২৬ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিরোপার সুবাস পাচ্ছে বসুন্ধরা কিংস!

রুমেল খান ॥ ইংরেজ আমলে ১৯১৫ সাল থেকে ঢাকায় প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ শুরু হয়। পাকিস্তান আমলে ঢাকায় প্রথম লীগ শুরু হয় (ঢাকা লীগ) ১৯৪৮ সাল থেকে। আর বাংলাদেশ আমলে প্রথম লীগ শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকে। ১৯৯৩ সালে নাম বদলে প্রিমিয়ার ডিভিশন লীগ এবং ২০০৭ সালে নাম বদলে ‘বি’ লীগ ২০০৯ সালে ‘বাংলাদেশ লীগ’ এবং ২০১২ সালে নতুন নামকরণ হয় ‘বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ’ (বিপিএল) নামে।

২০০৭ সালে যখন ‘বি’ লীগ শুরু হয়, তখন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সদর্পে ঘোষণা দিলো- এই লীগের মাধ্যমে পেশাদার ফুটবলের যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। কিন্তু হাস্যকর ও দুঃখজনক হলেও সত্য- কোন ক্লাবই পেশাদার হিসেবে নিজেদের শতভাগ প্রমাণ করতে পারেনি (কিছুটা কাছাকাছি গিয়েছিল শেখ জামাল ধানম-ি)। একযুগ পরেও চিত্রটা খুব একটা বদলায়নি। তবে একটি ক্লাব ব্যতিক্রম। তাদের এখনই বলা যায় শতভাগ পেশাদার ক্লাব। ক্লাবটির নাম হচ্ছে বসুন্ধরা কিংস। যারা এখন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ ফুটবলের একাদশ সংস্করণের পয়েন্ট টেবিলে অবস্থান করছে শীর্ষে। সামনে কোন অঘটন না ঘটলে নবাগত এই ক্লাবটিই যে প্রথমবারের মতো লীগ-শিরোপার স্বাদ পেয়ে বাজিমাত করতে যাচ্ছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

ফুটবলে যুগে যুগে সবদেশেই একেক সময় একেক ক্লাব শক্তির উত্থান ঘটে। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। স্বাধীনতার আগে চল্লিশ এবং পঞ্চাশের দশকে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সফল ক্লাব ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। ভিক্টোরিয়া, ওয়ারী, এবং জিমখানার মতো শক্তিশালী দলকে টপকে তারা সাতবার লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ষাটের দশকে এলো মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। একের পর এক সাফল্য কুড়িয়ে নেয় স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত। এ সময় তারা সাতবার লীগ শিরোপা জেতে। ওই সময় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ভিক্টোরিয়া এবং ইস্ট পাকিস্তান আইডিসি। সত্তর থেকে নব্বই দশক পর্যন্তও সাফল্য অব্যাহত থাকে মোহামেডানের। এ সময় তারা আরও ১২ বার লীগ জেতে। কিন্তু ষাট দশকের মতো একচ্ছত্র আধিপত্য দেখাতে পারেনি। তাদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয় আবাহনী ক্রীড়া চক্র (পরবর্তীতে ঢাকা আবাহনী লিমিটেড)। সত্তর দশকের শুরুতে যাত্রা করা এই ক্লাবটিকে বলা হয় বাংলাদেশের আধুনিক ফুটবলের ধারক-বাহক। সত্তর থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত তারা লীগ জেতে ১০ বার। এই সময় মোহামেডান-আবাহনীর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ব্রাদার্স, বিজেএমসি এবং মুক্তিযোদ্ধা। একবিংশ দশক থেকে সাংগঠনিক কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে মোহামেডান। এর বিপরীতে আবাহনী আরও শক্তিশালী হয়ে আরও সফলতা অর্জন করে। লীগ জেতে সাতবার। এর মধ্যে পেশাদার লীগের শিরোপাই ৬টি। এ সময় আবাহনীর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল শেখ জামাল ধানম-ি এবং শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র। এখন আবাহনীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে নবাগত দল বসুন্ধরা কিংস।

এবারের লীগ জিতলে হ্যাটট্রিক করতে পারত আবাহনী। কিন্তু তাদের সেই সুনীল স্বপ্নকে বলতে গেলে একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে ‘দ্য কিংস’ খ্যাত বসুন্ধরা। রবিবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে তারা ১-০ গোলে হারায় আবাহনীকে। লীগের প্রথম পর্বেও আবাহনীকে ৩-০ গোলে হারের তেতো স্বাদ দিয়েছিল তারা।

এই জয়ের ফলে বসুন্ধরার জন্য এখন লীগ চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা অনেকটাই সহজ হয়ে গেল বলে মনে করছেন ফুটবলবোদ্ধারা। কেননা পয়েন্ট টেবিলের দুই নম্বরে থাকা আবাহনী তাদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে ৭ পয়েন্ট। আবাহনীর পক্ষে এই ৭ পয়েন্ট কভার করা খুব একটা সহজ হবে না। সেক্ষেত্রে বসুন্ধরাও নিশ্চয়ই বাকি ম্যাচগুলোতে পয়েন্ট নষ্ট করে আবাহনীকে সুযোগ দিতে চাইবে না।

নিজেদের চতুর্দশ ম্যাচে এটা ছিল কিংসদের ত্রয়োদশ জয়। আগের ১ ড্রতে তাদের পয়েন্ট ৪০। স্বাভাবিকভাবেই পয়েন্ট টেবিলের এক নম্বরে তারা। এই লীগে একমাত্র তারাই এখনও কোন ম্যাচ হারেনি। দুইয়ে থাকা আবাহনীর সংগ্রহ ১৪ ম্যাচে ৩৩ পয়েন্ট। ১১ জয়ের পাশাপাশি ৩ ম্যাচে হেরেছে তারা। এর দুটিই আবার বসুন্ধরার কাছে! তিনে থাকা শেখ রাসেলের সংগ্রহ ১৩ ম্যাচে ৩০ পয়েন্ট। রাসেল চ্যাম্পিয়ন হবে ... এমন দুরাশা করছেন না তাদের সমর্থকরা। আর বাকি দশ দলের তো প্রশ্নই ওঠে না!

