২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঈদে ঢাকতে হবে চরণ যুগল, ইতিহাসের পরিক্রমায় জুতা

ঈদে ঢাকতে হবে চরণ যুগল, ইতিহাসের পরিক্রমায় জুতা
  • কাঠের খড়ম ধরে এসেছে পাদুকা

সমুদ্র হক ॥ জুতা পায়ের নিচে থাকে। তবে জুতা পায়ে না থাকলে মাথার ওপর ওঠে না। কেতাদুরস্ত হয়ে ঘর থেকে বের হয়েছেন, পায়ে জুতা নেই। তখন! চরণযুগল না ঢাকলে সভ্যতা রক্ষা হয় না।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জুতা আবিষ্কার কবিতায় মানবকুলের চরণযুগল ঢাকার বর্ণনা দিয়েছেন। পথ হাঁটতে ধুলার অত্যাচারে রাজা হবুচন্দ্র ভীষণ চিন্তিত। মন্ত্রী গবুচন্দ্রকে ডেকে বললেন, উপায় বের করো। মন্ত্রী, উজির, নাজির সকলেই অস্থির। দেশ-বিদেশের পন্ডিত ডাকলেন। উপায় বের হচ্ছিল না। ঝাড়ুদাররা ধুলায় ছেয়ে ফেলল রাজ্য। শেষ পর্যন্ত এক মুচি এসে বলল, রাজা মশাই ঝাড়ু দিয়ে ধুলা না উড়িয়ে চরণযুগল তো চামড়ায় ঢেকে দিলেই হয়। সেই থেকে জুতার আবিষ্কার।

দৃশ্যটি কল্পনায় আঁকা হতে পারে। তবে এই বস্তুটির আবিষ্কারের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। প্রায় পনেরো হাজার বছর আগে মানুষ পথঘাট পাড়ি দিতে জুতার ব্যবহার শুরু করে। ইতিহাসে কাঠের জুতার পথ ধরেই আজকের আধুনিক জুতা। রামায়ণে আছে, রামের অনুপস্থিতিতে ভাই ভরত রামের পাদুকাযুগল (খড়ম) সিংহাসনে রেখে নিচে বসে রাজ্য পরিচালনা করতেন। প্রজারা ভুল ধরলে বলতেন ‘যত দোষ ওই দাদার খড়ম’। মহাকবি কালিদাসের কাদম্বরী গ্রন্থে সন্ন্যাসীদের নারিকেলের ছোবড়ায় তৈরি পাদুকা ব্যবহারের উল্লেখ আছে। সভ্যতার বিকাশে দিনে দিনে আধুনিক হয়েছে পাদুকা। গড়ে উঠেছে শিল্প।

সভ্যতার সূচনালগ্নে চরণযুগল ঢাকতে কাঠের পাদুকা ব্যবহারের শুরু। এই পাদুকার নাম ছিল খড়ম। ভারতবর্ষে ১৭শ’ শতকে জনপ্রিয় ছিল কাঠের খড়ম। এই দেশে সত্তরের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত রবার ফিতায় ফ্ল্যাট কাঠের খড়ম ব্যবহার হতো। গ্রামে ব্যবহার হতো পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল ও পরের আঙ্গুলের মধ্যবর্তীস্থলে গুঁটি আঁটানো কাঠের এক ধরনের খড়ম। পরিচিতি ছিল বয়লা খড়ম। পরবর্তী সময়ে খড়ম দখল করে রবার ও স্পঞ্জ স্যান্ডেল। ধারাবাহিকতায় আসে চামড়ার স্যান্ডেল। কাঠের পাদুকার ওপর প্রথম আধুনিকায়নে হাত দেয় ইউরোপীয়রা। তারা তৈরি করে হাইহিল জুতা। তবে এই জুতা প্রথম ব্যবহার করে ফ্রান্সের স¤্রাট পঞ্চদশ লুই। উনিশ শতকে ফ্রান্স কাঠ দিয়ে তৈরি করে বিয়ের জুতা। তারা এই ধারণা পেয়েছিল আফ্রিকার মবিসের গ্রামাঞ্চলের ব্যবহৃত জুতা দেখে।

জুতা তৈরির ধারাবাহিকতায় ১৮শ’ শতকে জাপান কাঠ দিয়ে তৈরি করে ‘ওকোবো’ নামের এক ধরনের জুতা। এই জুতার ফিতা ছিল লাল। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকে লেবানিজরা ব্যবহার করত ‘কাবকাবস’ নামের এক ধরনের কাঠের জুতা। বিংশ শতকের মধ্যভাগে ফিনল্যান্ড গাছের ছালবাকল দিয়ে এক ধরনের জুতা বানায়। বৃষ্টি, কাদা, বরফ আচ্ছাদিত পথ পাড়ি দিতে এই জুতা তৈরি হয়। পরে নরওয়ে, সুইডেন, রাশিয়া আধুনিকায়ন করে। পঞ্চদশ শতকে ইতালি কাঠ দিয়ে তৈরি করে ‘চোপিনস’ নামের এক ধরনের জুতা। খ্রিস্টীয় দশম শতকে চীনে তৈরি হয় এক ধরনের জুতা। যা চীনাদের পা ছোট রাখত।

বর্ণাঢ্য ইতিহাসে মানুষের জীবন চলার সঙ্গী হয়েছে এই বস্তুটি। যা না হলেই নয়। জুতা পোশাকের অংশ (পার্ট অব ইউনিফর্ম)। মানুষের উৎসব পার্বণ, নববর্ষ, ঈদ,পূজা,ক্রিস্টমাস,বুদ্ধপূর্ণিমাসহ সামাজিক অনুষ্ঠান বিয়েশাদি ইত্যাদিতে কেনাকাটার পালায় জুতা না হলেই নয়। অনেকে পোশাকের রঙের সঙ্গে ম্যাচ করে জুতা কেনে। বহুজাতিক একটি কোম্পানির ব্যবস্থাপক বললেন তাদের শোরুমে ৮শ’ ডিজাইনের জুতা আছে। উৎসবে সংখ্যা বেড়ে যায়। দাম ৪শ’ ৫০ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠান জুতা তৈরি করছে। এক দোকানি বললেন, পায়ে আরাম-আয়েশের সঙ্গে টেকসই রাখার ভাবনা নিয়েই জুতা পছন্দ করে ক্রেতারা। উৎসবে কারও একজোড়া জুতায় হয় না। অনেক তরুণ-তরুণীর জুতা এ্যাডিকশন আছে। কয়েক জোড়া জুতা দরকার তাদের। পাদুকার কত যে বাহারি ডিজাইন আছে। কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে জুতা কিনতে যায়। পাদুকা পায়ের নিচে থাকলেও পছন্দ বলে কথা।