১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমিরের বাড়িই এখন খামার

সাঘাটা উপজেলার পুটিমারী গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত কৃষক আমির হোসেন সবজি বিক্রেতা থেকে জীবন শুরু করে নিজ প্রচেষ্টায় ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। এখন সে তার বসতবাড়ি এবং তৎসংলগ্ন বর্গা নেয়া জমিসহ ১৫ বিঘা ২৮ শতক জমিতে বিভিন্ন ফল, সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন এবং সত্যিকার অর্থেই গড়ে তুলেছেন একটি বাড়ি একটি খামার। তিনি ফসল উৎপাদনে কোন রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করেন না। এর পরিবর্তে তিনি নিজের তৈরি কীটনাশক এবং কম্পোস্ট সার জমিতে ব্যবহার করে অধিক হারে ফসল উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন।

আমির হোসেন যখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র তখনই তার দিনমজুর পিতা মোজাহার ব্যাপারীর মৃত্যু হয়। ফলে অসহায় দরিদ্র পরিবারের সন্তান আমির হোসেন বাধ্য হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে প্রথমে একটি হোটেলের মেসিয়ারের চাকরি নেন এবং পরবর্তীতে সবজি বিক্রেতা হিসেবে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। কিন্তু তাতে ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না, জোটে না দুবেলার দুমুঠো আহার। তখন বাধ্য হয়েই পৈতৃক সূত্রে পাওয়া আট শতক জমিতে ধান চাষ এবং বাড়ির আশপাশে নানা সবজি ও ফলের গাছ লাগিয়ে কৃষিতে মনোনিবেশ করেন। এভাবেই একজন পরিশ্রমী আদর্শ কৃষকে পরিণত হন।

১৯৯৬ সালের জুন মাসে বাজার থেকে ১০০টি পেঁপের চারা এনে জমিতে লাগান আমির হোসেন। ওই জমিতেই সাথী ফসল হিসেবে চাষ করেন আদা। ছয় মাসের মাথায় পেঁপে ও আদা বিক্রি করে তার আয় হয় ১৩ হাজার টাকা। এর সঙ্গে আরও কিছু টাকা জমিয়ে কিনলেন ২৩ শতক জমি। সেখানেও একই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করেন।

অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধা খাটিয়ে সফল চাষি হিসেবে এভাবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রতিবছর খরচ বাদে তার আয় হয় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। আমির হোসেন জানালেন, বর্তমানে তিনি দুই বিঘা জমিতে পেঁপে ও সাথী ফসল হিসেবে হলুদ, কলা আড়াই বিঘা, হলুদ ও লেবু ১০ শতক, কচু ১৬ শতক, মরিচ ১৬ শতক, ধান ২ বিঘা, গেন্ডারি আখ ১৬ শতক, আদা ২ বিঘা, নেপিয়ার ঘাস ১০ শতক, ৬৩ শতকে কুমড়া ও সাথী ফসল শসা, ১০ শতকে ধনচে, ১৬ শতকে পটোল, ও সাথী ফসল হিসেবে আদা চাষ করছেন। এছাড়া তিনি ৫৪ শতক জমিতে বসতভিটা করেছেন। ৬০ হাত ঘর ছাড়া বসতভিটাতেও তিনি বিভিন্ন জাতের ফল ও ঔষধী গাছ লাগিয়েছেন। এছাড়াও তিনি ইরি-বোরো ও আমন ধান চাষ করে অধিক ফসল উৎপাদনেও সাফল্য অর্জন করেছেন। এর পাশাপাশি বাড়িতে ৫টি গাভী, ৩৫টি ছাগল এবং শতাধিক হাঁস-মুরগি পালন করেও তিনি অর্থ উপার্জন করে থাকেন।

শুধু সম্পদের মালিকই হননি আমির হোসেন, সাথী ফসল (একসঙ্গে দুই ফসল) চাষে দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় মিলেছে সম্মাননাও। কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার। ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া বাংলাদেশ একাডেমি অব এ্যাগ্রিকালচার থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট এবং জেলা ও উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে ছয় দফায় সনদ পেয়েছেন আমির হোসেন। আমির হোসেনের স্ত্রী করিমন বেগম একজন গৃহিণী। তাঁর এক ছেলে ও দুই মেয়ে। সবার বড় ছেলে আয়নুর রহমান স্নাতক পাসের পর বর্তমানে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডে কর্মরত। বড় মেয়ে লিপি বেগম এইচএসসি পর্যন্ত পড়ার পর বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে আরিফা আক্তার এ বছর ডিগ্রীতে লেখাপড়া করছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ফসল উৎপাদনে আমির প্রচলিত কীঁটনাশক ব্যবহার করেন না। এ জন্য তিনি নিজেই উদ্ভাবন করেছেন কীটনাশক। ১৫ লিটার পানিতে ১৫ ফেঁাঁটা কেরোসিন তেল ও বিষকঁাঁটালি নামের এক প্রকার গাছের রস মিশিয়ে ¯েপ্র করে পোকা দমন করেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি সফলও হয়েছেন। এছাড়া রাসায়নিক সারের পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেন কেঁচো, গরুর গোবর ও কচুরিপানা থেকে তৈরি কম্পোস্ট সার।

আমির হোসেনের জমিতে এখন কর্মসংস্থান হয়েছে চারজন পুরুষ ও তিনজন নারীর। তাদের মাসিক বেতন সাড়ে সাত হাজার টাকা। সেইসঙ্গে তার স্ত্রী করিমন বেগমও এই সফলতার অংশীদার বলে মনে করেন আমির হোসেন। তার মতে আমার স্ত্রীর সহযোগিতা ছাড়া এই অর্জন সম্ভব হতো না। গাইবান্ধার আদর্শ কৃষক আমির হোসেনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা একটি বৃহৎ কৃষি ও গো-খামার প্রতিষ্ঠা করা।

এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে বলা হয়, শুধু কৃষিক্ষেত্রে নিবেদিত থেকেই যে নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো যায় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই আমির হোসেন। এ কারণেই কৃষি বিভাগ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া কৃষি বিভাগের বিভিন্ন সভা সমাবেশে দৃষ্টান্ত হিসেবে আমির হোসেনকে উপস্থিত করা হয় অন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে। যাতে তার এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এ জেলার কৃষকরা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে।

-আবু জাফর সাবু, গাইবান্ধা থেকে