২৬ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানসহ জড়িত ৬৭ জন

  রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানসহ জড়িত ৬৭ জন
  • এফআর টাওয়ারের নক্সা অনুমোদন ও নির্মাণ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর বনানীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এফআর (ফারুক-রূপায়ন) টাওয়ারের নক্সা অনুমোদন ও নির্মাণ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে সরকার। রিপোর্টে ভবনটি ২৩ তলা পর্যন্ত নির্মাণে অনিয়মের সঙ্গে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ূন খাদেম থেকে শুরু করে সদস্য ডি এম বেপারি সংস্থাটির পরিদর্শকসহ মোট ৬৭ জন জড়িত বলে চিহ্নিত করেছে গঠিত তদন্ত কমিটি। একইসঙ্গে আবাসন প্রতিষ্ঠানকেও দায়ী করেছে কমিটি। অপরদিকে রিপোর্টে রূপায়ন হাউজিং এস্টেট লিমিটেড কর্তৃক রাজউকে দাখিলকৃত এ ভবনের ২৩ তলার নক্সাটি অবৈধ ছিল। যার কোন ভিত্তি খুঁজে পায়নি কমিটি। নক্সাটি সংঘবদ্ধ চক্র কর্তৃক অবৈধভাবে জালিয়াতি করে সৃজন করা হয়েছে বলেছে কমিটি। এদিকে ১৮তলা পর্যন্ত ভবনটির অনুমোদন বৈধ থাকলেও উপরের ৫তলা ভবনটি সম্পূর্ণ অবৈধ। তাই এটি ভাঙ্গার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ও ভবনটি নির্মাণে অনিয়মের সঙ্গে চিহ্নিত সকল স্তরের কর্মকর্তা কর্মচারী ও আবাসন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে ও কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এমপি। বুধবার সচিবালয়ের গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের সামনে এ রিপোর্ট প্রকাশকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ শহীদ উল্লা খন্দকার, অতিরিক্ত সচিব মোঃ ইয়াকুব আলী পাটওয়ারী, স্থাপত্য অধিদফতরের প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসিরসহ তদন্ত কমিটির সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তদন্ত প্রতিবেদনে ৭ দফা পর্যালোচনা ও ১৫ দফা সুপারিশ প্রদান করেছে কমিটি। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ইয়াকুব আলী পাটোয়ারীকে আহ্বায়ক করে গঠিত ৮ সদস্যের তদন্ত কমিটি ঘটনার ৫৫ দিন পর এই রিপোর্ট জমা দিল। রিপোর্টে জানমালের ক্ষয় ক্ষতির জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দায়ী বলে শনাক্ত করা হয়েছে।

গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তি হিসেবে আমাদের কাছে অনেক সাক্ষ্য-প্রমাণাদি রয়েছে। তদন্তে অনেকগুলো অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে, সবমিলে আমরা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছি তাদের অভিযোগের থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ নেই। মন্ত্রী বলেন, এফ আর টাওয়ারের অবৈধভাবে নির্মিত অংশ ভেঙ্গে ফেলার জন্য আইনগত প্রক্রিয়ায় আমরা কাজ শুরু করেছি। এক্ষেত্রে আমরা আইনকে অনুসরণ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তদন্ত প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে অবৈধভাবে কাজে জড়িত সবার নাম প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ যাতে জানতে পারে তদন্তের নামে লুকোচুরি করা হয় না। সত্যকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বা রাজউক চেপে রাখেনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, সেটা শুধু মুখে না, কথায় কথায় না।

