১৮ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ অসতর্কতা নাকি দায়িত্বহীনতা!

  • এএইচএম শহীদুল ইসলাম (ছুট্টু)

AMORI BANGLA BHASHA/ VASHA

দুটি শব্দ ‘জয়ের লড়াই’। Roman হরফে লিখতে গিয়ে একটি করা হয়েছে ‘#JOYERLORAI’।

BPL ক্রিকেটের অন্যতম দল Rangpur Riders-এর একটি দৃষ্টিনন্দন ছোট Billboard-এর উপরিভাগে ছাপানো। বাংলায় কিছু লেখা নেই।

যে কারণে ভাষা শহীদেরা বুকের রক্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভিত রচনা করে গিয়েছেন, যার ধারাবাহিকতায় ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আজকের বাংলাদেশ, তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। এমনিতেই Digital প্রজন্ম Roman হরফে ‘বাংলা’ বার্তা আদান-প্রদানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। তদুপরি যখন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে একই প্রবণতা লক্ষ্য করবে, তখন তো ভেবেই নেবে যে ওতে দোষের কিছু নেই! এ ব্যাপারগুলোতে যথেষ্ট সাবধাণতার প্রয়োজন রয়েছে।

পোস্টারটিতে প্রথমে বাংলায় ‘জয়ের লড়াই’ অথবা ‘#জয়ের লড়াই’ লিখে তার নিচে ‘#JOYERLORAI’ দিয়ে দিলেই হতো। আমি ক্ষেত্রবিশেষে ইংরেজী বা অন্য ভাষা ব্যবহারের বিরুদ্ধে নই। তবে বাংলা ব্যবহার অবধারিত? নইলে বিদেশীরা যদি ভাবে আমরা বোধহয় অনেক জাতির মতো Roman অক্ষর বেছে নিয়েছি, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যেমন- মালয়েশিয়ায় Bahasa, Danda, Kanak kanak, Keluar, Pintu, Salamat datang, Tandas, Teksi, Terima kasih বা ইন্দোনেশিয়ায় Apa kabar, Antara, Maaf, Nama saza, Nusuntara, Permisi, Pertamina ইত্যাদি।

জুডো-কারাতের টুর্নামেন্টে প্রথমে বাংলা তারপর জাপানী তারপর ইংরেজী। ফরাসী সাহিত্য, সৌরভ, খাদ্য বা পোশাক-পরিচ্ছদের প্রদর্শনীতে প্রথমে বাংলা, তারপর ফরাসী তারপর ইংরেজী। মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত কিছু হলে প্রথমে বাংলা, তারপর আরবী তারপর ইংরেজী এভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। অর্থাৎ বাংলা অবশ্যই থাকতে হবে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ নির্ধারিত বাস স্টপেজগুলোতে বাংলায় ‘বাস স্টপেজ শুরু’ এবং ‘বাস স্টপেজ শেষ’ লেখা নির্দেশিকা স্থাপন করেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের TEC ভুল বানানে ‘BUS STOPAGE’ লিখে স্থাপন করেছে। কিছু লেখারই প্রয়োজন নেই। কারণ, বাসের ছবিতেই বোঝা যায় যে এখানে বাস থামবে। যেহেতু বাসের ছবিতে কোন আড়াআড়ি দাগ দেয়া নেই।

DOHS এলাকার প্রবেশদ্বার, লেন নম্বর ইত্যাদিতে ইংরেজীর প্রাধান্য লক্ষণীয়। উপরে বাংলা, নিচে ইংরেজী এভাবে লেখা উচিত। Krishibid Institution Bangladesh’ জ্বলজ্বল করছে খামারবাড়ি এলাকার সর্বাধুনিক সুরম্য স্থাপনায়। বাংলায় কিছু নেই! একজন খ্যাতিমান স্থপতি প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন Talk Show আলোচনায়।

Superstore গুলোতে ঢুকলে মনে হয় বিলাতি কোন শহরে আছি কিনা! দেয়ালে সুন্দর সুন্দর বাণী, সব ইংরেজীতে লেখা!

বাণিজ্যিক এলাকা, আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত সব প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট এমনকি পাড়ার একটি ছোট সেলুন বা জুসবারেও শুধু ইংরেজীতে লেখা সাইন বোর্ডে সয়লাব। সেই সঙ্গে ভুল তো আছেই । ‘Makeover’ হয়ে গেছে ‘Mecover’। পেঁয়াজ, রসুন ও হলুদ ছাড়া আর সব ধরনের মসলা ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য মিশিয়ে ১০১ পদের ‘চা বার’গুলোতে ‘নগদের’ ব্যাপারটা প্রথমেই সেরে ফেলার অনুরোধটি বড় করে লিখে রেখেছে, ‘PAY FIRST’! আমার তো মনে হয় জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও একই অবস্থা চলছে।

