২৫ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৭১ এর এই দিন ॥ ২২ মে ১৯৭১ ॥ ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর গ্রেনেড আক্রমণ

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ২২ মে দিনটি ছিল শনিবার। বাঙালীর এ সংগ্রাম বাংলার সাড়ে সাত কোটি নরনারীর মুক্তির সংগ্রাম। বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি আন্দোলনের এ ধারা দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে। এ সংগ্রামের সাফল্যের জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অকাতরে প্রাণ দিচ্ছে। বাংলার নারীরা পিছিয়ে নেই। তারা স্বাধীনতার লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে। তাই ইতিহাসের পাতায় বীরাঙ্গনা খাওলা, চাঁদ সুলতানা থেকে শুরু করে জামিলা বোখারদ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার আর লায়লা খালেদের পাশে বাংলার নারীরা নিজেদের নাম যুক্ত করতে শুরু করেছে। এই দিন ক্যাপ্টেন আবদুল হকের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলা দল কুমিল্লার শালদা নদী এলাকায় অবস্থানরত পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষা ঘাঁটির ওপর আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে ৪ জন পাকসেনা নিহত ও ১১ জন আহত হয়। ইতোপূর্বে কয়েকবার ব্যর্থ হওয়ার পর আবুল হাসেমের নেতৃত্বে ও বিডিআর সদস্য ফরহাদের সহায়তায় ৪টি কোম্পানির সম্মিলিত প্রয়াসে রাশিয়া কর্তৃক প্রদত্ত অত্যাধুনিক বিস্ফোরক দ্রব্যের মাধ্যমে নালিতাবাড়ী ব্রিজটি ধ্বংস করা হয়। সুনামগঞ্জের জোয়াই নামক এক নিভৃত পার্বত্য এলাকায় মুক্তিযাদ্ধাদের ২৮ দিনের একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। ‘সীমান্ত গান্ধী’ হিসেবে পরিচিত খান আবদুল গাফফার খান বলেন, বাঙালীরা জয়লাভ করেছে সারা পাকিস্তানের নির্বাচনে। এখন তাদের ওপর দোষারোপ করা হচ্ছে, তারা পাকিস্তান ভেঙে দিতে চায়। আরও বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের ৬দফা কর্মসূচী পাকিস্তানের অখ-তার পক্ষে বিপজ্জনক। ৬ দফা যদি পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে বিপজ্জনক হয়, তাহলে সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ কেন গোড়াতেই এর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেনি? ৬দফার ওপর ভিত্তি করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। এ ছাড়া ইয়াহিয়া খান যখন ঢাকা যান এবং শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাত করেন, তখন তিনি মুজিব সাহেবকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বলে ঘোষণা করেছিলেন। ৬দফা যদি পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে বিপজ্জনক হয় তাহলে এসব কথার অর্থ কী? আসল কথা হলো, মুজিব সাহেব নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন এবং তারই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার কথা। সীমান্ত গান্ধী আরও বলেন, পাকিস্তানী জনসাধারণের কাছে আমি এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ সব সময়ই ধর্মের নামে আমাদের সঙ্গে হঠকারিতা করেছে। তারা ইসলামের কথা বলে, অথচ আজ পূর্ব বাংলায় যা ঘটছে তা কি ইসলাম ও পাকিস্তানের কল্যাণের জন্য করা হচ্ছে? সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশের শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ লাখ ৭১ হাজার ৯৩১ জনে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে ঘোষণা করা হয়, পাকিস্তানের উন্নয়ন কাজে অর্থনৈতিক সাহায্য অব্যাহত রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির মিয়া তোফায়েল নতুন করে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন দাবি করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আব্দুল গফুর বি.এ.