২৬ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নজরুলের চিরসুন্দর, সুন্দরের নজরুল

  • নূর কামরুন নাহার

আমি যার নূপুরেরও ছন্দ বেণুু কার সুর

কে সেই সুন্দরও কে?

কে সেই সুন্দরও কে?

...

যার শিখী-পাখা লেখনী হয়ে

গোপনে মোরে কবিতা লেখায়

সে রহে কোথায় হায়!

কে সেই সুন্দর? যে আমাদের ভেতরে অবস্থান করে। আমাদের পূর্ণ করে দেয়, নিঃস্ব করে দেয়, কোন সে সুন্দর? যার মায়াবী হাতছানি আমাদের নিয়ে যায় সুন্দরের জগতে। কোন্ সে সুর অলক্ষ্যে মুহুমুর্হু আনন্দে কাঁপায়, অঝোরে কাঁদায়, কোন মহান বেদনায় আন্দোলিত করে, নিজের ভেতর আবিষ্কার করায় নিজেকে। কোন সে সুন্দর শুধু রহস্য আর রহস্যের খেলা খেলে? কোন সুন্দরের অন্বেষণ, নিত্য তার ভাঙ্গাগড়া আর অনন্য অস্পষ্ট অবয়ব নিয়ে যায় সৃষ্টির কুহকী জগতে। কোন সুন্দরকে স্পর্শের দুরন্ত কামনা করে তুলে অন্থির, চঞ্চল আর বিবাগী। কোন সুন্দর নজরুলকে বার বার তাড়িত করেছে, কে তাঁকে লেখায় কবিতা, কোন অদৃশ্য সুন্দরের হাতছানি আর পিপাসায় সে বার বার ছুটে যায় সৃষ্টি আর সষ্ট্রার কাছে। মূলত সুন্দর আর আর সুন্দরের আকাক্সক্ষাই নজরুলকে করেছে কবি, বিরহী আর শিল্পী। সুন্দরের কামনাই তার মধ্যে জ্বালিয়েছে সৃষ্টির আগুন। সুন্দরের আহ্বানে তিনি গেয়ে উঠেছিলেন গান আর কলমে বেজে উঠেছিল সুন্দরের বন্দনা। সুন্দরের দিকে অপ্রতিরোধ্য এই ছুটে যাওয়াকে নজরুল নিজেই চিহ্নিত করেছেন সুন্দরের সাধনা হিসেবে -

আমার সাহিত্য সাধনা বিলাস ছিল না। আমি আমার জন্মক্ষণ থেকে যেন আমার শক্তি আর অস্তিত্বকে, বীরংঃধহপব-কে খুঁজে ফিরেছি। ( ১৯৪১, ১৬ মার্চ বনগাঁ সাহিত্য -সভার চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলনে প্রদত্ত সভাপতির ভাষা, মধুরম)

সুন্দর আর সত্য বিরাজমান আমাদের অস্তিত্বে। সুন্দর বিরাজমান আমাদের অন্তরে। এই সুন্দরকে খোঁজার মধ্যেই রয়েছে নিজেকে খোঁজার অন্তহীন সাধনা, আর সেই সাধনার মধ্যেই রয়েছে সৃষ্টির অবিনাশী বীজ। আবার সৃষ্টির ভেতর দিয়েই উন্মোচনের চেষ্টা নিজেকে, নিজের ভেতরের সুন্দরকে। সেই খননের চেষ্টাই নিরন্তর করে গেছে নজরুল। নিজেকে খুঁজে ফেরাই এই নিরন্তর অভিলাষকেই সক্রেটিস বলেছিল ‘শহড়ি ঃযুংবষভ ’ সুন্দরকে চেনা আর নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুন্দরকে আবিস্কার করেছেন কবিগুরুও-

আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাই নি।

তোমায় দেখতে আমি পাই নি।

বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয়-পানে চাই নি।

আমার সকল ভালোবাসায় সকল আঘাত সকল আশায়

তুমি ছিলে আমার কাছে, তোমার কাছে যাই নি?