সিংহভাগ আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনের নামকরণ ও লেখা ইংরেজীতে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা কর্জ করে পিকআপ ভ্যান কিনেছে। কর্জ পরিশোধ না করা পর্যন্ত মালিকানা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের। দু’পাশের দরজায় সেটি লিখেছে ‘ল্যানকাবাংলা ফিন্যানসি লিঃ’ সাইন বোর্ড লেখার দোকানের বুদ্ধিতে যা কুলিয়েছে (Lan Ka Bangla Fi Nan Ce, এভাবে ভেবে) তাই লিখেছে! অন্য একটিতে লেখা দেখেছি, ‘Dhakametro? ‘Fianced bz... Leasing Co. Ltd..’ দেখেছি মিনি বাসের পেছনে। Coca Cola স্পন্সরকৃত দোকান/রেস্তরাঁর সাইন বোর্ড সগর্বে প্রচার করছে-‘CATTRING’, ‘SNAKS, ‘VERITIES’! এতে কোন সন্দেহ নেই যে, Catering’, ‘Snacks’ ও ‘Varieties’ শব্দগুলোর ওই ছিরি হয়েছে শুধুমাত্র দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে । ধারণা করছি, Coca Cola-র মতো প্রতিষ্ঠান নামী-দামী কোন বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানকেই দায়িত্বটি দিয়েছে, যারা কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেননি। আর যে সব দোকান/রেস্তরাঁয় সাইন বোর্ডগুলো টাঙানো রয়েছে, ওদের পক্ষে ’Parachute’ নারিকেল তেলের ‘ADVANCED’ বা ‘Lifebuoz’ সাবানের ‘ACTIV’ শব্দগুলোর মতো ‘Patent’/ ‘Copzright’ করা নেই। অর্থাৎ নিছক বানান ভুল, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের উদাসীনতায়?

বাংলা ও ইংরেজী বানান ভুলের এই বিড়ম্বনা থেকে পরিত্রাণের উপায় হতে পারে একটি ‘এ্যাপ’? কারণ এই প্রজন্ম ‘এ্যাপ’ ছাড়া অচল’ বাংলা একাডেমি থেকে এই ‘এ্যাপ’-এর মাধ্যমে যা লিখতে চায় তা পাঠিয়ে দেবে। নির্ধারিত ফির (খুবই সামান্য) বিনিময়ে বাংলা একাডেমি তা দেখে প্রয়োজনবোধে শুধরে দেবে। সঙ্গে একটি ট্র্যাকিং নম্বর, যা যে কেউ ভবিষ্যতে বাংলা একাডেমির পোর্টাল থেকে দেখে নিতে পারবে। ফলে কোন ভিজিটিং কার্ডে- Right Site of Agura Market Gulshan-2, Aveneu’ অথবা BAPEX’র কূপ খনন ক্ষেত্রে- ‘ড্রিলিং সাইড’ লেখা নির্দেশিকা চোখে পড়বে না।

বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ড, নির্দেশিকা, ব্যানার-ফেস্টুন ইত্যাদির ব্যাপারেও একটি নীতিমালা থাকা উচিত। বাংলায় বড় করে লিখে তার নিচে ছোট করে ইংরেজীতে। এ ব্যাপারে ‘হাতিরঝিল সমন্বিত প্রকল্প’ এলাকার সর্বশেষ নির্দেশিকাগুলো হতে পারে উৎকৃষ্ট উদাহরণ!

আর একটি প্রসঙ্গ, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবে এবং বিশেষ করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদ-আন্দোলন করে দেশ-বিদেশের নজর কেড়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ পোস্টার, ব্যানার-ফেস্টুন, গ্রাফিটি ইত্যাদিতে ইংরেজীর ব্যবহার। ‘We Want Justice’ তার মধ্যে সর্বাধিক। বোধহয় আন্তর্জাতিক পরিম-লের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে। ব্যাপারটা ওদের বোঝানো উচিত। ইংরেজী রাষ্ট্রভাষা নয় এমন দেশগুলোর প্রতিবাদ-আন্দোলনে কয়টি ইংরেজীতে লেখা পোস্টার, ব্যানার-ফেস্টুন, গ্রাফিটি ইত্যাদি দেখা যায়? প্রায় শূন্যের কোঠায়। সাম্প্রতিক ফরাসী ‘হলুদ গেঞ্জি’ বা আরব দেশগুলোর ‘আরব বসন্ত’ প্রতিবাদ-আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখ্য। বিদেশী গণমাধ্যম সংবাদ প্রচারের সময় নিজ দেশের ভাষায় সব বর্ণনা করে দেয়। সুতরাং বাংলায় লিখে প্রতিবাদ-আন্দোলন করলে তা বিদেশীরাও ঠিকই জানতে পারবে।

তেজগাঁও বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রয় সবই ইংরেজীতে লেখা । যুক্তিসঙ্গত কারণে অনেক স্থাপনার নাম ইংরেজীতে রাখা হয়। সেটি বাংলায় লিখে তার নিচে ইংরেজীতে লিখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উত্তর পাশে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবনগুলোর প্রবেশদ্বারে বড় বড় ইংরেজী হরফে লেখা, SHEESH MAHAL. মনে হয় কোন সামরিক শাসকের আমলের কর্মকা-! আমরা কত সুন্দর সুন্দর বাংলা নাম দেখি কাছাকাছি, ‘বনলতা’, ‘আশালতা’, ‘মাধবীলতা’ ইত্যাদি। এটির নাম কোনভাবেই ‘শীষ মহল’ হতে পারে না। কত গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর অবস্থিত অথচ আজ অবধি দলীয় নেতৃবৃন্দের কারও এটা পাল্টানোর কথা মনেই হলো না।

Mashrafe কেন জার্সির পেছনে ‘MASRAFE’ আর Shakib ‘SAKIB’ হয়ে গেছে, তাও বোধগম্য নয়। এমন আরও আছে মনে হয়। ওরা যদি বলে- আমরা ডাকনাম ওভাবে লিখিÑ সেটি ভিন্ন কথা।

ব্যাপারগুলোর প্র্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল মহলের প্রতি আহ্বান জানাই।

লেখক : মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া