১৬ মে ২০১৯

অজানা এক লিপির সাহিত্যের ইতিহাস

মানব গুপ্ত ॥ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। নানা বৈচিত্র্যও আছে এর। চর্যাপদকে ধরা হয় এর আদি নিদর্শন হিসেবে। খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যকার কোন একসময়ে এটি রচিত হয়েছিল। সে হিসেবে ওই সময়ের মধ্যকার কোন এককালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা শুরু হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। যদিও এ নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। তবে একটি তথ্য অনেকের কাছেই অজানা, বাংলা ভাষায় রয়েছে দুটি বর্ণমালা। একটি প্রমিত বাংলা, অন্যটি সিলেটি নাগরী। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি প্রায় বিরল উদাহরণ। বাংলা ভাষা ছাড়া একই ভাষায় একাধিক বর্ণমালার ঐতিহ্য রয়েছে শুধু স্কটল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে।

সিলেটি নাগরীলিপির উদ্ভব আরবী, কাইথি, বাংলা ও দেবনাগরীর অনুসরণে চতুর্দশ শতকে। এ লিপিতে রচিত হয়েছে শত শত গ্রন্থ, দলিল-দস্তাবেজ এবং পরিচালিত হয়েছে সেকালের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম। নাগরীলিপির সাহিত্য ধারণ করেছে সিলেটি উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা। নাগরী সাহিত্যে মূলত বিধৃত হয়েছে ইসলামী নানা কাহিনী। মানবিক প্রেম-প্রণয় উপাখ্যানও প্রাধান্য পেয়েছে এতে। এছাড়া রচিত হয়েছে নবীচরিত, ধর্মের বাণী, রূপকথা, সামাজিক রচনা, সুফিবাদ, ফকিরি গান, বীরগাথা এবং মরমী কাহিনীমূলক পুঁথি। প্রায় ছয় শ’ বছর বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষত সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত ছিল এ লিপির সাহিত্য। সিলেট ছাড়াও এর ব্যবহার ছিল কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ভৈরব, করিমগঞ্জ, শিলচর ও অসমে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তৎকালীন শ্রীহট্টের মুসলমান সাহিত্যিকরা হিন্দি প্রভাবিত বাংলার পরিবর্তে নাগরীলিপিতে তাদের ধর্মীয় বই-পুস্তক ও সাহিত্য চর্চা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ধারণা করা হয়, হযরত শাহজালাল (র)-এর সমসাময়িক মুসলিম ধর্মপ্রচারকরা এই লিপির প্রসার ঘটিয়েছিলেন। মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন তার ‘শিলহটের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘নাগরিকদের সুবিধার্থে এক সহজ সুন্দর মিশ্র ভাষার প্রচলন করা হইল। দেবনাগরী ও বাঙ্গালা অক্ষরের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া নাগরী অক্ষরের সৃষ্টি হইল। নাগরী অক্ষরগুলি শিখিয়া লইতে মেধাবী লোকদের পক্ষে একটি মাত্র দিনই যথেষ্ট। ফুলের মত সহজ সুন্দর ও আড়ম্বরবিহীন বলিয়া ঐ ভাষার নাম দেওয়া হইল ফুল নাগরী।’

‘শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ’ পত্রিকায় (কার্তিক ১৩৪৩) তিনি লিখেছেন, ‘আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, সেইকালে শ্রীহট্টের ভাষা ছিল সংস্কৃতবহুল বাঙ্গালা। বিদেশাগত মুসলমানগণ উত্তরকালে এদেশের ভাষাকে নিজ ভাষা রূপে গ্রহণ করিলেও প্রথমাবস্থায় তাহারা তাহা সম্যক রূপে বুঝিয়া উঠিতেন না। অপরপক্ষে নবদীক্ষিত মুসলমান ও হিন্দু ভ্রাতৃগণ, শাসক ও প্রতিবেশী বিদেশাগত উর্দু, পার্শি মিশ্রিত ভাষা বুঝিতে সক্ষম হইতেন না। দেশের শাসন ও ধর্মপ্রচার কার্য চালাইতে গিয়া হিন্দুদের সহিত কথা কহিতে মুসলমান শাসক ও ধর্মপ্রচারক সম্প্রদায়ও বিশেষ অসুবিধা ভোগ করিতেন। আমাদের বিশ্বাস নানা ভাষার সংমিশ্রণে তখনকার শ্রীহট্টের ভাষা এক অপূর্ব আকার ধারণ করিয়াছিল। অতঃপর শাসকগণের গবেষণায় এতদ্দেশীয় হিন্দুগণের রাজকার্জ ও নবদীক্ষিত মুসলমানদের ধর্মকার্য এবং রাজকার্য পরিচালনের সুবিধার্থে সর্বসাধারণের বোধগম্য করিয়া এক সহজ সরল (গ্রাম্য) ভাষার পরিচালনাহেতু বাঙ্গালা ও দেবনাগরী অক্ষরের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া ‘সিলেট নাগরী’ অক্ষরের সৃষ্টি হয়। সহজ ও সুন্দর বলিয়া জনসাধারণ ইহার অপর এক নাম দিয়াছিলেন সিলেটের ‘ফুল নাগরী’।’

নাগরীলিপি ছিল মূলত মুসলমানী ভাষা লিপি। সাধারণত হিন্দু অধিবাসীগণ এই বাংলা লিপির সঙ্গে পরিচিত ছিল না। এ বিষয়ে সোনাভানের পুঁথি গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘এই লিপির ব্যবহার প্রধানত সিলেটের মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। হিন্দুরা এই লিপির সঙ্গে মোটেই পরিচিত নন। সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চলেÑ সদর, করিমগঞ্জ ও মৌলভীবাজার মহাকুমায় এই লিপির প্রচলন বেশি ছিল। কাছাড় জেলায় ও ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ মহাকুমায়ও একসময়ে সিলেটি নাগরী পুঁথির প্রচলন ছিল।’