নিজেকে চেনার মধ্য দিয়ে নিজের ভেতরে নজরুল খুঁজে পেয়েছিলেন সষ্ট্রার মহান অস্তিত্বকে। মানুষের ভেতরেই যে সে চির সুন্দরের বাস, মানুষই যে ধারণ করে ঈশ্বর আর সষ্ট্রাকে এই সত্য নজরুল আবিষ্কার করেছিলেন তার সমগ্র অন্তঃকরণ দিয়েÑ

কে তুমি খুঁজিছ জগদীশে ভাই আকাশ-পাতাল জুড়ে?

কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?

হায় ঋষি-দরবেশ,

বুকের মানিকে বুকে ধরে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ!

সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে,

স্রষ্টারে খোঁজো-আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!

(ঈশ্বর)

তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,

সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা! খুলে দেখ নিজ প্রাণ।

তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম যুগাবতার,

তোমার হৃদয় বিশ্ব-দেউল সকলের দেবতার।

(সাম্যবাদী)

নিজেকে আবিষ্কার, সুন্দরকে অন্বেষণ আর সষ্ট্রার মহান সত্তার উপলব্ধির ভেতর দিয়ে নজরুল হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতির উন্মুক্ত উদার শিক্ষা আর সত্যের উন্মোচন নজরুলকে দিয়েছিল উদারতা আর বিশালতা, এই উদারতা নজরুল লাভ করেছিলেন অভিজ্ঞতা আর সুন্দরের শিক্ষার মাধ্যমে। প্রকৃতিই যে মুক্তি আর স্বাধীনতার অনন্য প্রতীক, প্রকৃতিই যে খুলে দেয় মনের বদ্ধ দুয়ার, বন্ধনহীনকে প্রেম আর মমতায় জড়িয়ে রাখে বন্ধনে এটা নজরুল অনুভব করেছিলেন তার বন্ধনহীন জীবনের বিরহী অনুভব দিয়ে-

তাই ইউনিভার্সিটির দ্বার থেকে ফিরে ইউনিভার্সের দ্বারে হাত পেতে দাঁড়ালাম। জীবনে কোন দিন কোন বন্ধনকে স্বীকার করতে পারলাম না। কোন স্নেহ-ভালবাসা আমায় বুকে টেনে রাখতে পারল না। এই পরম তৃষ্ণা যে কোন পরম-সুন্দরের তা বোঝাতে পারিনি। (মধুরম)

এই যে বন্ধন আর বন্ধনহীনতার বেদনা, বুকের মধ্যে প্রেমের তীব্র দহন, পাওয়া ও পেয়ে হারানোর বেদনা এবং পাওয়া না পাওয়ার অন্তহীন তৃষ্ণা এর ভেতরেই এক পরম সুন্দরের অস্তিত্ব দেখতে পেয়েছে তাঁর পিয়াসী মন। আবার এই যে অনন্ত প্রকৃতি, বিশাল ভুবন এই চোখের সামনের জগত এবং এই চোখের বাইরের জগত, অনুভবের জগত এবং এই যে ইন্দ্রিয়ের জগত এবং অতিন্দ্রীয় জগত এর মধ্যেই রয়েছে অনন্ত সুন্দরের বাস। সেই অনন্ত সুন্দর, সেই চির সুন্দরকে স্পর্র্শ করার এক চির ব্যথা আজীবন নজরুলকে রেখেছে অস্থির ও ব্যাকুল। এক অপরূপ সুন্দরের মূর্তিকে তিনি অবলোকন করেছেন তার সমগ্র অনুভব দিয়ে। তার সমস্ত সত্তায় আর সৃষ্টিতে তিনি আঁকতে চেয়েছেন সেই অনিন্দ্যসুন্দরকে-