রিপোর্টে ভবনের অতিরিক্ত অংশ ভেঙ্গে ফেলতে বলা হয়েছে। আর সেটা সম্ভব না হলে সিলগালা করে দেয়ার সুপারিশ রয়েছে। ভবনটি নির্মাণকালের রাজউক চেয়ারম্যান, অথরাইজড অফিসার ও সহকারী অথরাইজড অফিসারের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের ও কর্মরতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাসহ সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের নির্দেশনা রয়েছে। অগ্নিকান্ডের পেছনে ভবন মালিক পক্ষের প্রচলিত ব্যবস্থা ও নিয়ম নীতির প্রতি চরম অবহেলা দেখতে পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তদন্ত রিপোর্টে ভবনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়ন হাউজিং এস্টেট ও বরাদ্দ গ্রহীতা এফআর টাওয়ার প্রোপার্টিজ’র সৈয়দ মোঃ হোসাইন ইমাম ফারুকসহ এফআর টাওয়ার ওনার্স সোসাইটিকেও এই অগ্নিকান্ডের জন্য দায়ী করা হয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২৩তলা বিশিষ্ট এফআর টাওয়ারের নক্সাটি সংঘবদ্ধ চক্র অবৈধভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছে। আর এর দায় তৎকালীয় রাজউক চেয়ারম্যান কোন ভাবেই এড়াতে পারেন না। সে সময়ের রাজউক চেয়ারম্যান হুমায়ূন খাদেম, অথরাইজড অফিসার সৈয়দ মকবুল আহম্মেদ, অথরাইজড অফিসার নাজমুল হুদা, সহকারী অথরাইজড অফিসার মোঃ বদরুজ্জামান মিয়ার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা দায়ের করার সুপারিশ রয়েছে এই প্রতিবেদনে। গত ২৮ মার্চ ভয়াবহ ওই অগ্নিকান্ড ঘটে। এতে ভবনটির কয়েকটি ফ্লোর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে এবং আগুনে পুড়ে সর্বমোট ৩১ জন নিহত হন। এছাড়া শতাধিক ব্যক্তি আহত হন।

রিপোর্টে ভবনটি নির্মাণের সময়ে ফেব্রুয়ারি ২০০৫ থেকে জুলাই ২০০৮ পর্যন্ত) রাজউকের যারা তদারককারী কর্মকর্তা ছিলেন তাদের মধ্যে ২০ জনকে দায়ী করা হয়েছে। যার মধ্যে প্রধান ইমারত পরিদর্শক মাহবুব হোসেন সরকার ও মোঃ আবদুল গনি ও ১৮ জন ইমারত পরিদর্শক রয়েছেন। এছাড়া ভবনের ২০, ২১ ও ২২ তলার বন্ধক অনুমতি দিয়েছেন এমন ৬ কর্মকর্তা কর্মচারীকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া রাজউকের সাবেক সদস্য জি এম ব্যাপারী, সবেক নগর পরিকল্পনাবিদ জাকির হোসেন, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমান, সাবেক সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ উল্লাহ, লিজ গ্রহীতা মোঃ হোসাইন ইমামকেও এ অগ্নিকা-ের জন্য দায়ী করা হয়েছে। ভবনের ২৩তলা বিশিষ্ট নক্সাটি বৈধতা দেয়ার জন্য বিভিন্ন রেজিস্ট্রারে অবৈধ এন্ট্রি ও ইস্যু দেখিয়ে যারা এই অপরাধে সহযোগিতা করেছেন এমন ২৪ জন কর্মকর্তা কর্মচারীকেও দায়ী করা হয়েছে। মনিটরিংয়ে ব্যত্যয়ের জন্য যারা দায়ী তাদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ ইয়ামিনসহ ৯ জন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জরুরী বহির্গমণ নক্সা অনুযায়ী হয়নি। ভবন তৈরিতে দায়িত্বশীলতা, মনযোগিতা ও দক্ষতা তিনটিরই অভাব ছিল। আর সর্বোপরি এতে অবহেলার ভাবটি প্রকট ছিল। আগুনের ঘটনা ওই অবহেলার বিষয়টিই প্রমাণ করে।

সাংবাদিকদের গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, এফআর টাওয়ারে অগ্নিকা-ের পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ইয়াকুব আলী পাটওয়ারীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। রাজউকও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছে। আমাদের রেওয়াজ আছে তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। আমি অঙ্গীকার করেছিলাম সেই সনাতনী ধারণার বাইরে বেরিয়ে আসব। মন্ত্রী বলেন, আমাদের টার্গেট ছিল এই ভবনটি নির্মাণ পদ্ধতির মধ্যে কোন অনিয়ম বা ব্যত্যয় ছিল কি-না। হয়ে থাকলে তা কোন ধরনের। এফআর টাওয়ারের ১৫তলা পর্যন্ত অনুমোদন নেয়া হয়। এই অনুমোদন যথাযথ ছিল। কিন্তু এরপর ১৮তলা পর্যন্ত নির্মাণ প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল, কিন্তু যে উপায়ে অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেটা সঙ্গত ছিল না।