জানা যায়, এই লিপি চর্চায় পুরুষের চেয়ে নারীরাই এগিয়ে ছিল বেশি। যারা সঠিকভাবে বাংলা ভাষা জানত না, তাদের মধ্যেও অনেকে নাগরীলিপিতে স্বাক্ষর করতে পারত। কোন কোন প্রাচীন দলিলে নাগরী লিপিতে নাম দস্তখত পাওয়া যায়। সোনাভানের পুঁথি গ্রন্থে বলা হয়েছে, কম পরিশ্রম ও কম সময়ে শেখা যায় বলে স্ত্রীলোকের মাঝেও এর বহুল প্রচার ছিল। সাধারণ্যে প্রবাদ ছিল যে, ‘নাগরীলিপি আড়াই দিনেই শেখা যায়’। নাগরী লিপি সংযুক্ত বর্ণ ও অনেক জটিল অক্ষর থেকে মুক্ত। এই কারণে সিলেটি নাগরী লিপি অতি সহজেই শেখা যায়।

রাজকার্যের সঙ্গে এই লিপি প্রচলনের তেমন কোন সম্পর্ক ছিল না। নাগরী লিপিতে রচিত গ্রন্থের অনেক নামাজ, রোজা, হজ, ইসলামী জীবন ব্যবস্থা, ইসলামের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ের ওপরে রচিত। কিছু গ্রন্থ ইসলামী মারফত-বিষয়ক। কিছু গ্রন্থের পুঁথিতে পীর ও আউলিয়াদের জীবনী লিখিত। আবার কিছু কিছু গ্রন্থের পুঁথিতে রয়েছে প্রেম-উপাখ্যান। এই সব পুঁথি জনসাধারণের শোক ও দুঃখে সান্ত¡নার বাণী এবং বিশ্রামে আনন্দ প্রদান করত।

নাগরীলিপিতে রচিত সাহিত্যের পুঁথি-পুস্তক বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। বর্তমানে এই লিপির প্রচলন নেই। অল্প পরিসরে পাকিস্তান আমলেও এই লিপির চর্চা ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানীদের হাতে বিধ্বস্ত হয় সিলেটি নাগরীলিপির একমাত্র ছাপাখানাটি। এরপর থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্তির কবলে পড়ে শ্রীহট্টের এই ঐতিহ্যসম্পদ। ফলে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল সিলেটি নাগরীলিপিও। বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে না দিয়ে ভাষার অমূল্য সম্পদ এ লিপিকে উদ্ধারকল্পে এগিয়ে আসেন গবেষক, ইতিহাস-ঐতিহ্য অনুরাগী মোস্তফা সেলিম।

বাংলা ও বাঙালীর ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে সমাজ-বাস্তবতার অনিবার্য প্রয়োজনে সিলেটি নাগরীলিপি, ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভব বিকাশ বিস্তৃতি। কালের অমোঘ নিয়মে ব্যবহারিক প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় এখন সেটি প্রায়-লুপ্ত। কিন্তু প্রায় পাঁচ শ’ বছর ধরে এ-লিপি চর্চার ভেতর দিয়ে আমাদের ভূগোলের একটি বৃহৎ অংশে যে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও সৃজনচর্চা চলেছেÑ এটি আমাদের ঐতিহ্যের এক অক্ষয় সম্পদ। এ-ভাষায় রচিত হয়েছে শত শত পুঁথি, আখ্যান আর হাজারো গানÑ যা আজও বিপুল জনপ্রিয়। এই ভাষা ও ঐতিহ্যের এক সঘন বর্ণনা পাওয়া যায় নাগরী সাধক-গবেষক মোস্তফা সেলিমের ‘সিলেটি নাগরীলিপি সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ বইয়ে। মোস্তফা সেলিম কেবল নাগরী-গবেষক নন বরং একযুগ ধরে নাগরীর দুর্লভ-দুষ্প্রাপ্য পা-ুলিপিগুলোর সম্পাদনা, প্রকাশ ও প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছেন। তাই এ সময়ে নাগরী চর্চায় তিনি ও তার উৎস প্রকাশন প্রায়-সামর্থ শব্দ। তিনি তার এই সাধনানির্যাসে পূর্বজ গবেষকদের পথ ধরে নাগরী সংস্কৃতির ইতিহাস যেমন তুলে ধরেছেন, পাশাপাশি এর সৃষ্টি ও ¯্রষ্টাদের যথাযোগ্য মর্যাদায় তুলে এনেছেন দৃষ্টান্তসমেত। আমাদের ভাষা-সাহিত্যের উপেক্ষিত এই অধ্যায়টি সম্পর্কে কেবল অজ্ঞতাই নয়, রয়েছে অনেক ভুল ধারণাও। মোস্তফা সেলিম তার বইটির ভেতর দিয়ে ইতিহাস-কর্তব্য পালন করে জাগাতে চেয়েছেন আমাদের চেতনাকেও।

বইটি কয়েকটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রবেশক, নাগরীলিপি : সংক্ষিপ্ত আলোকপাত, নাগরীলিপি সাহিত্যের বিষয় ও প্রকরণ, সাহিত্যসম্পদ, নির্ঘণ্ট, নাগরীলিপিতে রচিত পুঁথি ও বই এবং লেখকের তালিকা প্রভৃতি বিষয় পাঠে পাঠক জানতে পারবেন এই লিপিতে লেখা সাহিত্যের ইতিহাস। একই সঙ্গে উন্মোচিত হবে এক অজানা অধ্যায়। এ যেন ইতিহাসের ইতিহাস গ্রন্থ।