১৭ মে ২০১৯

‘বয়ঃসন্ধিকালে প্রয়োজন বন্ধু মা’

মেয়ের শৈশবে নির্ভরতার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হলো মা। শৈশবকালে সন্তানের কাছে মায়ের সাহচর্যই সর্বোচ্চ ভালবাসার পরিচায়ক। আমরা সাধারণত ১০ বা ১১ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টাকে শৈশব বলি। শৈশবে মায়ের জন্য মেয়ের ভালবাসা যেমন অগাধ থাকে, তেমনি থাকে মায়ের প্রতি প্রচণ্ড আনুগত্য। মেয়ের জীবনে পরিবর্তন আসতে শুরু করে বয়ঃসন্ধিকাল থেকে। আমাদের দেশে সাধারণত ১১ বছর বয়স থেকে মেয়েদের বয়ঃসন্ধি শুরু হয়। সেই সঙ্গে শুরু হয় তার দ্রুত বেড়ে ওঠা। শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসে আধিপত্য গড়তে থাকে তার মনস্তত্ত্বে। ওই বয়সটাকে মানুষের জীবনে স্থায়ী মানসিক বিকাশের প্রারম্ভিক পর্যায় বলে বিবেচনায় আনা যায়। তখন একটা মেয়ের মানসিক পরিমণ্ডলকে সমাজ সামগ্রিকভাবে প্রভাবিত করতে শুরু করে। মেয়ের সামনে উন্মোচিত হতে থাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার দ্বার। দৈহিক, মানসিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে একটি মেয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক জগতে প্রবেশ করে।

বয়ঃসন্ধিকাল খুব গুরুত্বপূর্ণ সময় মানুষের জীবনে। যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এই বয়সে ব্যাপকভাবে তরঙ্গায়িত হয় মেজাজের অস্থিরতার জন্য। এখুনি ভীষণ ভাললাগা থেকে গৃহীত সিদ্ধান্তে পরক্ষণেই আসে পরিবর্তন। হরমোনজনিত কারণে এই বয়সে মানসিক সাম্যাবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখা দুরূহ হয়ে পড়ে। ভাললাগা, মন্দলাগার কোন নির্দিষ্ট আকারের লেখচিত্র থাকে না। এই সময়টাতে আপন শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে তারা অতিরিক্ত প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে যার ফলে এক ধরনের ভুলবশত স্ববিরোধী আচরণে অভ্যস্ত হতে থাকে অনেকেই। না মেনে চলার একটা নেতিবাচক মনোভাব বলিষ্ঠ হতে থাকে। অভিভাবকের সঙ্গে সমন্বয়সাধন করে চলার মানসিকতায় তারা দৃঢ় হতে পারে না। যার ফলে বিব্রত হোন অভিভাবকরা। অনেকের সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে মেয়েরা। কখনও কখনও ভয়াবহ নিঃসঙ্গতায় বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে তারা। দীর্ঘায়িত হতে থাকে বন্ধু সমাজ। বর্তমান সময়ে আরেক ভয়াবহ প্রভাবক হয়ে উঠেছে সামাজিক মাধ্যম। বয়ঃসন্ধিকালে সবচেয়ে সহজ উপায়ে মানসপটে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলছে সামাজিক মাধ্যমগুলো। অথচ মেয়েরা অবলীলায় আকৃষ্ট হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর প্রতি। পরিবারের চেয়ে বন্ধুবান্ধবের গ্রহণযোগ্যতা অনেকের কাছে ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। প্রেম ভালবাসার ভ্রান্ত ধারণায় প্রভাবিত হয়ে তারা সফল হতে চায়। সবকিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষায় ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে তাদের অন্তর্নিহিত সত্তা। পরিণামে সামনে এসে উপস্থিত হয় মাদকাসক্তি থেকে শুরু করে আত্মহত্যার প্রবণতার মতো ভয়াবহ সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যা।

বয়ঃসন্ধিকালের স্বাধীনচেতা মনোভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও এই মনোভাবে পরিবর্তন আনতে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হলো মা। ওই সময়টাতে মায়েদের মিত্রভাবাপন্ন হতে হবে মেয়েদের সঙ্গে। খুব শক্ত ও ঋজু মনোভাব মেয়ের মানসিকতার সঙ্গে যেন সাংঘর্ষিক না হয়ে পড়ে সেদিকে নজর দিতে হবে। মায়েদের হতে হবে আরও বেশি সমঝদার ও পল্লবগ্রাহী। প্রজন্মের দৃষ্টিকোণ থেকে বোধসম্পন্ন হতে হবে। মাথায় রাখতে হবে স্নেহ, মমতা, আবেগ, ভালবাসার উপরে যেন আদেশ, উপদেশ আর অভিযোগ না উঠে যায়। এমন একটা সম্পর্ক মেয়ের সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে যাতে করে বয়ঃসন্ধিকালের যে কোন বিমূর্ত, বাস্তব, নেতিবাচক অনুভূতি সে নির্দ্বিধায় মা’র সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে। মায়ের কাছে এই উপযুক্ত ও সমুচিত আশ্রয়টুকু পেলে মেয়ের বয়সজনিত মানসিক চাপের পতন ঘটবে যা হবে তার মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক।

বয়ঃসন্ধিকালে নিজ কল্পনার জগতে নিমজ্জিত থাকা মেয়েদের একটা সহজাত প্রবৃত্তি। মায়েদের এই সময় ও বয়স দুটোকেই বুঝতে হবে। বিক্ষুব্ধ হওয়া যাবে না। তাদের সঙ্গে আরও বেশি খোলামেলা আচরণ করতে হবে। ওই সময়টাতে অভিভাবক মায়ের চেয়ে বন্ধু মা বেশি প্রয়োজন। খুব বেশি উপদেশ ও শাসনের মাধ্যমে প্রতিবাদী, অবাধ্য না করে বন্ধুত্বের মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। এতটা বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ হতে হবে যাতে করে মায়ের কোন আচরণ থেকে পাওয়া মানসিক আঘাতটুকুও যেন মা’র সঙ্গে ভাগ করে নেয়া যায়। এই বয়সটাতে সন্তানের ভাললাগার বিশেষ যত্ন নিতে হবে। তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্নেহ, ভালবাসা দিয়ে ভুল ত্রুটির বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সন্তানের পরিচয়কে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে হবে যাতে করে সে একটা সমৃদ্ধ জীবনে বাস করতে পারে।

বয়ঃসন্ধিকালে একজন মা পারে প্রতিহত করতে অনেক সম্ভাবনাময় মৃত্যু। বয়ঃসন্ধিকালে মায়ের আচরণ একজন সন্তান থেকে পরিণত মানুষ হওয়ার রাস্তায় সবচেয়ে দামী পুস্তক। যে পুস্তকের প্রতিটি শব্দ সন্তানের মস্তিষ্কে সযত্নে আশ্রিত থাকে এবং যার প্রতিফলন ঘটে শেষ জীবনে। দেশ পায় একজন নাগরিক, আর পরিবার পায় একজন সন্তান।