অনন্ত শূন্যে অনন্ত শ্বেত শতদলের মাঝে একখানি অপরূপ সুন্দর মুখ দেখেছি- সেই মুখ যেন নিত্য আমাকে অসুন্দরের পথ থেকে ফিরিয়েছে- কেবল উর্ধের পানে আকর্ষণ করেছে। আজ সেই মুখখানি খুঁজে পেয়েছি- আজ তার দেখা পেয়ে প্রথম উপলব্ধি করেছি ‘রসো বৈ সরঃ’ অর্থ, অনন্ত আকাশ বেয়ে মধুক্ষরণ কি করে হয়, সে মধু পান করেছি। আমার এই পরম মধুময় অস্তিত্বে প্রেম-শক্তিতে আত্মসমর্পণ করে আমি বেঁচে গেছি, আমার অনন্ত জীবনকে ফিরে পেয়েছি। (মধুরম)

এই যে সুন্দরকে অনুভব, সুন্দরের অপূর্ব মুখখানি দর্শন আর অসুন্দরের পথ থেকে সুন্দরের দিকে ফেরা এর মধ্যেও রয়েছে অনন্ত সুন্দরের এক হাতছানি এই অপূর্ব মুখখানি কোন মানুষের নাকি বিমূর্ত এক সুন্দর, যাকে স্পর্শ করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়, যে এক অনন্ত সুন্দরের প্রতীক। যে সুন্দর বাস করে আমাদের কল্পনায়, মনের গহীনে আর বাঁচিয়ে রাখে জীবন সুধায়। এই অপূর্ব মুখখানি বাস্তব অথবা সুন্দরের বিমূর্ত রূপ যাই হোক এই সুন্দরের তৃষ্ণা আমরা দেখতে পাই সৃষ্টিশীল মানুষের মধ্যে যেমন বোদলেয়ারেও পাই এমনি এক সুন্দরের বন্দনা

প্রিয়তমা, সুন্দরীতমারে -

যে আমার উজ্জ্বল উদ্ধার -

অমৃতের দিব্য প্রতিমারে,

অমৃতেরে করি নমস্কার

(বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদ)

কখনও সুন্দরের প্রতিমূর্তি, সুন্দরের অনন্য সুন্দরের মুখখানি এ মর্তের প্রেয়সীর নয়, এ অমর্তলোকের স্বর্গীয় প্রেমময় এক অপূর্ব আলোকরাশি, এক অপূর্ব দ্যুতিময় সেই অনন্তসত্তা, মহান সত্তা আর মহান সষ্ট্রার জ্যোর্তিময় সত্তা। এ এক আধ্যাত্মিক ঊষা, এক আলোকজ্জ্বল জগত। যেখানে সব অসুন্দর বিলীন হয়ে যায়। সেখানে এক অপার আনন্দ আর পরিপূর্ণতায় মন ভরে ওঠে। সে এক অনন্ত সুন্দরের জগত। যে সুন্দরে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে সৃষ্টির জগত আর আর এই সৃষ্টি ও সুন্দরের জগত অন্য এক আনন্দে আর প্রাপ্তিতে প্লাবিত করে কবির মনোভূমি। এই সুন্দর আর সুন্দরের অনন্ত বোধ থেকে কবি এক মুহূতের্র জন্যও নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেন না। কারণ সুন্দরকে বিচ্ছিন্ন করলে কবি সৃষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কবির হৃদয় হয় ক্ষত-বিক্ষত। সৃষ্টির অনন্ত পিপাসায় সে হয়ে উঠে অস্থির। সুন্দরের এই জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হলেই তার অন্তরাত্মা রোদন করে ওঠে। আসলে সেই রোদনও হচ্ছে সৃষ্টির পিপাসা আর সৃষ্টির পিপাসার মধ্যেই বিরাজমান সুন্দর-

