২৪ মে ২০১৯

মাটির ব্যাংক থেকে গরুর খামার

স্বল্প পুঁজি নিয়েও যে ব্যবসা সফল হওয়া যায় তা প্রমাণ করেছেন রংপুরের এক দরিদ্র নারী হামিদা। মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে আসেন একটি ছাগল। সেই ছাগল থেকে পর্যায়ক্রমে জন্ম নেয় আরও ১৭টি ছাগল। তৈরি হয় ছাগলের ছোট্ট খামার। পরবর্তীতে সেই ছাগলগুলো বিক্রি করে কিনে আনেন একটি গাভী। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রংপুরের সফল খামারি সাবরিনা আক্তার হামিদাকে (২৮)। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে দেশী-বিদেশী মিলে প্রায় ২৩টি গরু। রংপুর মহানগরীর ১৫নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ ঘাঘটপাড়া এলাকার রিকশা চালক আবুল বাশারের মেয়ে হামিদা। জন্ম থেকেই অভাব তার নিত্যসঙ্গী। অভাবকে দেখেছেন খুব কাছে থেকে। অভাবের কারণেই স্কুলে পাঠানোর বদলে ১৪ বছর বয়সে তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেন গরিব পিতা।

হামিদা জানায়, অভাব-অনটনের কারণে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। স্বামীর সংসার কখনো সুখের ছিল না। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর বাড়িতে তাকে সইতে হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। এরই মধ্যে ২ সন্তানের জন্ম দেন তিনি। অনেক চেষ্টার পরও স্বামীর সংসারে বেশিদিন ঠাঁই হয়নি হামিদার। ফিরে আসতে হয় পিত্রালয়ে। পরবর্তীতে পীরগাছা উপজেলার পাওটানা এলাকার মোস্তফার সঙ্গে ২য় বিয়ে হয় হামিদার। মোস্তফা বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে হামিদা তার পিতার বাড়িতে চলে আসেন। তিনি জানান, জীবনের শুরু থেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। এজন্য দরিদ্র পিতার কাছ থেকে ৫/১০ টাকা করে নিয়ে মাটির ব্যাংকে জমানো শুরু করেন। সেই জমানো টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে আসেন একটি ছাগল। পর্যায়ক্রমে ছাগলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭টিতে। গরু পালন লাভজনক হওয়ায় হামিদা তার সব ছাগল বিক্রি করে ২০১৬ সালে ১টি গাভী গরু কিনে আনেন। এরপর একটি বেসরকারী সংস্থা থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আরও ২টি গরু কিনে নেন। রিকশাচালক পিতা আবুল বাশার কন্যা হামিদার গরু পালনে আগ্রহ দেখে সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন তার অর্ধেক টাকা দিয়ে গরুর জন্য খাবার কিনে নিয়ে যান। পিতা-মাতা ও হামিদার কঠোর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে পরের বছরই জন্ম নেয় ২টি বাছুর। এভাবে বাড়তে থাকে গরুর সংখ্যা। হামিদা জানান, বর্তমানে আমার খামারে রয়েছে দেশী-বিদেশী প্রায় ২৩টি গরু। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন ৬টি গাভী প্রায় ৩০ লিটার করে দুধ দিচ্ছে। দুধ বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করানোসহ সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। আমার দেখাদেখি এলাকার অনেকেই গরু পালনে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, সরকারী-বেসরকারী কোন সংস্থার সহযোগিতা ছাড়াই গরুর খামার গড়ে তুলেছি। হামিদা বেকারদের উদ্দেশে বলেন, চাকরির পিছনে না ছুটে কেউ যদি গরুর খামার গড়ে তুলতে পারেন তার আর চাকরির প্রয়োজন হবে না। বরং তিনি অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবেন।

তিনি সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, বিশেষ কোন সাহায্য-সহযোগিতা পেলে তার খামারটি আরও বড় করা সম্ভব হবে। রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ১৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাকারিয়া আলম জানান, দরিদ্র ঘরের একজন নারী হয়ে ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন হামিদা। কোন সরকারী-বেসরকারী সংস্থার সহযোগিতা ছাড়াই গড়ে তুলছেন গরুর খামার। হামিদা আমাদের এলাকার গর্ব। একই এলাকার কৃষক বিটুল মিয়া বলেন, নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। তার প্রমাণ সে দেখিয়ে দিয়েছেন হামিদা। হামিদার গাভীর খামার যথেষ্ট লাভজনক হয়ে উঠেছে। এছাড়া প্রতি বছর ১টি করে বাচ্চা পাচ্ছে। আস্তে আস্তে তাঁর খামারে গরুর সংখ্যা বাড়ছে এবং সংসারে আয়-উন্নতি বাড়ছে। এ খামারটিকে আরও অনেক বড় করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

উপজেলা প্রাণীসম্পদ অফিস কৃত্রিম প্রজননকর্মীর সহায়তায় তার দেশী গাভীকে উন্নত জাতের বীজ দিয়ে সংকর জাতের বাছুর পায়। বর্তমানে তার খামারে গাভী ৭টি, বকনা ১টি এবং বাছুর ৬টিসহ মোট ১৪টি গরু আছে। সবই শংকর জাতের গরু। সাবরিনা ১ দোন (৩০ শতাংশ) জমিতে উন্নত জাতের ঘাসের চারা লাগিয়েছেন। বর্তমানে নিজের জমির ঘাস দিয়ে তিনি তার খামারের গাভীর ঘাসের যোগান দিচ্ছেন। খামার শুরুর প্রারম্ভে সাবরিনা বাজার থেকে ঘাস ক্রয় করে গাভীকে খাওয়াতেন।

-আব্দুর রউফ সরকার, রংপুর থেকে