২৫ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কবিতার কথা

  • রকি মাহমুদ

সাহিত্য যদি সমাজের শরীর হয় তবে কাব্য সাহিত্য হবে তার আত্মা। মানুষের ভেতর, কবে, কখন, কিভাবে কবিতা প্রথম সঞ্চারিত হয়েছিল তা আজ গবেষণার অথবা গবেষণার অতীত বিষয়। দশ হাজার বছর আগে স্পেনের গুহা মানুষ যে ধাবমান হরিণ এঁকেছিল তার পা ছিল অনেক। মানুষের চলার সঙ্গে হাজার হাজার বছর ধরে লেগে আছে গতি, ঠিক ওই বহুপা হরিণের মতো। এক কথায় বলা যায় গতি আছে বলেই মানুষ পাথরে পাথর ঘষে আগুন আবিষ্কারের পর চমৎকৃত হয়েছিল। মানুষের উদ্ভাবনেচ্ছা ওই আলতামারিয়া গুহার বহুপা বিশিষ্ট হরিণের মতো।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটা অদৃশ্য গতি কাজ করে। আর ছন্দ হচ্ছে এই গতিময়তার উৎস। কবি প্রকৃতি থেকে ছন্দের দোতনা সংগ্রহ করে। নদীর ঢেউ, গাছের পাতার কম্পন, পাখির কলরব তার দৃষ্টান্ত। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন যা বাঙালী ঐতিহ্যের সহজিয়া ধর্মসাধনার ফল তা আজ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উৎস হিসাবে স্বীকৃত। উক্ত পদের প্রতিটি স্তবকে ছন্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। চর্চাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণবপদ, মঙ্গল কাব্য তার দৃষ্টান্ত। ধর্মীয়গ্রন্থে বর্ণিত গোষ্ঠী কবিগণও ছন্দ মিলিয়ে তাদের গোষ্ঠীর গুণকীর্তন করতেন। Encyclopedia britannic ধতে ছন্দ সম্পর্কে বলা হয়েছে : Rhythm is expression of the instict for order in sound which naturally govern human ear. কবিতায় যত বেশি ছন্দের ব্যবহার করা হবে ততই তা শ্রবণ ইন্দ্রিয়কে স্পর্শ করবে। এ কথাটি আমরা অবশ্যই অস্বীকার করতে পারব না। গোত্র রাষ্ট্র থেকে নগর রাষ্ট্র যেমন করে আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে তেমনি বাংলা কাব্য সাহিত্যের ক্রমবিকাশের ইতিহাস সুপ্রাচীন। আমরা যদি চর্যাপদকে গোত্র রাষ্ট্র ধরি তবে কাহ্নপার ভাষায় : ‘আলি এঁ কালি ঐঁ বাট রুন্ধেলা।/ তা দেখি কাহ্ন বিমনা ভইলা॥/ কাহ্ন কহি তাই কবির নিবাস।/ জো মন গোঅর সো উআস॥/’ আবার শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কে যদি নগর রাষ্ট্র ধরি তবে বড়ু চন্ডি দাসের ভাষায় : ‘এ ধন যৌবন বড়ায়ি সবই অসার/ ছিন্ডিআঁ পেলাবো গজ মুকুতার হার/ মুছি আ পেলায়িবো মোরে সিঁথের সিঁদুর/ বাহুর বলয়া মো করিবো শঙ্খচুর।/’ এরপর অবশ্যই মেঘনাদ বধ কে আধুনিক রাষ্ট্র ধরতে পারি মধুসূদনের ভাষায় : ‘দানব নন্দিনী আমি, রক্ষঃকুল বধু,/ বারণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী,/ আমি কি ডরাই সখী, ভিখারী রাঘবে?/ পশিব লঙ্কায় আজি নিজ ভুজবলে।’/ মানুষের সৃজন ক্ষমতা যেভাবে এগিয়ে গেছে ক্রমোন্নতির দিকে, ঠিক তেমনি সময়ের সাথে সাথে কবিতাও এগিয়ে গেছে সুক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতার দিকে। কারণ ‘সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় কবিতা সাবজেকটিভ, তাই এতে দেশ-কাল ও সমসাময়িক জবিনের চিত্র গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।’ এম আব্দুল আলীম, নূহ-উল-আলম লেনিন সম্পাদিত পথরেখা বর্ষ-১২ সংখ্যা-৩ ও ৪ মাঘ-চৈত্র ১৪১৫, পৃ-১১৯।

