১৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জলবায়ু পরিবর্তন ॥ পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি

  • এনামুল হক

সুমেরুর চিরহিমায়িত এলাকার বরফ গলতে গলতে এলাকাটি সঙ্কুচিত বা ছোট হয়ে আসছে। বরফ গলার কারণে আরও বেশি কার্বন মুক্ত হয়ে বায়ুম-লে গিয়ে মিশছে। এর পাশাপাশি সাগর ও স্থলভাগের বরফ গলার কারণে ভূপৃষ্ঠ আরও বেশি পরিমাণে সূর্যের আলো বা তাপ শুষে নিচ্ছে। এই দুইয়ের মিলিত প্রভাবে ভূম-লের উষ্ণতা বাড়ছে এবং জলবায়ুর পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে। এতে করে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ বহু ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে।

নেচার কমিউনিকেশনস পত্রিকায় সুমেরুর বরফ গলার অর্থনৈতিক পরিণতির ওপর এ যাবতকালের সবচেয়ে উন্নত সমীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয় যে প্রাকৃতিক এসব ঘটনার সম্মিলিত পরিণতিতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিশ্ব অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

নিবন্ধে বলা হয়, বিশ্বের দেশগুলো যদি প্যারিস চুক্তির অঙ্গীকারের ভিত্তিতে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে ব্যর্থ হয় তাহলে পরিণতি যা হওয়ার তাতো হবেই সেই সঙ্গে সূর্যতাপ মহাশূন্যে ফিরিয়ে দেয়া সাদা বরফ গলে যাওয়ার কারণে সমষ্টিগত ফল যা দাঁড়াবে তাতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও এর আনুষঙ্গিক খরচের পরিমাণ প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সুমেরু অঞ্চলে যা ঘটতে পারে তার সবচেয়ে উন্নত কম্পিউটার মডেলের ভিত্তিতে হিমায়িত অঞ্চলের বরফ গলা ও এ্যালরেডো হ্রাস পাওয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব এই প্রথম হিসাব করে দেখা হয়েছে। এ্যালরেডো হচ্ছে সূর্যের যে পরিমাণ আলো ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ার পর শোষিত না হয়ে ভিন্নদিকে সরে যায় তারই পরিমাপ। গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে প্রাকৃতিক ব্যবস্থাবলী অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার কারণে কিভাবে মানুষের সৃষ্ট কার্বন নির্গমন সমস্যার আরও অবনতি হবে এবং তার ফলে এই সমস্যার সমাধান করা আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াবে।

ফার্মাফ্রস্ট বা চিরহিমায়িত অঞ্চলের বরফ গলাই মূল ভাবনার বিষয়। সেখানে মাটির নিচে শত শত বছর ধরে হিমায়িত অবস্থায় থাকা জৈব পদার্থ গলে পচে গিয়ে কার্বন ও মিথেন গ্যাস বেরিয়ে আসে এবং বায়ুম-লে মেশে। ১ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বর্তমান পর্যায়ে এই গ্রীনহাউজ গ্যাস ইতোমধ্যেই বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। এ পর্যন্ত এর প্রভাব সামান্যই। চিরহিমায়িত অঞ্চল থেকে ১০ গিগাটন কার্বন বেরিয়ে এসেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দেড় ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পেলে কার্বনের এই নির্গমন দ্রুত বাড়বে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এখন যে হারে বাড়ছে তাতে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা কমপক্ষে তিন ডিগ্রী সেলসিয়াস বেশি হবে। তার ফলে পার্মাফ্রস্টের বরফ গলে ২৮০ গিগাটন কার্বন ডাই অক্সাইড ও ৩ গিগাটন মিথেন বেরিয়ে আসবে। মিথেনের পরিমাণ কম হলেও জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব হবে কার্বনের চাইতে ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি প্রবল। এর ফলে এখন থেকে শুরু করে ২৩০০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে প্রায় ৭০ ট্রিলিয়ন ডলার। সুমেরুর বরফ গলার কিছু সুফলও আছে। যেমন এতে করে জাহাজ চলাচল সহজতর হবে এবং খনিজ সম্পদ পাওয়া যাবে। এর আর্থিক সুফল যে পরিমাণে মিলবে বলে ধরা হয়েছে ক্ষতির অঙ্কটা হবে তার ১০ গুণ বেশি।