অসুন্দরের সাধনা আমার নয়, আমার আল্লাহ্ পরম সুন্দর। তিনি আমার কাছে নিত্য প্রিয়-ঘন সুন্দর, প্রেম-ঘন সুন্দর, রস-ঘন সুন্দর, আনন্দ-ঘন সুন্দর। আপনাদের আহ্বানে যখন কর্ম-জগতের ভিড়ে নেমে আসি, তখন আমার পরম সুন্দরের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হই, আমার অন্তরে বাহিরে দুলে ওঠে অসীম রোদন। আমি তাঁর বিরহ এক মুহূর্তের জন্যও সইতে পারি না।

(যদি আর বাঁশি না বাজে)

এই পরম সুন্দর এই সুন্দরের আলোকচ্ছটা, এই রস প্রীতিই নজরুলকে নিয়ে গেছে সৃষ্টির সুন্দর ভুবনে। তাঁর কলম গেয়ে উঠেছে সৃষ্টির গান, কলম বন্দনা করেছে প্রেম সুন্দর আর সৃষ্টি জগতের, তার কাছে সুন্দর আর সীমাবদ্ধ থাকেনি শুধু ফুল, পাখির গান, নদী, সমুদ্র বা নীলাকাসে। সৃষ্টির সব কিছুর মধ্যেই নজরুল খুঁজে পেয়েছেন সেই সুন্দরকে, সে সুন্দর তাকে লেখায় আর বিদ্ধ করে সৃষ্টির আনন্দ ও বেদনায়। সেই যে প্রকৃতি যেখানে আকাশ পাহাড় মিশে যায় দিগন্ত রেখায়, সেই অসীমে সেই সীমাহীন সুন্দরের মধ্যে তিনি গেড়েছেন তার স্থায়ী আবাস, সেইখানে আবার ঝর্ণা হয়ে কলকল করে বয়ে যেতে চেয়েছেন-

‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই।

ওই পাহাড়ের ঝর্ণা আমি, ঘরে নাহি রইগো।’

নজরুল প্রকৃতির সঙ্গে মিশে সুন্দরকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন। প্রকৃতির শক্তি, তেজ আর হিং¯্রতার সঙ্গেও মিতালী কতে চেয়েছেন, সে মিতালী ভয়ঙ্কর সুন্দরের সঙ্গে-

‘চিতা বাঘ মিতা আমার গোখরা খেলার সাথি

সাপের ঝাঁপি বুকে ধরে সুখে কাটাই রাতি।’

এই যে সুন্দরকে অনুবাধন, আত্মার ভেতর পরম সুন্দরের উপলব্দি ও প্রকৃতির মাঝে বিলীন হয়ে যাওয়া, তবু পিয়াসী মনের পিয়াস শেষ হয় না। কারণ সুন্দরের এই অন্বেষণ শাশ্বত ও চিরন্তন। তাই আবারও দেখা যায় পিয়াসী মন খুঁজে ফেরে সেই আরাধ্য সুন্দরকে-

‘হয়ত তোমার পাবো দেখা,

যেখানে ঐ নত আকাশ চুমছে বনের সবুজ রেখা।

আবার দেখা যায় এই সুন্দর শুধু প্রকৃতি, ঈশ্বরের মধ্যেই নয়, এই সুন্দর অচেনা অদেখা স্পর্শহীন রহস্যময় সেই সুন্দরই নয়, সুন্দর যেন লুকিয়ে আছে অতীতে, কোন একদিন যে সুন্দর মনকে উদ্বেল করেছিল, যে সুন্দরের কাছে একদিন নত হয়েছিল মন, সেই হারানো সুন্দরকে বিরহীর অন্তর দিয়ে খুঁজে ফেরার মধ্যেও রয়েছে সুন্দরের অনুসন্ধান :

দক্ষিণা সমীরে ডাকো কুসুম-ফোটানো বন-হরিণী-ভুলানো

আদি জন্মদিন হতে চেন তুমি চেন!

