২৭ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সূফিজমে আবিষ্ট এক কবির নতুন কবিতা

  • জোবায়ের মিলন

বইমেলা শুরু হওয়ার দু-এক মাস আগেই খোঁজ পেয়েছিলাম কবি ‘রাসেল রায়হান’ সূফি কবিতা লিখছেন এবং মেলায় তা বই আকারে প্রকাশ করবেন। হঠাৎ দুটি কবিতা দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে পড়ার সুযোগ পেলাম। আগ্রহ বাড়ল। আমাদের কবিতায় সূফিজম কম দেখা যায় বিধায় এ নিয়ে যেমন আলোচনা হয় না তেমনি এ নিয়ে লেখালেখিও চোখে পড়ে কম। মেলার শুরুতেই বইটি আলোতে এলেও বার বার কপি শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ও গিয়েও না পাওয়ার কারণে বইটি হাতে আসতে সময় লাগল। শেষে হাতে পেয়ে কবির বয়ানে ভূমিকাটি পড়েই দাঁড়িয়ে গেলাম। সহজ স্বীকারোক্তি- ‘দুই-আড়াই বছর আগে যখন কবিতাগুলো লিখতে শুরু করি, তখন বেশ গর্বসহকারে বলেছিলাম, সূফিকবিতা লিখছি। দু-চারজন অনুপ্রেরণাও দিয়েছিলেন এবং এগুলো যে মূলত সূফিকবিতা নয়, কেউ সেটা বলেননি আমায়। আমি আহত হতে পারি ভেবেই হয়ত তাঁরা আমার ভুলটা ভাঙ্গানোর চেষ্টা করেননি। আঘাত অবশ্য আমাকে পেতেই হলো, যখন কিছু সত্যিকারের সূফিকবিতা পড়ার সৌভাগ্য আমার হলো। সদ্যোজাত শিশুর কাছে আঁতুড়ঘরের ছাদকেই আকাশ মনে হয়, আমারও শুরুতে সেটাই হয়েছিল। এখন আমি নিজে বুকে হাত দিয়ে বলছি, এগুলো সূফিকবিতা নয়। আমার মতো লোভী মানুষের পক্ষে সূফিকবিতা লেখা যে এ জনমে সম্ভবও নয়, সেটুকু বোঝার মতো জ্ঞান পরম করুণাময় আমাকে দিয়েছেন। যখন শুরু করি, তখন সামান্য অংশবিশেষ আমার প্রথম বই ‘সুখী ধনুর্বিদ’-এ নিয়েছিলাম, এই বইয়ের পূর্ণাঙ্গতার খাতিরেই সেটুকু ফিরিয়ে আনতে হলো। আর লিখতে গিয়ে টের পাই, এ জাতীয় লেখা আমার কাছে মূলত একটি ফাঁদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, পুরোপুরি মুক্তির একটাই উপায় ছিল, বই করে ফেলা। সুতরাং এ বই আমার নিজের মুক্তির লোভে। আর এই লোভটুকুর জন্যই আমার কোনদিন সূফিকবিতা লেখা হয়ে উঠল না। হয়ে উঠবেও না’... আগের শোনা কথার সঙ্গে আংশিক মিল পেলাম ভূমিকাতেই। ‘ইহুদির গজল’ সূফিজমে আবিষ্ট হয়ে রচিত বা রচনার চেষ্টা। ভোরে হাতমুখ ধুয়ে নাস্তার পর বইটি নিয়ে বসলাম, একটানে শেষণ করা বলে। ধীরে পড়ি বলে ৪ ঘণ্টায় ৯টি দীর্ঘ কবিতা পড়া শেষ করলাম। বুঝলাম না কিছুই। এত ডাকনাম শুনালাম আর কী পড়লাম! এমন তো হতে পারে না! আবার শুরু থেকে পড়া শুরু করলাম। এবার শব্দ, বাক্যগুলো কিছুটা ঘোমটা খুলতে শুরু করল। কিছু জায়গার ভাব বুঝতে ইনবক্সে কথা বললাম কবির সঙ্গে। আমার অজ্ঞতায় জটখাওয়া মাথাটা খুললো। আবার শুরু করলাম পড়তে। বিকাল হয়ে রাত। সবাই ঘুমোচ্ছিল। আমি টেবিলে, ইহুদির গজলে, আমি যেন কোথায় প্রবেশ করছি; আমি যেন এক মিনার চূড়ায় উঠে যাচ্ছি ধীরে ধীরে!... পড়া শেষ হলো। পরের দু-দিন ভাবনা থেকে সরলো না ‘ইহুদির গজল’। কেনো সরলো না? প্রথমত এমন ভাবে, ভঙ্গিতে, ধরনে, কবিতার রচনায় কবিতা পড়িনি অনেক দিন। দ্বিতীয়ত প্রবাদের মতো সাজিয়ে