এটা বৈশ্বিক অসাম্যও বাড়িয়ে তুলবে। কারণ অর্থনৈতিক ক্ষতির বেশির ভাগ বোঝা সম্ভবত উষ্ণতর ও দরিদ্রতর অঞ্চলের দেশগুলোকে বহন করতে হবে। কেননা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই দেশগুলোই সর্বাধিক বিপন্ন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।

ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের দিমিত্রি ইউমাশেভ বলেন, ‘এটা বড়ই হতাশাব্যঞ্জক যে এমন একটা চিত্র আমাদের সামনে রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা দেড় থেকে ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়লেও চিরহিমায়িত অঞ্চলের বরফ গলার কারণে অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং ক্ষতির অঙ্কটা বেশি হবে। অথচ উষ্ণায়ন সীমিত করার মতো প্রযুক্তি আমাদের হাতে আছে। সমস্যা হচ্ছে আমরা যথেষ্ট দ্রুত অগ্রসর হচ্ছি না।’

নতুন গবেষণায় কিছু সুসংবাদও রয়েছে। স্থলভাগের পার্মাফ্রস্টের গলনের প্রভাব যা আশঙ্কা করা হয়েছিল তার তুলনায় কমের দিকেই রয়েছে। আগের হিসাবগুলোতে বলা হয়েছিল সুমেরুর এই বরফ গলার ফলে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত আর্থিক ক্ষতির অঙ্কটা ১০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। কেউ কেউ এমনও আশঙ্কা করেছিলেন যে মিথেন গ্যাস এককভাবেই মস্ত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কিন্তু এখন নতুনতথ্য পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে মিথেন নয় বরং কার্বন ডাই অক্সাইডই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ রয়ে গেছে।

ড. ইউমাশেভ বলেন সূর্যের যে পরিমাণ আলো ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ার পর শোষিত না হয়ে ঠিকরে ভিন্নপথে এবং বলাইবাহুল্য মহাশূন্যে ফিরে যায় বর্তমানে সুমেরু সাগরের বরফ তার এক তৃতীয়াংশের জন্য এবং স্থলভাগের বরফ এক তৃতীয়াংশের জন্য এবং স্থলভাগের বরফ এক তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। এই দুই স্থানের বরফ বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে প্যারিস চুক্তির বর্ণিত পাল্লার মধ্যে ধরে রেখেছে। তবে জলবায়ু যদি আরও উষ্ণ হয়ে ওঠে তাহলে গ্রীষ্ম ও বসন্তে সাগরের বরফ এবং স্থলভাগের তুষারের আচ্ছাদন আরও উত্তরের দিকে সরে যাবে এবং এ্যালবেডো অর্থাৎ সূর্যরশ্মি ভূপৃষ্ঠে পড়ে শোষিত না হয়ে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারটা দুর্বল হয়ে পড়বে।

ইউমাশেভ বলেন, সুমেরু সাগর ও স্থলভাগের বরফ আমাদের কাছে অনেকটা মেয়াদী বোমার মতো। তবে আগে যতটা বিশাল ধ্বংসাত্মক বলে ধরে নেয়া হয়েছিল ততটা বিশাল নাও হতে পারে। তবে তিনি হুঁশিয়ার করে দেন যে এ নিয়ে প্রসন্নতা বোধ করার কোন কারণ নেই। কারণ এই বরফ গলার মাত্রাটা নিম্নসীমায় থাকলেও ক্ষতির পরিমাণটা বিশালই থেকে যাবে।

সূত্র : সায়েন্স ডেইলি