতা তখন আসবে যখন আমরা কুরআন বুঝে শুনে পড়ব এবং কুরআনের হুকুম মেনে চলব। কুরআন অধ্যয়ন করে যে ব্যক্তি কুরআনের ওপর আমল করবেন কিয়ামতের দিন তার মাতাপিতাকে এমন একটি মুকুট পরানো হবে যার কিরণ সূর্যের কিরণ অপেক্ষাও উজ্জ্বল হবে। উল্লেখ্য, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত বা অধ্যয়ন অন্য দশটি বই- পুস্তক পড়ার মতো নয়। যেনতেনভাবে এটা পড়া যায় না, এতে আল্লাহর কালামের বেহুরমতি হয়। কুরআন পড়া শুধু ইবাদত নয়, বরং আফজালুল ইবাদত- উত্তম ইবাদতসমূহের একটি। আমাদের এজন্য পূত পবিত্র মন-মানসিকতা নিয়ে আল্লাহ তায়ালার পাক কালাম স্পর্শ করা এবং আদবের সঙ্গে বসে তা তিলাওয়াত করা উচিত। একদিকে এর পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে শুদ্ধ তিলাওয়াতের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। তবেই আমাদের জীবন-জগৎ, ইহ-পরকাল এ পবিত্র গ্রন্থের পরশে ধন্য ও বরকতময় হয়ে উঠবে।

কালামে মাজিদ তিলাওয়াতের আদব ও পরিবেশ সম্পর্কে কুরআনেই বলা হয়েছে : আর যখন (তোমাদের কারো সামনে) কুরআন তিলাওয়াত করা হবে তখন তোমরা পূর্ণ মনোযোগ সহকারে শোন এবং সর্বোতভাবে নীরবতা অবলম্বন কর। এতে নিশ্চয় তোমরা রহমতের ভাগী হবে। আজ আমাদের অনেকের মাঝে কুরআন তিলাওয়াতের কিম্বা তিলাওয়াত শোনার সেই নিয়ম ও ধৈর্য দেখা যায় না। এমন পরিবেশে কুরআন তিলাওয়াত না করা উচিত যখন শ্রোতামন্ডলী অন্যমনস্ক কিংবা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকে।

আজকের সমাজে মধুর সুরে কুরআন পড়নেওয়ালা লোকের খুবই অভাব। একইভাবে অভাব দেখা দিয়েছে ধৈর্যের সঙ্গে কুরআন শরীফের তিলাওয়াত শোনার মতো লোকের। এক সময় কুরআনের সুরের আকর্ষণে অমুসলিমরা ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে ব্যাকুল হয়ে উঠতো। হযরত ওমরের (রাদি.) ইসলাম গ্রহণের ইতিহাস তেমনি এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। খুলুসিয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর কালাম পাঠ করা হলে শুধু মানুষ নয়, তামাম মাখরুকাত উদ্বেলিত ও আন্দোলিত হয়ে উঠে।

মোদ্দা কথা, কুরআনপাক মহান আল্লাহর পবিত্র কালাম- এটাই আমাদের বিশ্বাস, ইমান। সুতরাং এর সংরক্ষণে, এর তিলাওয়াত ও পঠন-পাঠনে, এর স্পর্শ, আদান-প্রদানে সর্বাত্মক সতর্কতা এবং আদব রক্ষা করা অপরিহার্য। আজ নানাভাবে এ কুরআন আমাদের হাতে বেইজ্জত হচ্ছে, না পারছি শুদ্ধ করে পড়তে, না জানছি সংরক্ষণ করতে। আমাদের অনেকের ঘরে ময়লাযুক্ত ও অবহেলিত স্থানে কুরআনের কপি রাখা হয়; কুরআনের আমপারা পড়ার টেবিলে, চেয়ারে, স্কুল-মাদ্রাসার আঙ্গিনায় পদদলিত হয়। এটা খুবই দুঃখজনক। এ মৌসুমে আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্তির আয়াত ও বিশেষ সুরাগুলো বেশি বেশি করে তিলাওয়াত করা দরকার।