পয়ারে পয়ারে উদ্বৃত হয়েছে চিন্তিত মতবাদ। তৃতীয়ত মনে হয়েছে প্রতিটি পয়ার একটি দর্শন। উক্তিগুলো বোধের ভেতর থেকে উঠে আসা আমারই ভাবনা যেন, যেন এই উক্তিগুলো আমার ভেতরেই ঘুরছিল কিন্তু আমি বলতে পারিনি, দেখতে পরিনি। বইতে থাকা ৯টি কবিতা কবি সহজেই টানা গদ্যে রচনা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেনটি সম্পূর্ণ ইচ্ছা করেই, সচেতনভাবে। প্রতিটি চরণকে তিনি ভেঙ্গে ফেলেছেন অর্থগত দিকে লক্ষ্য করে। তিনি চেয়েছেন, একটি চরণে যতটি পর্ব আছে, প্রতিটি পর্ব যেন ধীরে পাঠ করতে হয়; আর পাঠের ধীরতার মধ্য দিয়ে যেন পর্বার্থটি ছবির মতো ভাসে, পাঠক যেন তা দেখতে পান। আমিও পাঠ করতে গিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে পাঠ না করা পর্যন্ত ডুব দিতে পারছিলাম না কবির চেষ্টার ভেতর। তিনবার পড়ার পর চতুর্থবারে এসে খুঁজে পেলাম কবিকে, তার চেষ্টাকে। কবি ‘ইহুদির গজল’-এ সূফিবাদকে আপন আদরে ধরতে চেয়েছেন যত্নের সঙ্গে। ভূমিকায় যেমন তিনি সহজ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন পাঠেও তেমন সত্যতা পাওয়া যায়। পুরোপুরি সূফিজমকে তিনি হাতের মুঠোর পুরতে পারেননি বটে, তবে তার আশপাশ দিয়ে ঘুরেছেন দর্শনে ডুব দিয়ে। কবিতাগুলোর খ-াংশ যদি লক্ষ্য করি তবে অনুমান হতে পারে- ‘একদিন নৃত্য করতে করতে দেখব/ আমার মাথা/ চাঁদের শরীরের সঙ্গে/ মিশে গিয়ে/ আমাকে দেখছে।/ দেখছে/ এই চোখ ঠিকরানো দ্যুতি/ ঘূর্ণায়মান জোব্বা/ কবুতর/ এবং গম্বুজ/’ (দ্যুতি, কবুতর এবং গম্বুজ)। আবার ‘প্রেম হলো সেই যমজ শিশু/ যারা/ শেষ পর্যন্ত/ প্রতিবিম্বকেই/ স্পর্শ করতে চায়/... -প্রেম/ যোসেফকে গিলে ফেলা সেই মাছও/ যে/ তাকে আবার উগড়ে ফেলেছিল/ তীরে।’ (দ্যুতি, কবুতর এবং গম্বুজ)। একই কাব্যের আরেটি খন্ডাংশ যদি পড়ি তবে দেখব কবি কেমন করে সূফিমতকে ধরার জন্য নিড়ান চালিয়েছেন নিজের ভেতর কবিতার জমিনে, ‘... একবার/ স্পর্শ করো/ এই ঘূ-র্ণা-য়-মা-ন/ জোব্বা-/ তুমিও দেখতে পাবে।/ জানবে/ কেন ঈশ্বরপ্রেমের সর্বোৎকৃষ্ট সময়/ মধ্যরজনী/ ... তুর পর্বতের ছাই/ চোখে মেখে/ ঘুমিয়েছ/ পর্বতের নিচে।/ দূরে/... মনে রেখো,/ দূরত্বই দীর্ঘ হবে/ সে তুমি দূরে যাও/ আর তিনি।/ সুতরাং/ জিভ পুড়ে গেছে বলে/ যাকে/ আগুন ভেবে দূরে সরে আছ/ কয়েক পুরুষ ধরে/ সে আসলে এক টুকরো স্বর্ণ/ পরম করুণাময়ের/ আদ্যক্ষর খচিত।’ কবিতাগুলো কবির একদিনের রচিত যে নয় তা তার ভূমিকা বয়ান থেকে জানতে পারি। কবি রাসেল রায়হান যে দীর্ঘ সময় শুধু কবিতা তৈরির জন্য নেননি, সূফিমতবাদের ভেতর ঘুরে আসার জন্য, মতবাদটিকে আয়ত্ত করার জন্য, সাধনায় মগ্ন হওয়ার জন্য এবং নিজের ভেতরে জীবিত স্বত্ব¡কে টোকা দিয়ে দেখার জন্য নিয়েছেন তা তার কবিতার মধ্যে সাঁতার দিলে স্পষ্টত দেখা যায়- ‘সেই মাছটিকে দেখছি/ যার মুখ থেকে/ সোনার বড়শি ছাড়াতে ছাড়াতে/ ভেবেছিলে,/ সে বড় সৌভাগ্যবান মাছ/ সোনার বড়ছি মুখে নিয়ে/ মরার সৌভাগ্য/ কজনের হয়!