কবিতা কি? এই ছোট্ট প্রশ্নের উত্তর কোনো একটি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। প্রাবন্ধিক ভবতোষ দত্ত তাঁর রবীন্দ্র সাহিত্য প্রসঙ্গ (পৃ-১১) প্রবন্ধের বইয়ে কবিতা সম্পর্কে বলেন- ‘কবিতার অর্থটাই শেষ কথা নয়,ব্যঞ্জনা ও অনুরণন সৃষ্টি করে তোলাই বড় কথা। অভিধানে যে অর্থ দেয়া আছে, সেই অর্থে বদ্ধ থেকেই মনের ভাব বোঝানো যায় না। এমন অনেক ভাব ও অনুভূতি আছে, যাকে সুরে ও ছন্দে এবং শব্দপ্রতিমা রচনা করে অনুভব করিয়ে দিতে হয়, অর্থ দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া যায় না।’ কেউ কেউ বলেন : ‘কবিতা হচ্ছে শিল্পী মানুষের বেদনা বিদ্ধ হৃদয় উৎসারণ।’ সময় বিশেষে কোন একটি বিশেষ সূত্রকে অবলম্বন করে কবির আনন্দ বেদনা যখন প্রকাশিত হওয়ার পথ খুঁজে পায় তখনই কবিতার জন্ম। অর্থাৎ কবিতা হচ্ছে কবির মনোলোক থেকে জাত ছন্দিক ও গতিময় ভাবোচ্ছ্বাস। কবিতার শিল্পরূপ কখনো আনন্দ মিশ্রিত কখনও বেদনাবিধুর কখনও পুষ্পিত বিষে কলঙ্কিত। কবিতা সম্পর্কে এডগার এলেন পো যখন বলেন ‘কবিতা হচ্ছে সৌন্দর্যের ছন্দময় সৃষ্টি’ তখন আমাদের ভেতরে কবিতার স্নিগ্ধ সৌন্দর্য স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। কিন্তু এলিয়েট যখন বলেন, ‘কবিতা রচনা হলো রক্তকে কালিতে রূপান্তরের যন্ত্রণা’ তখন কবিতা সম্পর্কে আগের স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের ধারণাটি এলোমেলো হয়ে যায়। এরূপ পরস্পরবিরোধী অনেক মন্তব্য আছে। তবে মোদ্দা কথা হলো, ‘গদ্যে এবং পদ্যে যা প্রকাশ করা অসম্ভব তাই কবিতায় প্রকাশিত হয়’ এ কথাটি সর্বজনস্বীকৃত মতবাদ। কবিতা সম্পর্কে ময়ুখ চৌধুরী বলেন- ‘কতগুলো শব্দকে পরস্পর শুইয়ে দিয়ে একটা লাইন তৈরি হয়েছে। তারপর তালে তালে আরও কিছু লাইন। এক পর্যায়ে লাইন বিছানো শেষ, কবিতাও শেষ।’ তখন অবশ্য দশ বিশ তলা বিল্ডিংয়ের কথা মনে পড়লে একটু মজাই লাগে। বিল্ডিং তৈরি হয় নিচের দিক থেকে উপরের দিকে। একতলা দু’তলা, তিনতলা করে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। পক্ষান্তরে, কবিতা এক-দুই-তিন করে নিচের দিকে নামতে থাকে। এ রকম ওঠানামা MILL এবং ARISTOTLE এর LOGIC-এ দেখা যায়। এই দু’জনার তর্ক সাজানোর খেলাটা বেশ চমৎকার। তাই তর্কবিদ্যাকে যখন ‘বিজ্ঞানের মধ্যে শ্রেষ্ঠবিজ্ঞান’ আবার ‘কলার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কলা’ বলা হয় তখন সেটা নিয়ে আমি খুব একটা তর্ক করি না।