আরো দেখেছিনু, ঐ আঁখির পলকে

বিস্ময়-পুলক-দীপ্তি ঝলকে ঝলকে

ঝলেছিল, গলেছিল গাঢ় ঘন বেদনার মায়া

করুণায় কেঁপে কেঁপে উঠেছিল বিরহিণী

অন্ধকার-নিশীথিনী-কায়া।’

(পুজারিনী)

নজরুল সুন্দর আবার শুধু তাঁর ধ্যানে আর অনুভবে নয়, কাব্য গানে নয়, প্রেম আর ভালোবাসার পদ্ম ফোটা কোমলভূমিতে নয়, জীবনের কঠিনতম যে পথ, জীবনের নিষ্ঠুর যে ছোবল যেখানে মৃত্যু, ক্ষুধা, ভয়, জরা, ক্লান্তি, বঞ্চনা জড়িয়ে থাকে অক্টোপাসের মতো, যেখানে নিশ্বাসের মতো মানুষের সঙ্গে সঙ্গে থাকে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা, হারানোর শোক আর জীবন যন্ত্রণা সেখানেও রয়েছে সুন্দর। অপ্রাপ্তি, হতাশা ক্ষয়ে যাওয়ার মধ্যে রয়েছে মানুষের জীবন সংগ্রাম। জীবনের জন্য লড়াই, স্বপ্নের জন্য মানুষের জেগে থাকা, প্রতি মুহূর্তে আশায় বুক বাঁধা, এর মধ্যেই রয়েছে মানুষের সবচেয়ে সুন্দরতম সত্তা, তাই এই লড়াই এবং লড়াকু মানুষও নজরুলের সুন্দর-বন্দনার প্রধান এক অনুষঙ্গ-

আমি শুধু সন্দরের হাতে বীণা, পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি, তার চোখে চোখ ভরা জলও দেছেছি। শ্মশানের পথে, গোরস্তানের পথে, তাঁকে ক্ষুধা-দীর্ণ-মূর্তিতে ব্যথিত পায়ে চলে যেতে দেছেছি। যুদ্ধ-ভূমিতে তাঁকে দেখেছি, কারাগারের অন্ধকূপে তাঁকে দেখেছি, ফাঁসির মঞ্চে তাঁকে দেখেছি। আমার গান সেই সুন্দরকে রূপে রূপে অপরূপ করে দেখার স্তব-স্তুতি। ( প্রতিভাষণ)

পৃথিবীর সকল সুন্দরের প্রতিই নজরুলের ছিল দ্ব্যর্থহীন পক্ষপাত, সুন্দরের দিকে এই পক্ষপাত মূলত জীবনের দিকেই পক্ষপাত, যেমন জীবনের জলাধারে হতে চাই তুমুল রোহিত বলে আল মাহমুদ জীবনমুখিতার দিকেই তাঁর পতাকাতে তুলে ধরেছিলেন তেমনি নজরুলও চেয়েছিলেন জীবনের জয়গানের মধ্যে সুন্দরকে ধারণ করতে।

নজরুল নিজেই বলেছেন অসুন্দরের সাধনা আমার নয়, তাই যা কিছু অসুন্দর তাই সুন্দর করতে চেয়েছেন নজরুল। অসুন্দরকে জয় করতে চেয়েছেন সুন্দর দিয়ে। যেমন সুন্দরকে তিনি পূজা করেছেন তেমনি অসুন্দরকে দূর করতে চেয়েছেন সুন্দর বোধ- বুদ্ধি, প্রেম- ভালবাসা, অহিংসা দিয়ে তেমনি অসুন্দরকে সুন্দরে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। এখন নজরুল কোন সুন্দরের পূজা করেছেন, আর কোন অসুন্দরকে দূর করতে চেয়েছেন সেটা বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে নজরুল আর নজরুলের কালকে

