১৮ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লাখ টাকার জামদানি, স্বকীয়তার গৌরব আভিজাত্যের ছোঁয়া

লাখ টাকার জামদানি,  স্বকীয়তার গৌরব  আভিজাত্যের ছোঁয়া
  • দশ দিনব্যাপী মেলা শিল্পকলায়

মোরসালিন মিজান ॥ সামনে ঈদ। কত রকমের কেনাকাটা! কিন্তু জামদানি তো জামদানিই। এর মতো স্পেশাল আর হয় না। বাঙালীর হারানো গৌরব মসলিনের উত্তরাধিকার জামদানি। নিজস্ব রুচি ও আভিজাত্যকে তুলে ধরছে। আজকের দিনে এ কাজে নানা প্রতিকূলতা। এর পরও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছেন রূপগঞ্জের কারিগররা। সারাবছর, হ্যাঁ, জামদানি পল্লীতে কাজ করেন। তাদের বুনা শাড়ি ঢাকায় আসে। আসে বটে। নকল আর সস্তার ভিড়ে প্রকৃত যা, খুঁজে নেয়া কঠিন হয়ে যায়।

এ অবস্থায় শৌখিন ক্রেতাদের জন্য দারুণ খবর এই যে, বংশ পরম্পরায় জামদানির কাজ করা শিল্পীরা রাজধানীর একটি মেলায় অংশগ্রহণ করেছেন। শিল্পকলা একাডেমিতে গত বৃহস্পতিবার থেকে চলছে বিশেষ এই জামদানি মেলা ও প্রদর্শনী। একাডেমির সহযোগিতায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন বিসিক-এর আয়োজন করেছে। চিত্রশালা প্লাজার নিচে বেশ কয়েকটি স্টল। যে যার মতো করে পসরা সাজিয়েছেন।

রবিবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অল্প পরিসরে জামদানির ভাল একটি সংগ্রহ। শাড়িগুলো এমনভাবে মেলে ধরা হয়েছে যাতে জমিনটা সুন্দর দৃশ্যমান হয়। কাপড়ের গায়ে কেমন যেন মায়া লেগে আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন চাকচিক্য নেই। হালকা মিষ্টি রং। চোখে এক ধরনের আরাম দেয়। জমিনে কারিগরদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বহির্প্রকাশ ঘটেছে। পাড় এবং আঁচলে করা হয়েছে আলাদা ডিজাইন। এভাবে শাড়িগুলোকে স্পেশাল করে তোলার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। জামদানিগুলোতে বিভিন্ন লোকজ ফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে। কটন ও হাফসিল্ক কাপড়ে ফুল পাতা মাছ পাখি ইত্যাদির ফর্ম। অনেকেই জানেন, এসব ফর্মের সঙ্গে মিল রেখে জামদানির নামকরণ করা হয়। এই যেমন জলপাড়, পান্নাহাজার, দুবলাজাল, সাবুরগা, বলিহার, শাপলাফুল, ময়ূরপ্যাঁচপাড়, বাঘনলি, কলমিলতা, চন্দ্রপাড়, ঝুমকা ইত্যাদি।

খ্যাতিমান জামদানি শিল্পী সবুজ মিয়া ছিলেন নিজের স্টলেই। জনকণ্ঠকে তিনি বললেন, ‘কিছু ডিজাইন আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকেই আছে। যেমন ধরেন আঙ্গুরলতা, করলা পাড়, ইঞ্চি পাড়, পানপাতা পাড়, বেলপাতা পাড়, হাঁসফুল, জুঁই ফুল, সন্দেশ ফুল, পোনা ফুল, হজপাতা তেড়ছি, ডালিম তেড়ছি- এইরকম আর কী।’ নিজের হাতে তৈরি কয়েকটি শাড়ি ভাঁজ খুলে এই প্রতিবেদককে দেখান তিনি। জড়িযুক্ত গর্জিয়াস একটি শাড়িতে জুঁই ফুল ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা। তার ভাষায়Ñ জুঁই ফুলের ঝুপ্পা। ঘন কাজ করা শাড়ির দাম ৬০ হাজার টাকা বলে জানান তিনি। আরেকটি শাড়িতে ছোট ছোট সূক্ষ্ম কাজ করা হয়েছে। নাম হাজার বুটি। দাম ২৫ হাজার টাকা। ভাল জামদানি বিবেচনায় এমন দাম খুব স্বাভাবিক। এর পরও সাধারণ ক্রেতার কথা ভেবে জানতে চাওয়া, এত বেশি কেন দাম? উত্তরে তিনি বলেন, ‘এই শাড়িগুলো, ভাই, দেড় থেইকা দুই মাস ধইরা বুনতে অইছে। একসাথে দুইজন মানুষ কাজ করে। আরও তো খরচ আছে। এর চেয়ে কমে আমি চাইলেও দিতে পারি না।’ লামহা জামদানি হাউস নামের একটি স্টলে কথা হয় তরুণ ফারদিন রহমান সামির সঙ্গে। এ প্রজন্মের হয়েও পৈত্রিক পেশা ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি। ময়ূরকণ্ঠী নামের একটি শাড়ি নামিয়ে দেখালেন তিনি। বললেন, ‘ময়ূরের পেখমের মতো রং বলেই এমন নামকরণ।’ আঁচলে আবার বহুকালের পুরনো কলকা ডিজাইন। দাম ৭০ হাজার টাকা বলে জানান তিনি। মাছের মোটিভ ব্যবহার করে বুনা অন্য একটি শাড়ির দাম তারও বেশি। সবচেয়ে বেশি কত দামের শাড়ি আছে আপনার কাছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কয়েকটা শাড়ি আছে, দাম পড়বে ১ লাখ টাকার ওপরে।’ তবে তেমন ক্রেতা না পেলে দেখাতে চান না বলে জানান তিনি। সালাম জামদানি উইভিং নামের একটি স্টলে বসেছিলেন সালাম নিজেই। মধ্যবয়সী। স্টলের মালিক তিনি। বললেন, ‘৮ বছর বয়স থেকে নিজের হাতে জামদানি বুনছি।’ এই শিল্পীর করা একটি ডিজাইন দেখে তার সৃজনশীলতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেল। যে ‘মাক্কু’ আঙ্গুলে চেপে ধরে জামদানি বুনা হয় সেটির ফর্ম শাড়িতে অতি চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন তিনি। বললেন, ‘কোন ডিজাইন কম চললে, সেইটা বাদ দিয়া দেই। নতুন কিছু করি। এইরকম করতে গিয়া একদিন মনে হইল মাক্কুর ডিজাইন করমু। করার পর অনেকেই প্রশংসা করতেছে!’ কিন্তু ক্রেতা কেমন জামদানির? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এইটা আসলে সবার না। শৌখিনগো জিনিস। শুধু পয়সা থাকলেই হয় না, সেইরকম রুচি লাগে।’ দেশে এমন ক্রেতা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ কারণেই টিকে আছি আমরা।’