/... দেখছি/ সেই মানুষটিকেও/ যে বলেছিল/ ‘অন্তত মৃত্যুর পর/ আমার কফিনে/ সোনার পেরেক মেরো’-/ -এটুকু প্রশান্তির লোভে/ সে/ ছুটে যায়/ মধ্যরাতের দিকে/ সামন্য আভা/ যখন কোথাও সাক্ষ্য দিচ্ছে/ অগ্নিকু-ের/’ (উপাসনা, সোনার পেরেক)। একই কবিতায় কবি আবার বলছেন- ‘-নিরুপায় ব্যাঙটির কথা/ মনে পড়ে তখন/ অজ্ঞাত কারা যেন/ কেঁদেছিল/ সামান্য জল/ ছিটিয়ে দেয়ার আগ্রহ নিয়ে!/ যে অন্ধ দেখতে পায়নি/ ওই আগুন/ আগুন /তাকেই আগে জড়িয়ে ধরেছিল।/ আর/ অন্ধ এমনই দুর্ভাগা/ আদতে/ সে অন্ধকারও দেখতে পায় না।’ প্রতিটি চরণ খেয়াল করলে বাস্তবতা বা পরাবাস্তবতার মখমল ছাড়িয়ে চোখে পড়বে অন্য এক মিনারের ছবি। যে মিনারে অন্য একজন কথা বলছেন। যাকে আমরা দেখি- দেখি না। একই কবিতার শেষের দিকের কয়েকটি কথার দিকে চোখ রাখা যাক- ‘... ক্রন্দনরত রমণীর কণ্ঠার দিতে/ তাকাও পূবর্বার।/ সেখানে/ উঁকি মারছে/ যে আদরণীয় মুক্তোদানাটি-/ জানো কি না,/ ঝিনুকের কাছে সেটি/ একটি টিউমারের অধিক/ আর কিছু নয়!/... তার কোলে শুয়ে/ যে ভেবেছিল/ নিন্দামুখর প্রতিবেশীর কথা/ সে/ প্রকৃতার্থে প্রেমও শেখেনি/ ঘৃণাও নয়।’ একইভাবে লক্ষ্য করা যায় অন্য একটি স্তবকের দিকে- ‘যে অন্ধকার/ জোনাকির সবচেয়ে বড় শত্রু/ জোনাকি অবধারিতভাবে/ সে অন্ধকারেই বের হবে।/ প্রকৃতপক্ষে/ নিয়তি সবার জন্য/ একইভাবে লেখা হয়ে থাকে।’ শেষ করা যাক আরেকটি কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে- ‘হে বৃদ্ধ ঘোড়া/ কেশরের অমন গর্ব না করে/ বরং দৌড়াও/ আরও/ কিছুটা প্রান্তর/... হে আমার ঘোড়ার মালিক/ নতজানু হও/ সে অহঙ্কারের কাছে/ যে/ তোমায় মর্ত্যে নামিয়ে আনবে/ নতজানু হও/ সে প্রেমের কাছে/ যে তোমায় মর্ত্যে নামিয়ে আনবে।/ অতঃপর/বিস্তৃত হও/ মনে রেখো,/ নত আকাশও হয়/ তুমি/ যদি দিগন্তসমান বিস্তৃত হও।’ (ঘোড়া ও রুবি পাথর)। সূফিজম চেষ্টায় কবি হয়তো পুরোপুরি সফল হননি। তবে ঝলক দেখিয়েছেন চলতে চলতে। গভীর ভাব-খাদে নামার শুরুতেই হয়ত অতলের তল ছোঁয়া সম্ভব নয়, তবে সাধনায় সে পথ রুদ্ধও নয়। আজকের শিষ্যই কালকে দরবেশ হবে এ সত্য কেউ মিথ্যায় উড়িয়ে দিতে পারেনি, পারেও না। আত্মা যার গুরুর খেয়ালে, প্রেম যার মন-মানুষে সে তো রাত পোহালেই নূরের আলো দেখবে পাহাড়ের গুহায় একাগ্র চিন্তার ভেতর, এটাই সত্য। কবি রাসেল রায়হানও এ চেষ্টা অব্যাহত রাখলে অদূর ভবিষ্যতে বিফল হবেন বলে মনে হয়না তার মনদর্শন-বাক্যাংশে প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। কবিতাগুলো না বলে বলি, মন দর্শনগুলো পাঠে পাঠক মাত্রই পাবেন তৃতীয় একটি আস্তিকতার উপস্থিতি। পাবেন সাধারণ ভাবধারার চেয়ে ভিন্ন একটা ভাবগতি। কবি রাসেল রায়হান রচিত ‘ইহুদির গজল’ কাব্যগ্রন্থটি ২০১৯ এর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ‘জেব্রা ক্রসিং’ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত।

আগামীতে কবি রাসেল রায়হানের হাত ছুঁয়ে বাংলা সাহিত্যে সূফিজমের আরও গভীর মতোদর্শন দেখতে পাব সে আশায় তার সর্বাঙ্গীন সফলতা কামনা করি।