১৯১৯ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যখন নজরুল সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন, তখন পৃথিবীর ৭২ শতাংশ রাষ্ট্র ছিল উপনিবেশ, প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষ ছিল পরাধীন। উপনিবেশ আর পরাধীনতার কষাঘাতে পর্যুদস্ত মানুষ, দলিত মানবতা আর স্বাধীনতার জন্য আকুলতা সে সময়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল চাপা হাহাকারে। স্বাধীন রাষ্ট্রের মানুষের মধ্যেও ছিল পরাধীনতার বোধ। মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল শাসন ও শোষণ। এই পরাধীনতার শৃঙ্খল, এই শাসন আর শোষণই ছিল নজরুলের কাছে অসুন্দর। সেই অসুন্দরকে দূর করাই ছিল নজরুলের সাধনা।

মানুষে মানুষে যে বৈষম্য, যে হানাহানি, শ্রেণী, জাত আর ধর্মের যে বিভাজন সেই বৈষম্য সেই বিভাজন দূর করার লড়াইটাই তার কাছে ছিল সুন্দরের জন্য লড়াই।

সুর আমার সুন্দরের জন্য, আর তরবারি সুন্দরের অবমাননা করে যে - সেই অসুরের জন্য।

(মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা)

আমার কাব্যে সঙ্গীতে, কর্মজীবনে, অভেদ-সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম - অসুন্দরকে ক্ষমা করতে, অসুরকে সংহার করতে এসেছিলাম- আপনারা সাক্ষী আর সাক্ষী আমার পরম সুন্দর।

(যদি আর বাঁশি না বাজে)

নজরুলের গানে, কবিতায়, সৃষ্টিতে এবং তার সমগ্র জীবনাচরণে সেই সুন্দরের দেখাই আমরা পাই যেখানে কোন জাতি, ধমর্, বর্ণ আর বিভেদের কথা নেই, সেখানে মানবতার পতাকা তলে বিশ্বের সকল মানুষ এসে মিলিত হয়েছে এক মোহনায়-

সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি’

এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশি।

(কুলি মজুর)

এই মিলনের বাঁশি বাজাতে তিনি সাম্যের গান গেয়েছিলেন -

গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,

সব দেশে, সব কালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

(মানুষ)

গাহি সাম্যের গান

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।

যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চিয়ান।

(সাম্যবাদী)

জানি না, তাহারা হিন্দু কি ক্রিশ্চিয়ান কি মুসলমান।

নির্যাতিতের জাতি নাই, জানি মোরা মজলুম ভাই।

(ঈদের চাঁদ)

এই সাম্যের গান গাইতে গিয়ে, সুন্দরের উপাসনা করতে গিয়ে নজরুল নিজেকেও সীমাবদ্ধ রাখেননি কোা জাতি, গোষ্ঠী আর সমাজের মধ্যে , নিজেকে তিনি দাবি কেেছন সকল দেশের সকল মানুষের আর সমর সমাজের-

আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। সুন্দরের ধ্যান, তাঁর স্তবগানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম।

( প্রতিভাষণ)

তাই নজরুলের সুন্দর ছিল সাম্য আর অসাম্প্রদায়িকতার। প্রিয়ার চোখে যেমন নজরুল সুন্দরকে পেয়েছিলেন, যেমন এক বিরহী হৃদয় নিয়ে আজীবন সুন্দরের ধ্যান করেছিলেন তেমনি স্বপ্ন দেখেছিলেন সুন্দর এক সমাজের, যে সমাজে কোন বৈষম্য নেই সাম্প্রদায়িকতা নেই, ধর্মের লড়াই নেই, নেই কোন জাত পাতের বিচার। এই সুন্দরের স্বপ্ন তাকে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল নজরুল কলম চালিয়েছিলেন সকল বৈষম্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সকল শোষক আর শাসকের বিরুদ্ধে, সকল কূপমন্ডূকতা আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে। এই লড়াই তাঁর জীবনকে হুমকির সম্মুুখীন করেছিল, নানা অপবাদ আর অপমানে তাঁকে বিদ্ধ হতে হয়েছিল, তারপর থেমে থাকেনি তাঁর সুন্দরের লড়াই-

কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি মাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এসে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।

( প্রতিভাষণ)