রবিবার বিকেলে মেলায় এসেছিলেন এনআইটিতে ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়ুয়া শিক্ষার্থী রিচি। খুব নীরবে শাড়ি দেখছিলেন তিনি। এক ফাঁকে জনকণ্ঠকে বললেন, জামদানি আমাদের দেশের গৌরব। মেয়েদের স্পেশাল পছন্দ। ড্রিম বলতে পারেন। মেলা ঘুরে সূক্ষ্ম কিছু কাজ দেখলাম। ভীষণ ভাল লেগেছে। একইসঙ্গে মেলায় এসেছিলেন ইউল্যাবের শিক্ষার্থী তাজিন। তিনিও চুপচাপ ধরনের। কথা না বলে দেখছিলেন শুধু। দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, অধিকাংশ শাড়ি আসলে দেখার মতো। সূক্ষ্ম কাজ করেছেন শিল্পীরা। এত সূক্ষ্ম কাজ কী করে সম্ভব ভেবে পাচ্ছি না। পরে আবারও পছন্দের শাড়ির খুঁজে মন দেন তিনি।

অবশ্য মেলায় বিক্রি খুব ভাল এমনটি বলা যাবে না। স্টলমালিকদের কেউ কেউ দুঃখ করে বললেন, ‘আমাগো লোকজন কত বোকা দেখেন, বেশি টাকা দিয়া পাকিস্তানের কাপড় কিনে। হিন্দী সিরিয়াল দেখে ডিজাইন পছন্দ করে। অথচ নিজেদের জামদানি চিনে না! এইটা অন্যরকম সাধনা। টাকাওয়ালারাও এই সাধনার মূল্য দিতে চায় না। কারিগরদের অভিযোগ, একেবারেই অস্থানে মেলাটি আয়োজন করা হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমির খোলা প্রাঙ্গণে কত বারোয়ারি মেলার হয়। অথচ বাঙালীর গৌরবের জামদানি শিল্প সেখানে স্থান পায়নি। দুটি বড় ভবনের আড়ালে ছোট্ট সরু জায়গা। দায়সারা গোছের আয়োজন। বাইরে থেকে বোঝাই যায় না এখানে মেলা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, বিসিক বরাবরই এমন দায়সারা গোছের কাজ করে থাকে। বাঙালীর এমন গৌরবের ধন তুলে ধরার সচেতন চেষ্টা তাদের মধ্যে দেখা যায় না। আজ সরকারি এক প্রতিষ্ঠানের গ্যারেজে, কাল আরেক প্রতিষ্ঠানের বারান্দায় জামদানি মেলার আয়োজন করে। প্রচারের কোন ব্যবস্থা রাখা হয় না। এসব কারণে কারিগরদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। অবশ্য এখনও ঈদের বেশ কিছুদিন বাকি আছে। তাই বিক্রেতারা হাল ছাড়ছেন না। আশা- প্রকৃত জামদানির খোঁজ খবর যারা রাখেন তারা মেলায় আসবেন মেলায়। সমৃদ্ধ এই আয়োজন চলবে আগামী শনিবার পর্যন্ত।

নির্বাচিত সংবাদ