কবিতা যে কবিমনের একান্ত নিজস্ব ভাবনা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কবির অনুভূতির রূপান্তর ক্রিয়াকে ক্রোচ এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন- ‘Poetic I dealisation is not a frivolous enabellishment but a profound penetration in virtue of which we pass from tubles evotion to the screnity of contemplation. আসল কথা এই যে, কবির পঞ্চেন্দ্রিয় কবির কবিতার গর্ভাশয়।

কবিতার আঙ্গিক ও ছন্দ প্রয়োগের ওপর ভিত্তি করে কবিতাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। ক. সন্ময় বা গীতিকবিতা। খ. তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ কবিতা। কবি যখোন নিজের অন্তর অনুভূতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ভাবনা চিন্তা বা বহির্গত অনুভূতি তাঁর কাব্যের সামগ্রী রূপে গ্রহণ করে আত্মপ্রকাশ করে তখন তাকে গীতি কবিতা বলে। এই কবিতায় কবির আত্মচরিত্রই প্রধান। অপর পক্ষে, কবি যখোন বস্তু জগতকে যথাযথভাবে প্রকাশ করেন তখন আমরা তাকে তন্ময় বা বস্তুনিষ্ঠ কবিতা নামে অভিহিত করতে পারি। তন্ময় কবিতায় বস্তু সত্তায় প্রধান। ক. সন্ময় কবিতাকে আমরা কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি। ১. ভক্তিগীতি- যে গীতি কবিতা ধর্ম বা ভক্তিভাব অবলম্বনে রচিত তাকে ভক্তিমূলক গীতিকবিতা বলে। শঙ্কারচার্যের ‘স্তোত্রমালা অক্ষয় কুমার বড়ালের ‘কোথাতুম’ এই শ্রেণীভুক্ত। ২. স্বদেশ প্রীতিমূলক- যে গীতিকবিতা কবির স্বদেশপ্রীতি আশ্রয় করে রূপ পরিগ্রহ করে তাকে স্বদেশ প্রীতিমূলক গীতিকবিতা বলে। এই কবিতা দেশের প্রতি কবির আত্মিক মমতারই প্রকাশক। যেমন : বঙ্কিমের ‘বন্দেমাতরম সঙ্গীত’ রবীন্দ্রনাথের ‘ভারততীর্থ’ এই শ্রেণীভুক্ত। ৩. প্রেমমূলক- প্রেমমূলক গীতিকবিতায় কবির আত্ম প্রেমের আশা-নৈরাশ্য-বেদনা-মধুরতা প্রভৃতিকে আশ্রয়কে রূপলাভ করে। যেমন : জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতাসেন’। ৪. প্রকৃতি বিষয়ক- এখানে কবি বাহ্য প্রকৃতির রূপ-রস-স্পর্শ শব্দকে নিজের আন্তর বলে জড়িত করেন। রবার্ট হেরিকের ডেফোডিল এই প্রকারের কবিতা। ৫. সনেট- একটি মাত্র অখ- আখ্যান ভাবকল্পনা বা অনুভূতি ১৪ অক্ষর সমন্বিত চতুর্দশ পঙ্ক্তিতে প্রকাশিত কবিতা সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা নামে খ্যাত। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় সনেটে ‘অষ্টক’ ও ‘ষষ্টক’ নামে দুটি অংশ থাকে। ৬. স্তোত্র কবিতা-গ্রীসে রঙ্গমঞ্চের ওপর বিভিন্ন সুরে বৈচিত্র্যময় অঙ্গিমায় সঙ্গীত ও নৃত্য সহযোগে যে গান দীত হতো- তাকে স্তোত্র কবিতা বলে। ৭. চিন্তামূলক- চিন্তামূলক গীতিকবিতায় কবি জগত ও জীবন সম্বন্ধে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে রূপদান করেন। এই জাতীয় গীতিকবিতায় আবেগের চেয়ে বিবেকের দংশন বেশী লক্ষ্য করা যায়। ৮. শোকগীতি- যে গীতিকবিতায় কবির ব্যক্তিগত বা জাতীয় শোক কাহিনী বর্ণিত হয় তাকে শোক গীতি বলে। যেমন : ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি।’ অথবা ‘মাগো আর কেঁদোনা/ত্রিশ লক্ষ সন্তান হারানোর বেদনা এ বুকে তুলে নিলম/আর শপথ নিলাম/ তোমার আঁচলের এতটুকু সম্মান কাউকে কেড়ে নিতে দেব না।’ ৯. লঘু বৈঠকী কবিতা- সমাজ ও জীবনের লঘু চিত্রটি কখন কবির কলমের আঁচড়ে অনুভূতির সম্পর্শে রঞ্জিত হয়ে বাগবৈচিত্র্যে প্রাণবন্ত হলে তাকে লঘু বৈঠকী কবিতা বলে। খ. মৃন্ময় কবিতার মতো তন্ময় কবিতাকেও কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় ১. গাঁথাকবিতা- পূর্বেই বলা হয়েছে গোষ্ঠী কবিতা সুর করে গীত হতো, প্রাচীনকালে নৃত্য সহযোগে যে গীত হতো তাকে গীত কবিতা বা গাঁথা কবিতা বলা হতো। ২. মহাকাব্য- নানা সর্গে বা পরিচ্ছদে বিভক্ত যে কাব্যে সুমহান বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করে এক বা বহু বীরোচিত কবিতা অথবা অতিলৌকিক শক্তি সম্পদিত কোন নিয়তি নির্ধারিত ঘটনা তেজস্বী শব্দ ও ছন্দ সহযোগে বর্ণিত হয় তাকে মহাকাব্য বলে। যেমন : মধুসূদনের ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য। ৩. নীতিকবিতা- যে কবিতায় কবি গল্প, কাহিনী বা নিছক কলাশিল্পের সাহায্যে জ্ঞানগত নীতি কথা প্রকাশ বা প্রচার করেন তাকে নীতি কবিতা বলে। ৪. রূপক কবিতা- যে কবিতায় কোন গল্প বা কাহিনীর মধ্য দিয়ে অন্য কোন বিশেষ অর্থের ইঙ্গিত করা হয় তাকে রূপক কবিতা (ঝধষষবমড়ৎু) বলে। ৫. ব্যঙ্গ কবিতা- মানব চরিত্র, আচার-ব্যবহার রীতিনীতি অসঙ্গতি সংশোধনের উদ্দেশ্যে যে নীতি কবিতা লিখিত হয়ে থাকে তাকে ব্যঙ্গ কবিতা বা (Parody) বলে। ৬. লিপি কবিতা- এই জাতীয় কবিতায় সাধারণত কোন অনুপস্থিত ব্যক্তি বিশেষকে উপলক্ষ্য করে কবি নীতিকথা আলোচনা ইত্যাদি সম্পর্কে কবিতা রচনা করেন।

সৌন্দর্য ভাবনা কবি মননের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সৌন্দর্য মানুষের আয়ত্ত হওয়ার বিষয় নয়। কোথায় নেই সৌন্দর্য! প্রকৃতিতে সৌন্দর্য, নারীর শরীর সৌধে সৌন্দর্য। বিরহ প্রেমের উৎস। কবিতা সৌন্দর্য বর্ণনার অন্যতম মাধ্যম। তাই কবির নিবিড় স্পর্শ পেয়ে কলমের ছোয়ায় উঠে আসতে পারে ১০১ নীলপদ্ম। রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে শেষ করছি :

‘তোমাকেই যেন ভাল বাসিয়াছি শতরূপে শতবার জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।”