সমাজের গালাগালিগুলোকে গলাগলিতে পরিণত করাই স্বপ্নই নজরুলের সুন্দরের সাধনা। আর এই সুন্দর যেখানে বাস করে সেই হৃদয়কে অর্ঘ্য দিয়েছেন নজরুল, তাকেই স্থান দিয়েছেন সবকিছুর উর্ধে-

মিথ্যা শুনিনি ভাই,

এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির-কাবা নাই।

(‘সাম্যবাদী’, সাম্যবাদী)

এই হৃদয় মন্দির, এই দেবতা আর কবিতার সাধনার মধ্যেই বেঁচে ছিল তার নন্দনবোধ আর সুন্দরের কামনা-

কবিতা আর দেবতা সুন্দরের প্রকাশ। সুন্দরকে স্বীকার করতে হয়, যা সুন্দর তাই দিয়ে। সুন্দরের ধ্যান, তাঁর স্তবগানই আমার ধর্ম।

নজরুলের ছিল এক সংবেদনশীল হৃদয়, সুন্দরের সন্ধান যেমন ছিল তাঁর আজীবনের সাধনা, তেমনি সমাজের হীন, কূট চাল, ক্লেশ, কৌশল আর কর্দমাক্ততা এড়িয়ে সুন্দরকে তিনি লালন করেছিলেন সযত্নে, বাঁচিয়ে রেখেছিলেন তাঁর ভেতরের সুন্দরকে ।

১৯৪১ সালের ৬ই এপ্রিল মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র রজত জয়ন্তী উৎসব অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতির ভাষণে যদি আর বাঁশি না বাজে- অভিভাষণ প্রদান করেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে চিরজীবনের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যাবার আগে এটাই ছিল তাঁর সর্বশেষ বক্তৃতা। নজরুলকে চিনতে, জানতে তার সুন্দরকে আবিষ্কার করতে নজরুলের এই অভিভাষণটিই যথেষ্ট। এই অভিভাষণে নিজেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে খুলে দিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি তুলে ধরেছিলেন সুন্দরের প্রতি তার প্রেম আর লড়াইকে। তাকে চিনতে না পারার ব্যর্থতা তাকে বুঝতে না পারার বেদনার কথাও বলে গেছেন অকপটে খালি

যদি আর বাঁশি না বাজে- আমি কবি বলে বলছিনে - আমি আপনাদের ভালবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি - আমায় ক্ষমা করবেন - আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করেন আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি - আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম -সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।

(যদি আর বাঁশি না বাজে)

নজরুলের সুদরকে বুঝতে হলে আমাদের তাঁর হিয়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রিয়া, হারানো প্রিয়ার জন্য ব্যথা, সেই ব্যথার মধ্য দিয়ে অনিন্দ্যসুন্দরের সাধনাকে চিনতে হবে। তার আকাশের মতো মুক্ত, স্বাধীন মন, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার চেতনা ও মানবতাবোধকে বুঝতে হবে, হৃদয়ঙ্গম করতে হবে তাঁর সুন্দরের ধ্যানকে। তার সুন্দরকে আবিষ্কার করতে হলে আবিষ্কার করতে হবে নজরুল মানসকে, তার ব্যক্তিত্বকে। সে কথাও তিনি নিজেই বলে গেছেন সেই শেষ অভিভাষণে-

সাহিত্য ব্যক্তিত্বেরই প্রকাশ। আমি সাহিত্যে কি করেছি, তার পরিচয় আমার ব্যক্তিত্বের ভেতর। পদ্মা যেমন সূর্যের ধ্যান করে তারই জন্য তার দল মেলে, আমিও আমার ধ্যানের প্রিয়তমের দিকে চেয়েই গড়ে উঠেছি। আমি কোন বাধা-বন্ধন স্বীকার করিনি বিস্মৃত দিনের স্মৃতি আমার পথ ভুলায়ন, আমি আমার বেগে পথ কেটে চলেছি।