বসুন্ধরার শক্তির মূল কারণ প্রতিটি পজিশনেই আছে যোগ্য ও বিকল্প ফুটবলার। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের তারকা ড্যানিয়েল কলিনড্রেস আছেন মিডফিল্ডার হিসেবে, থাইল্যান্ড লীগে খেলে আসা ব্রাজিলিয়ান ভিনিসিয়াস আছে ফরোয়ার্ড হিসেবে। আরও আছেন মাহবুবুর রহমান সুফিল। রক্ষণভাগে আছেন সুশান্ত ত্রিপুরা, নাসির উদ্দিন চৌধুরী, রেজাউল করিম রেজা, দিদারুল আলম, স্প্যানিশ গিওর্গি গোটর ও নুরুল নাঈম। মধ্যমাঠে আছেন সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া ইমন মাহমুদ বাবু, মাসুক মিয়া জনি, মোহাম্মদ ইব্রাহিম, হেমন্ত ভিনসেন্ট বিশ্বাস, মতিন মিয়া, গোলরক্ষণে আনিসুর রহমান জিকো ও মিতুল হাসানের মতো কুশলী খেলোয়াড়।

দলের কোচ স্পেনের অস্কার ব্রুজোন। যিনি এর আগে ছিলেন মালদ্বীপের নিউ রেডিয়েন্টের কোচ। মধ্যবর্তী দল বদলে বসুন্ধরা তাদের কোন খেলোয়াড়কেই ছাড়েনি। বরং তিন নতুন ফুটবলারকে নিয়েছে। গোলরক্ষক হিসেবে নিয়েছে নুরুল করিমকে, যিনি প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে কদিন আগেই নেপালের ফ্রেন্ডস ক্লাবে খেলে এসেছেন। এছাড়া নিয়েছে শেখ রাসেল থেকে মাকসুদুর রহমান এবং ত্রিনিদাদ এ্যান্ড টোবাগোর উইলিস ডেয়ন প্লাজাকে, যিনি ভারতের চার্চিল ব্রাদার্সে খেলতেন।

২০১৩ সালে গঠিত হয় বসুন্ধরা কিংস। ২০১৬ সালে পাইওনিয়ার লীগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দলটি তৃতীয় বিভাগ ফুটবলে উত্তীর্ণ হয়। তবে দলটি দ্বিতীয় স্তরের বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লীগে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং কিছু শর্ত পূরণ করার পর দলটি সেটার জন্য উত্তীর্ণ হয়। ২০১৭ বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লীগের শিরোপা জিতে ক্লাবটি বাংলাদেশ ফুটবল প্রিমিয়ার লীগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। ২০১৮ ফেডারেশন কাপে অংশ নিয়ে ফাইনালে ৩-১ গোলে ঢাকা আবাহনীর কাছে হেরে রানার্সআপ হয় বসুন্ধরা। এর মাধ্যমেই তারা জানান দেয় নিজেদের শক্তির ও আগমনী বার্তার। এর কিছুদিন পরেই স্বাধীনতা কাপে ফাইনালে শেখ রাসেলকে ২-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের প্রথম শিরোপা অর্জন করে।

এখন দেখার বিষয়- এবারের লীগ-শিরোপা জিতে নিজেদের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় শিরোপার মধুর স্বাদ পেতে পারে কি না বসুন্ধরা কিংস।

পয়েন্ট টেবিল

দল ম্যাচ জয় ড্র হার গোল পয়েন্ট

বসুন্ধরা ১৪ ১৩ ১ ০ ৩০/৭ ৪০

আবাহনী ১৪ ১১ ০ ৩ ৩০/১৩ ৩৩

শেখ রাসেল ১৩ ৯ ৩ ১ ১৯/৫ ৩০

সাইফ ১৪ ৯ ২ ৩ ২২/১২ ২৯

আরামবাগ ১৩ ৬ ১ ৬ ১৬/১৪ ১৯

চট্ট. আবাহনী ১৪ ৪ ৫ ৫ ১৩/১৪ ১৭

মুক্তিযোদ্ধা ১৪ ৪ ৪ ৬ ১৭/১৮ ১৬

শেখ জামাল ১৪ ৩ ৬ ৫ ১৩/১৮ ১৫

রহমতগঞ্জ ১৪ ৩ ৬ ৫ ১৬/২২ ১৫

মোহামেডান ১৪ ৩ ৩ ৮ ১১/২৪ ১২

নোফেল ১৩ ২ ৩ ৮ ৬/১৭ ৯

ব্রাদার্স ১৩ ২ ২ ৯ ৮/২৩ ৮

বিজেএমসি ১৪ ০ ৪ ১০ ৩/১৭ ৪