২৫ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমের রাজ্যে কোথাও বৌভুলানী কোথাও জামাইপছন্দ

 আমের রাজ্যে কোথাও বৌভুলানী কোথাও জামাইপছন্দ
  • কল্পবৃক্ষের মধুফল সিঁদুর ফোঁটা আম

সমুদ্র হক ॥ বাঙালীর মধুমাসের মধুফল আম শুধু আমই নয়। আম নিয়ে আছে প্রাচীন ইতিহাস। আছে কিংবদন্তি। চিরন্তন হয়ে রয়েছে পাকা আমের মধুর রস। আছে গল্পকথা। যেমন সিঁদুর ফোঁটা আম। বাচনের তারতম্যে কখনও হয়ে ওঠে সিন্দুর ফোঁটা ও সিন্দুরী। কোন অঞ্চলে আবার সিন্দুরী আমের পরিচিতি সুন্দরী, বৌভুলানী, জামাই পছন্দ। বউয়ের মান ভাঙ্গাতে অথবা জামাই খুশি করতে নামের এই আবির্ভাব কি না এ নিয়ে সেদিনের নানা-নানি, দাদা-দাদি মজার গল্প শোনাতেন। গল্প যতই হোক প্রাচীন ইতিহাসে আম এসেছে বৈচিত্র্য নিয়ে। প্রাচীন শাস্ত্রের বর্ণনায় আম গাছ ‘কল্প বৃক্ষ’, যা ইচ্ছা পূরণের বৃক্ষে পরিচিতি পায়।

কত জাতের আম যে আছে! হিমসাগর, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, ফজলি, আশ্বিনী, খিরসাপাতি, মিছরিদানা, মোহনভোগ, রানীপছন্দ, কুঁইয়াপাহাড়, বোম্বাই ইত্যাদি। উদ্ভাবিত আমের মধ্যে আছে আম্রপালী, মহানন্দা, চন্দ্রমল্লিকা, গৌরমতি, ছাতাপরী, নাকফজলি, লক্ষ্মণ। বছর দশেক আগে রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আম ভাগ বসিয়েছে উদ্ভাবিত আমের তালিকায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) দুই জাতের আম উদ্ভাবন করেছে। বারি-১১ জাতটি বছরে তিনবার ফলে। এর সঙ্গে বারি-৪ জাত সংযুক্ত হয়েছে। এতসব আমের মধ্যে সিন্দুরী আম বিশেষভাবে নজর কাড়ে। অন্যান্য আমের ছাল সবুজ থেকে হলুদ বরণ হয়ে যায়। সিন্দুরী আমের উপরের অনেকটা অংশ ম্যাজেন্টা বা সিঁদুরের মতো রং হয়ে পাকতে শুরু করে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় বৈচিত্র্যের এই আমকে বলা হয় বৌ-ভুলানী, জামাই পছন্দ, রাজা ভোলানী, দাদা ভোগ, গোলাপ খাস। সিন্দুরী আমের বিশেষ রংই এনেছে এমন বাহারি নাম। এক জাতের আমের এতগুলো নাম সিন্দুরী আমেই মেলে।

প্রকৃতি ও জলবায়ুগত কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলের আমের স্বাদ আলাদা। অধিক মিষ্টত্বের সঙ্গে প্রচুর গ্লুকোজ ফ্রুকটোজ ক্যারোটিনসমৃদ্ধ ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, সাইট্রিক এসিড, ভিটামিন বি মেলে। আমের বোটানিক্যাল নাম ম্যানজিফেরা ইন্ডিকা। ফলের রাজা আমের এই দেশে আমের রাজ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী। বর্তমানে নওগাঁ রংপুর দিনাজপুর বগুড়া গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম লালমনিরহাট নীলফামারীতে ও সম্প্রসারিত হয়েছে আমের আবাদ। দেশে ফলের আবাদ হয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে শুধু আমের বাগানই প্রায় আশি হাজার হেক্টর।

আম উপমহাদেশের প্রাচীন ফল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে সম্রাট আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ দখল করেন। এক বাগানে বিশ্রামের সময় একটি ফলে। সুস্বাদ পেয়ে প্রাসাদের চার ধারে ওই গাছের বাগানে ছেয়ে দেন। সেই ফল ছিল আম। আমের পাতা ও মঞ্জরী (মুকুল) নিয়েও আছে লোককথা। কচিপাতার ডাল মঙ্গলকাজে ব্যবহৃত হয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে স্পেনের পরিব্রাজক প্রথম পর্তুগীজদের সঙ্গে আমের পরিচিতি এনে দেন। ধারাবাহিকতায় চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং ও আরব অভিযাত্রী ইবনে হানকাল আমের কথা উল্লেখ করেছেন। কিংবদন্তী আছে : প্রেমের দেবতা কিউপিড মানব হৃদয়ে প্রণয় জাগাতে তীরের অগ্রভাবে আমের মুকুল গেঁথে দিয়েছিলেন!

মোঘল সম্রাট আকবর আম দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করতেন। ফলন বাড়াতে বিহারের দ্বারভাঙ্গায় এক লাখ চারা রোপণ ও পরিচর্যা করেন। আজও এই বাগানের নাম ‘লাখ বাগ’। স¤্রাট জাহাঙ্গীর পেয়েছিলেন সিন্দুরী আমের স্বাদ। তিনিও সিন্দুরী বাগান করেন। স্থাপত্যশৈলী, চিত্রকর্ম, লোকসঙ্গীত, কবিতায় আম এসেছে নানা ভাবে। মণিকাররা সোনা রূপার বাহুবন্ধনীতে আমের আকৃতি বসিয়ে দেন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে আম গাছ পবিত্র। জাতকের ইতিহাস লেখা হয় আম গাছ ঘিরে। আমকে নিয়ে কথা এতে যে ফুরোবার নয়।

এশিয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে : হিমালয়ের উষ্ণমন্ডল ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উঁচুতে, কুমাউন থেকে ভুটান পাহাড়, বিহারের উপত্যকা খাসিয়া পাহাড়, ব্রহ্মদেশ, অযোধ্যা, পশ্চিম উপদ্বীপের খান্দেশ থেকে দক্ষিণ মুখে, বাংলা থেকে সিংহল পর্যন্ত পাহাড়ে বন্য আমগাছ দেখা যেত, অর্থাৎ বনেই ছিল আমগাছ। দিনে দিনে আম গাছ ছড়িয়ে পড়ে গোটা সমতল ভূমিতে। চীন, ব্রাজিল, ইতালি, তুরস্ক, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঞ্চলে আমের আবাদ হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের আমের স্বাদ ওসব দেশে নেই। আম হিসাব নিয়েও আছে মজার উপাখ্যান। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত বগুড়া অঞ্চলে আম বেচাকেনা হতো শতকিয়া হিসেবে। মিলত দুইশ’ আম। এক জোড়া আমে একটি গোনা হতো। এমন মজার হিসাব ছিল শুধু বগুড়াতেই। এই হিসাব আজ অতীত। বাজারে আম এসেছে। মধুমাসের মৌসুমে বাঙালীর প্রতিটি ঘরে আম যেন না হলেই নয়। শুধু বৌ ভুলানী জামাই পছন্দের সিন্দুরী আমই নয় সব জাতের আমই পরিবারের সবার পছন্দের।