-কে আহ্বায়ক করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটি গঠিত হয়। চট্টগ্রামের লালদীঘিতে এক জনসভায় নেজামে ইসলামের মহাসচিব মওলানা সিদ্দিক আহমদ বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী ব্যক্তিদের তৎপরতা বন্ধ করার কাজে সেনাবাহিনীকে সাহায্য করা শুধু শান্তি কমিটির দায়িত্ব নয়। এই দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের। রংপুরে সাবেক এমএনএ সিরাজুল ইসলাম ও সাবেক এমপিএ আব্দুর রহমান এক যুক্ত বিবৃতিতে সেনাবাহিনীকে সমর্থনদানের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। এই দিন দ্য স্যাটারডে রিভিউ ’পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের যে মানুষগুলো গত বছরের বন্যার কারণে এখনও গৃহহীন এবং ক্ষুধাপীড়িত, তারাই এখন আবার মনুষ্যসৃষ্ট এক দুর্যোগের শিকার। তাদের দেশ পরিণত হয়েছে এক অনুমোদিত বধ্যভূমিতে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ আজ প্রায় শূন্যের কোঠায়। যারা জরুরী চিকিৎসা বা অন্যান্য সাহায্যে এগিয়ে আসতে চেয়েছিল তাদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এই বিদ্রোহের উদগিরণ অবধারিত ছিল। যদিও সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষেই রায় এসেছিল। ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকার জনতার এই রায়কে সম্মান দিতে শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং সামরিক বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে এর বাস্তবায়নকে বানচাল করেছে। ২৫ মার্চ রাতে শুরু করে আনুষ্ঠানিক হত্যাযজ্ঞ। ২৬ মার্চ ভোরে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও গ্রেনেড সজ্জিত সৈনিকরা সাঁজোয়া যান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘেরাও করে। অগণিত ছাত্র-শিক্ষককে হত্যা করে। সমগ্র ঢাকা শহরে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালায়। এখানে বর্ণিত ঘটনাগুলো যুবকবয়সী এবং শিক্ষিতদের ওপর চালানো ব্যাপক গণহত্যার এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগের কাছে উপরে বর্ণিত ঘটনাগুলো ছাড়াও আরও অসংখ্য ঘটনার প্রামাণ্য বিবরণ রয়েছে। ঢাকার আমেরিকান রাষ্ট্রদূত এবং এপিপি-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আমেরিকান চিকিৎসকরা এই বিস্তারিত বিবরণগুলো ওয়াশিংটনে প্রেরণ করেন। পাকিস্তানে পাঠানো আমেরিকান বন্দুক গোলাবারুদ ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বাঙালীদের ওপর আক্রমণের সময়। একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন থেকে পাঠানো অস্ত্রও ব্যবহৃত হয়েছে। উপদ্রুত এলাকায় খাদ্য, ওষধ এবং চিকিৎসক প্রেরণের সব প্রচেষ্টা ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকার বানচাল করতে সক্ষম হয়েছে। প্রত্যেক আমেরিকান নাগরিক এই প্রত্যাশা করতেই পারে যে যেখানে মানবাধিকারের প্রশ্ন জড়িত সেখানে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত জোরের সঙ্গে কথা বলবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানোর নৈতিক উপায় বের করতে পেরে থাকে তাহলে সেখানে খাদ্য ও জরুরী চিকিৎসা সাহায্য প্রেরণের ব্যাপারেও নৈতিক উপায় বের করতে পারবে। পিটিআই-এর বরাতে আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘ঢাকায় গ্রেনেড আক্রমণের কথা পরোক্ষে স্বীকার’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনী কর্তৃক খোদ ঢাকা শহরের বুকে গেরিলা আক্রমণ চালাবার যে সংবাদ ইতোপূর্বে ভারতে এসে পৌঁছেছিল পাকিস্তান পরোক্ষভাবে তা স্বীকার করেছে। আজ সকালে পাক বেতার থেকে বলা হয়, সামরিক আইন প্রশাসক এ বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নাশকতার কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। নাশকতার কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের ধরিয়ে দিলে পুরস্কার দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বেতার ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে যে ঢাকা শহরে গ্রেনেড ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দশ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সপ্তাহের গোড়াতে খবর পাওয়া গিয়েছিল যে, মুক্তিফৌজের কমা-ো দল ঢাকায় গবর্নরের বাসভবন, সিভিল সেক্রেটারিয়েট ও নিউ মার্কেটে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের ওপর হানা দিয়েছে। পিটিআই-এর বরাতে ন্যাশনাল হেরাল্ড পত্রিকায় ‘আগরতলা হাসপাতালে গণহত্যার প্রমাণ’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগরতলার জেনারেল হাসপাতালকে নির্দোষ পূর্ব পাকিস্তানীদের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অমানবিক