অনুমোদন দেয়ার সময় যে আইন ছিল সেই আইনের আওতায় অনুমোদন দেয়া হয়নি, অনুমোদন দেয়া হয় আগের আইনে। এফআর টাওয়ারের ১৮তলা থেকে ২৩তলা পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈধ বলেও উল্লেখ করেছে তদন্ত কমিটি। মূলত এফ আর টাওয়ারের অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত রাজউকের কর্মকর্তাসহ যারা যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আমরা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখব। যারা অবসরে গেছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য প্রক্রিয়ায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। যারা এখনও কর্মরত আছেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, আমাদের তদন্তের বিষয় ছিল এফ আর টাওয়ার নির্মাণে কোন অনিয়ম, ব্যত্যয় হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে তা কি ধরনের হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন স্তরে কী কী অনিয়ম হয়েছে। এ অনিয়মের সঙ্গে মালিক পক্ষ, ডেভেলপার পক্ষ এবং রাজউকে তৎকালীন কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা ছিলেন তাদের সম্পৃক্ততা কিভাবে ছিল। কী কী নিয়মের লঙ্ঘন হয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে এফ আর টাওয়ারের ১৫ তলা পর্যন্ত ভবনের অনুমোদন সঙ্গত ছিল। পরবর্তীতে ১৫ তলা থেকে ১৮ তলা পর্যন্ত নক্সা অনুমোদনের প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল, কিন্তু অনুমোদকালীন বিদ্যমান বিধির আওতায় অনুমোদন দেয়া হয়নি তাই ১৮তলার উর্ধে ভবনের সকল তলা সম্পূণরূপে অবৈধ।

মন্ত্রী বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, এফ আর টাওয়ার কর্তৃপক্ষ (রূপায়ন গ্রুপ) একটি প্ল্যানের অনুমোদিত কপি দেখানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু রাজউকের রেকর্ডে কোথাও তার কোন অস্তিত্ব নেই। রাজউকের কাছে সংরক্ষিত নথিতে মূল প্ল্যানেরও কোন কপি নেই। রাজউকের কোন অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে অবৈধ যোগাযোগের মাধ্যমে বিল্ডিংয়ের মালিক ও ডেভেলপার বাইরের একটি প্যান তৈরি করতে পারে, আইনগতভাবে এই প্ল্যানের কোন বৈধতা নেই। পরবর্তীতে অসাধু যোগসাজশে ঋণ গ্রহণের অনুমতি প্রদানের প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত তাদেরও তদন্তে দায়ী করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, তদন্তে রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে পরিদর্শক পর্যন্ত, রেজিস্ট্রার ব্যবস্থাপনায় যারা ছিলেন, যারা ঋণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের সকলকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই ঘটনায় জড়িত হিসেবে রিপোর্টে এসেছে, তাদের সকলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।

এদিকে রাজউক থেকে বহুতল ভবনের অনিয়ম চিহ্নিত করার জন্য ২৪টি পরিদর্শন টিম গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আমরা সকল বিল্ডিং পরিদর্শন করব। পরিদর্শন একটি চলমান প্রক্রিয়া। পর্যায়ক্রমে সকল ভবন পরিদর্শন করা হবে। প্রাথমিকভাবে বহুতল ভবন পরিদর্শন করা হয়েছে। বহুতল ভবনের ভেতরে এ পর্যন্ত রাজউক অনুমোদিত নক্সা আছে এমন ভবন পাওয়া গেছে ১ হাজার ১শ ৩৬টি, রাজউক ব্যতীত অন্যান্য সংস্থা অনুমোদিত নক্সা আছে এমন ভবন ২০৭টি, ভবন মালিকগণ রাজউক অনুমোদিত নক্সা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে এমন ভবনের সংখ্যা ৪৩১টি এবং সরকারী ভবনের নক্সা প্রদর্শন করা হয়নি এমন ভবন ৪৪টি। নির্দিষ্ট সময়ে নক্সা প্রদর্শনে ব্যর্থ ভবনের বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যত্যয়কৃত ভবনের অনিয়মকৃত অংশ ভেঙ্গে ফেলার জন্য আমরা নির্দেশ দেব। ভেঙ্গে না ফেললে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, আপনারা আশ্বস্ত থাকতে পারেন আইনানুগ প্রক্রিয়ায় যারাই অভিযুক্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনভাবেই কাউকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।