১৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছয় মাসেও কাজ শুরু করতে পারেনি চার মোবাইল টাওয়ার কোম্পানি

  • ভয়েস কলের অস্পষ্টতাসহ নানা সমস্যায় সাড়ে ১৫ কোটি মোবাইল গ্রাহক

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ লাইসেন্স পাওয়ার ছয় মাস পরেও কাজ শুরু করতে পারেনি চার মোবাইল টাওয়ার কোম্পানি। যে কারণে মোবাইল নেটওয়ার্কে কলড্রপ, কথা চলাকালীন হুট করে সংযোগ কেটে যাওয়া, ভয়েস কলের অস্পষ্টতাসহ নানা সমস্যায় পড়ছেন দেশের প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি মোবাইল গ্রাহক। দিন দিন এসব সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি গ্রাহকের অপারেটর গ্রামীণফোনের সমস্যা বেশি।

টাওয়ার কোম্পানি হিসেবে লাইসেন্স পাওয়া চার প্রতিষ্ঠান হলো, ইডটকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিডেট, সামিট পাওয়ার লিমিটেড, কীর্তনখোলা টাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড ও এবি হাইটেক কনসোর্টিয়াম লিমিটেড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল অপারেটর ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত টাওয়ার কোম্পানির দ্বন্দ্বের কারণে টাওয়ার কোম্পানিগুলো কাজ শুরু করতে পারেনি। বিশেষ করে টাওয়ারের দাম নির্ধারণ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। এক্ষেত্রে গ্রামীণফোন তাদের টাওয়ারের দাম অনেক বেশি চাইছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

এদিকে, এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চলতি মাসেই টাওয়ার শেয়ারিং নিয়ে একটি গাইডলাইন তৈরির বিষয়টি চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, মোবাইল ফোন অপারেটরদের সঙ্গে টাওয়ার কোম্পানিগুলোর নানা বিষয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। এসব দ্বন্দ্ব নিরসনে আমরা একটি গাইডলাইন তৈরি করে দেব। গাইডলাইন অনুযায়ী সব কাজ হবে। তিনি জানান, শীঘ্রই গাইডলাইন তৈরির কাজ শেষ হবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, মোবাইল টাওয়ার অবকাঠামো ভাগাভাগি সংক্রান্ত কাজ শুরু না হওয়ার কারণে মোবাইল ফোনের গ্রাহকরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন। কিছুদিন আগে দুই সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়ে চিঠিও দেয়া হয়েছিল মোবাইল অপারেটদের। সেই সময়ও পার হয়ে গেছে। এখন আমাদেরই গাইডলাইন তৈরি করে দিতে হবে। এছাড়া আর কোন পথ নেই।

কীর্তনখোলা টাওয়ার বাংলাদেশের কর্পোরেট কমিউনিকেশন প্রধান তরিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে জানান, যে চারটি কোম্পানি টাওয়ার শেয়ারিংয়ের লাইসেন্স পেয়েছে, টাওয়ারের দামসহ অনেক বিষয়েই মোবাইল ফোন অপারেটরদের সঙ্গে তাদের মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। বিষয়টি বিটিআরসিও জানে। যে কারণে আমরা কাজ শুরু করতে পারিনি। তরিকুল ইসলাম বলেন, আমি যতদূর জানি চলতি মাসেই বিটিআরসির একটি গাইডলাইন তৈরি করে দেয়ার কথা রয়েছে। আমরা সেই অপেক্ষাতেই আছি। বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, গত ৬ থেকে ৮ নবেম্বর রাজধানী ঢাকার ১৫টি এলাকায় বিটিআরসি কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) পরীক্ষা চালায়। এতে যান্ত্রিকভাবে ৯০ সেকেন্ডের ৩ হাজার ৩০০টি কল করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, গ্রামীণফোনের কল ড্রপ হার ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, রবির ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ, বাংলালিংকের শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ ও রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গ্রামীণফোনে সংযোগের জন্য গড়ে ১০ দশমিক ১৪ সেকেন্ড সময় লেগেছে। পাশাপাশি রবিতে ৬ দশমিক ১৫ সেকেন্ড, বাংলালিংকে ৭ দশমিক ৬৯ সেকেন্ড ও টেলিটকে ৭ দশমিক ১১ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হয়েছে। ডায়াল করা নম্বরে সংযোগ পাওয়ার জন্য বিটিআরসির আদর্শ অপেক্ষার সময় ৭ সেকেন্ড। দেশের সবচেয়ে বেশি গ্রাহকের মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছেন।

এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অর্থ সঙ্কটে দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল ফোন অপারেটররা তাদের নেটওয়ার্কে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে পারেনি। এই অবস্থায় টাওয়ার বিক্রি থেকে যে অর্থ পাবে, তা যদি নতুন প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ করে তাহলে গ্রাহকরা উপকৃত হতে পারেন। তারা বলছেন, আইন অনুযায়ী লাইসেন্স পাওয়ার পর মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোকে চার টাওয়ার কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ভাড়া বা বৈধ পন্থায় টাওয়ার সেবা নিতে হবে। কিন্তু বিক্রি দূরের কথা, এখন পর্যন্ত টাওয়ারের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারেনি বিটিআরসি। এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী এক বছরের মধ্যে মোবাইল নেটওয়ার্কে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। এতে গ্রাহক সেবায় ব্যাঘাতসহ সরকারের ডিজিটাল কার্যক্রমও ভেস্তে যাবে। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, এর আগেও অপারেটরদের কারসাজিতে নম্বর পরিবর্তন না করে অপারেটর পরিবর্তন অর্থাৎ এমএনপি সেবা চালু করতেও দীর্ঘদিন সময় লেগেছে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়ের হস্তক্ষেপে চালু করা সম্ভব হয় ওই সেবা। একইভাবে লাইসেন্স পাওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কোন টাওয়ার কোম্পানি তাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে লাইসেন্স পাওয়া এক অপারেটর জানান, এরই মধ্যে তারা প্রতিটি কোম্পানি গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ কোটি টাকা খরচ করে ফেলেছেন। কার্যক্রম শুরু করা ই-ডটকোর এই বিনিয়োগ আরও অনেক বেশি। পুঁজি নিয়ে বিনিয়োগের জন্য অপেক্ষা করছে তিন কোম্পানি। কিন্তু সরকার ও অপারেটরদের কাছ থেকে কোন ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন না কেউ। মোবাইল ফোন অপারেটরদের সঙ্গে তাদের একাধিক বৈঠক হয়েছে। অপারেটররা কালক্ষেপণের জন্য বিদ্যমান টাওয়ারের ‘আকাশ-কুসুম দাম’ হাঁকাচ্ছে। নানা টাল বাহানা করছে। গতবছর নবেম্বর মাসে চারটি কোম্পানিকে মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার অবকাঠামো ভাগাভাগি সংক্রান্ত টাওয়ার শেয়ারিং লাইসেন্স দিয়েছে সরকার। যে চারটি প্রতিষ্ঠান টাওয়ার শেয়ারিং লাইসেন্স পেয়েছে সেগুলো হলো, ইডটকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিডেট, সামিট পাওয়ার লিমিটেড, কীর্তনখোলা টাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড ও এবি হাইটেক কনসোর্টিয়াম লিমিটেড। ইডটকো এরই মধ্যে তাদের অর্ধেক শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে ব্র্যাকের কাছে। বিটিআরসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় বিপুল ব্যয়ের পাশাপাশি টাওয়ারের অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যা, ভূমি ও বিদ্যুতের সঙ্কট ছাড়াও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় মানসম্মত টেলিযোগাযোগ সেবা দেয়ার লক্ষ্যে এ লাইসেন্স দেয়া হয়। এর ফলে মোবাইল টাওয়ার লাইসেন্স রোলআউটের ওপর ভিত্তি করে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো কোন নতুন টাওয়ার স্থাপন করতে পারবে না। এছাড়া এক অপারেটর আরেক অপারেটরের কাছে আর টাওয়ার ভাড়া দিতে পারবে না। তবে লাইসেন্স পাওয়া টাওয়ার কোম্পানির কাছে তাদের টাওয়ার বিক্রি করতে পারবে। এদিকে, লাইসেন্স পাওয়ার প্রথম বছরে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের সব বিভাগীয় শহরে সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে। দ্বিতীয় বছর জেলা শহর, তৃতীয় বছর ৩০ শতাংশ উপজেলা, চতুর্থ বছর ৬০ শতাংশ উপজেলা ও পঞ্চম বছর দেশের সব উপজেলায় টাওয়ার সেবা দিতে হবে। টাওয়ার শেয়ারিং লাইসেন্সের জন্য লাইসেন্স ফি ২৫ কোটি টাকা, বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় বছর থেকে বিটিআরসির সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি হবে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। এছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলে জমা দিতে হবে ১ শতাংশ হারে। লাইসেন্সের মেয়াদকাল ১৫ বছর।