নৃশংসতার একটি ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা যায়- পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত এলাকা ঘুরে আসার পর এমনটিই লিখেছেন একজন ইউএনআই সংবাদদাতা। ২৬০ শয্যার হাসপাতালটিতে রোগীদের স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। যাদের বেশিরভাগই ছিল হিংস্র পাকবাহিনীর শিকার। হাসপাতালটিতে ৫৩০ জন রোগী আছেন, যা এর ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। হৃদয়স্পর্শী ঘটনাগুলোর মাঝে ছিল একটি ১৩ বছরের ছেলে এবং একটি ৯ বছরের মেয়ের ঘটনা। দু’জনেই পাকিস্তানী শেলিং-এ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে। হালিদ হুসাইন সাহেবকে (২৭) তীব্র মানসিক ধাক্কা এবং অবসাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। তিনি ২৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম ছেড়ে আসেন যখন আর্মি শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং নির্বিচারে বাঙালী নিধন শুরু করে। তিনি রাজনীতিতে একেবারেই আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু নিজের লোকদের হত্যাকা- দেখার পর তিনি মুক্তিফৌজে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সুসজ্জিত দখলদার বাহিনীর কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়া কি মুক্তিফৌজের পক্ষে সম্ভব হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে হুসাইন সাহেব মনে করিয়ে দিলেন, শক্তিশালী ফ্রান্সের সঙ্গে আলজেরিয়ান এবং তিউনিশিয়ান বাহিনীর যুদ্ধের কথা। তিনি বলেন- যদি এই দেশগুলো স্বাধীনতা জিতে নিতে পারে তবে মুক্তিফৌজও পাকিস্তানী আর্মির কাছ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পারবে। পাকিস্তানী বুদ্ধিজীবীদের একদল ত্রিপুরা শহরের নরসিংহ রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিলেন। একজন বলেন, পাকিস্তানী আর্মির লক্ষ্য ছিল সব বুদ্ধিজীবী, টেকনিশিয়ান, ব্যবসায়ী এবং শিল্পীদের নিঃশেষ করে দেওয়া। তারা শুধু কিছু গোলাম বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছে। ভিক্ষু মহাদেব জ্যোতি পাল, পাকিস্তানের বুদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান বলেন যে- তিনি যে আশ্রমে বসবাস করতেন, সেটি এবং তার চারপাশের গ্রাম পাক আর্মি গত মাসে জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাঁরা ৬ জন তরুণ ভিক্ষুকে হত্যা করেছে। মিস নোমিতা ঘোষ, ঢাকা রেডিওর একজন শিল্পী, তিনি বলেন, ঘরে আগুন লাগানোর পূর্বে সৈন্যরা অল্পবয়সী মেয়েদের ধরে নিয়ে যেত। সাবরুম থেকে সংবাদদাতারা ফেনি নদীর ওপারের শহর রামগড়কে কসাইখানা হয়ে থাকতে দেখেছেন। নদী তীরের সব কুঁড়েঘরগুলো পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। একমাত্র অক্ষত কাঠামো হিসেবে সরকারী বিল্ডিংয়ের ওপর একটি একাকি পাকিস্তানী পতাকা উড়ছিল। হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড ’করিমগঞ্জ সীমান্তে পাকিস্তানী সৈন্য সমাবেশ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, পাকিস্তানী সেনারা অসম সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। এ বিষয়ে আলোচনায় একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হাউসে বলেন, এই সরকার করিমগঞ্জের উল্টোপাশে পাকিস্তানী সেনাদের জড়ো হওয়ার ব্যাপারে অবগত আছে- সেখানে তারা কাসুরিয়া নদীর পাড়ে বাংকার তৈরি করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তিনি করিমগঞ্জ সীমান্তজুড়ে পাকিস্তানের প্রস্তুতি সংক্রান্ত ব্যাপারে হাউসের সদস্যদের অনুভূতি প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে অবহিত করবেন। এর আগে হাউসের সদস্যরা অসমের করিমগঞ্জ সীমান্ত শহরজুড়ে পূর্ববাংলার জাকিগঞ্জে পাকিস্তানী সৈন্যদের জড়ো হওয়ার খবর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইউএনআই যোগ করেছে : বুধবারে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ৭০০০ এর বেশি শরণার্থী অসম-এর মিজো পাহাড় জেলায় এসেছে। ২৫ মার্চ যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে মিজো পাহাড় অঞ্চলে এটাই বড় আকারের শরণার্থী অন্তঃপ্রবাহ।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com