২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যে নামেই ডাকি

  • পলি রহমান

সমকালীন বাংলা কবিতার এক বিস্ময়পুরুষ ‘শাহীন রেজা’। ‘বিস্ময়পুরুষ’ বললাম এ কারণে যে, কবিতায় বার বার যতিচিহ্ন এঁকেও আবার প্রত্যর্পণ করে তিনি শুধু তার কবিতারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেননি, ক্রমশ মজবুত করেছেন কবিতার শরীর এবং তৈরি করেছেন আস্থা, পাঠক ও বোদ্ধামহলের কাছে।

একজন কবিকে সমৃদ্ধ হতে হলে তাকে নিরন্তর ভাঙ্গাগড়ার মধ্যদিয়ে এগুতে হয়। পাহাড় থেকে নেমে আসা শীর্ণকায়া ঝর্ণা ক্রমশ বাঁক বদল করতে করতে যেভাবে অসীম গতিময়তা আর দীর্ঘশরীর নিয়ে সুবিশাল সমুদ্রে পতিত হয় ঠিক একজন কবিকেও তেমনি ক্রমশ তার কবিতার বাঁক বদল ঘটাতে ঘটাতে পৌঁছাতে হয় ঋদ্ধতার শিখরে। কবি শাহীন রেজাতেও আমরা প্রচ্ছন্নভাবে আবিষ্কার কবি এই বাঁকবদলতা। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নির স্্েরাতে জল’ (১৯৮২) থেকে শুরু করে সর্বশেষ ‘যে নামেই ডাকি’ (২০১৯) তে তার যে পরিভ্রমণ তাকে স্পষ্টতই একজন কবির ভ্রমণ হিসেবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি।

‘অগ্নির ¯্রােতে জল’ এর প্রেমিক শাহীন রেজা আর ‘যে নামেই ডাকি’র প্রেমিক শাহীন রেজার মধ্যে যে যোজন যোজন ব্যবধান তা দুটি গ্রন্থ পাঠ করলেই বোঝা যায় প্রচ্ছন্নভাবে। ‘যে নামেই ডাকি’র শাহীন রেজা প্রেমিক তবে সে প্রেম চটুলতায় পূর্ণ নয় সে প্রেমে স্থিত গভীরতা, ভাস্বর আধ্যাত্নিকতা। প্রেম থেকে শুরু করে দ্রোহ, প্রকৃতি, মা মাটি মানুষ এবং সবশেষ মহান ঈশ্বরে সমর্পিত এ কবি আলোচিত গ্রন্থটিতে যেন ঘটিয়েছেন তার কবিসত্তার পূর্ণ বিকাশ। ‘যে নামেই ডাকি’ কে প্রথমে প্রেম সম্পর্কীয় গ্রন্থ মনে করে অনেকেই ভুল করতে পারেন। এ গ্রন্থে প্রেম আছে তবে তা শুধু মাত্র প্রেমিক- প্রেমিকার সাধারণ অনুভব আর উচ্চারণে সীমাবদ্ধ নয়।

‘দূর দূরগামী’ কবিতায় কবি তিন স্তরে বিকশিত করেছেন তার চেতনার আঁধার।

সবশেষে তিনি লিখেছেন,

‘আমি চোখ রাখি ক্রমাগত ঈশ্বরে

আমার ইচ্ছার আকন্দ গাছে খেলা করে

প্রাচীনের অরূপ কুহক’।

ইচ্ছার আকন্দ গাছে প্রাচীনের অরূপ কুহকের খেলা দেখতে দেখতে ঈশ্বরে চোখ রাখা কবি প্রাকারান্তরে নিজেই পূর্ণতার দিকে ধাবিত, অন্তত ‘যে নামেই ডাকি’ পাঠ করলে যে কোন বোদ্ধার মনে এ বিশ্বাস জাগ্রত হওয়াই স্বাভাবিক।

শাহীন রেজার কবিতার প্রধান সুর সরলতা। তিনি খুব সহজ ভাষায় খুব ছোট ছোট উপমায় অনুপ্রাসে তার কবিতার শরীর নির্মাণ করেন। তার কবিতা সহজ বোধ্য তবে সস্তা নয়। বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর গভীরতা নিয়ে এগিয়ে চলা এ কবি দারুণভাবে সমাজ ও দেশমনষ্ক। তার কবিতায় ব্যক্তিপ্রেমের পাশাপাশি দেশপ্রেম মানবপ্রেম ডানা মেলে খুবই সাবলীলতায়।

‘আজও জেগে আছে কুয়াশায় ধোয়া

ভ্রমর পালক সেই তোমারই সে ছোঁয়া’

(ছোঁয়া)

শাহীন রেজা রোমান্টিক এবং নস্টালজিক। উপরোক্ত কবিতাটিতে তিনি যেমন ব্যক্তিপ্রেমিক ঠিক তেমনি ‘লজ্জা’, ‘সেই মেয়েটি’, ‘যাদুকর এবং কবি’, ‘আলো তলোয়ার’, ‘বলছি’, ‘প্রস্তুত হও’ প্রভৃতি কবিতায় শুধু সমাজমনষ্কই নন, দারুণভাবে আচলায়তনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এবং প্রতিরোধীও।

‘যে নামেই ডাকি’ ৪ ফর্মার একটি কাব্যগ্রন্থ। যদি আলোচনা করতে হয় তাহলে এ গ্রন্থভুক্ত ৫২টি কবিতার মধ্যে অধিকাংশ কবিতাই আলোচনার যোগ্য। একজন কবিকে চিহ্নিত করার জন্য দশটি বই নয় তার একগুচ্ছ কবিতাই যথেষ্ট। ‘যে নামেই ডাকি’র মধ্য দিয়ে শাহীন রেজা একজন পরিণত কবি হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছেন আমাদের কাছে।

সবশেষে তার কবিতার দুটি লাইন তারই উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করে লেখার ইতি টানতে চাই-

‘তুমি হাসলে এ ধরণী আলোর গোলাপ

তোমার রোদনে চন্দ্রপতন’

(চন্দ্রপতন)

এ শুধু শাহীন রেজার জন্য নয়, এ হোক সকল প্রকৃত কবি, যারা ঈশ্বরের দূত হিসেবে চিহ্নিত, তাদের জন্য আমাদের সম্মিলিত উচ্চারণ।

এই মাত্রা পাওয়া