২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আম পাড়ার তারিখ ঠিক করে দেয়ায় চাঁপাইয়ের চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত

  আম পাড়ার তারিখ ঠিক করে দেয়ায় চাঁপাইয়ের  চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত

ডিএম তালেবুন নবী ॥ গাছ থেকে আমপাড়া ও বাজারজাত করণে আম চাষীদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি দুই জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর আম মানের দিক দিয়ে সর্বাগ্রে রয়েছে। তবে দুই জেলার ব্যবধান মাত্র সাড়ে চার কিলোমিটার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থেকে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার ব্যবধান মাত্র সাড়ে চার কিলোমিটার। অথচও এবার রাজশাহী প্রশাসন আম ভাঙ্গার নির্দিষ্ট তারিখ বেঁধে দিয়েছে ইতোমধ্যেই। গত ১৫ মে বুধবার আম ভাঙ্গার নির্দিষ্ট তারিখ বেঁধে দেয় রাজশাহী প্রশাসন। এদিকে এবারই সর্ব প্রথম চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রশাসন আম ভাঙ্গার নির্দিষ্ট তারিখ বেঁধে না দিয়ে কৃষকের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। অথচ রাজশাহী জেলার আমের জমির পরিমাণ কম। মাত্র ১৭ হাজার হেক্টর। পাশাপাশি চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের জমির পরিমাণ প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর। উৎপাদনের দিক থেকে বেসরকারীভাবে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন। সরকারীভাবে সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন। জমি কম হবার কারণে রাজশাহী আম উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় পৌনে তিন লাখ মেট্রিক টন সরকারী হিসাবে।

গত দুই বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম পাড়ার তারিখ নির্ধারণ করায় চাষীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রশাসন এবার আম পাড়ার নির্দিষ্ট তারিখ থেকে সরে এসে তা কৃষকদের উপর ছেড়ে দিয়েছে। চাঁপাইয়ে প্রায় ১৫শ’ জাতের আম রয়েছে। কোন কোন আমের জাত অনেক আগেই পেকে যায়। সরকার সময় বাঁধার কারণে চাঁপাইয়ের বহু আমচাষী তাদের আম গাছে পেকে পড়ে গেলেও কোন কিছু করতে পারেনি। ফলে আম পেকে পড়ে গিয়ে বহু আম নষ্ট হয়েছে। তাই আম চাষীদের অনুরোধ ছিল তারা বিষমুক্ত আম উপহার দিবেন তবে সময় বেঁধে দিলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষীরা গত কয়েক বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করছে।

এদিকে রাজশাহী প্রশাসন সময় বেঁধে আম পাড়ার তারিখ নির্ধারণ করায় বেসামাল হয়ে পড়েছে চাঁপাইয়ের আম চাষীরা। ইতোমধ্যেই রাজশাহীর আম চাঁপাই অঞ্চলে ঢুকে পড়ায় এখানকার চাষীরা দারুণভাবে হতাশ হয়ে পড়েছে। কারণ একটাই রাজশাহীর আমের সঙ্গে অন্যান্য জেলার আমও ঢুকে পড়েছে। তাছাড়া চাঁপাই অঞ্চলে এবার আমের উৎপাদন অনেকটাই ভাল হয়েছে। মুকুল এসেছে দেরিতে, তাছাড়া কোন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় না থাকায় ফলনও হয়েছে ভাল। আরও মাস খানেক পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম পাকা শুরু হবে।

কিন্তু পাশাপাশি দুই জেলার প্রশাসনের সঙ্গে কোন ধরনের সমন্বয় না থাকায় রাজশাহী এবার অনেক আগেই আম পাড়ার তারিখ নির্ধারণ করেছে।

এ বছরে এখন পর্যন্ত এই মে মাসে মাত্র দুটি কালবৈশাখী এই জেলার ওপর বয়ে গেছে। আম পড়েছে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন। এখনও গাছে ৮৫ শতাংশ আম রয়ে গেছে।

এ বছর বাগান পরিচর্যায় এক ধরনের অনীহা ছিল আম চাষীদের। কিন্তু আবহাওয়া গত বছরের তুলনায় অনেকটা অনকূলে থাকায় এবার আমের উৎপাদন অনেকটা ভাল হবে বলে আশা করছে আমচাষীরা। সেই সঙ্গে রাসায়নিক সার দিয়ে আম পাকানো ঠেকাতে প্রশাসনের নজরদারির পাশাপাশি আমপাড়ার সময়সীমা না বেঁধে দেয়ায় খুশি আম চাষীরা। জানা গেছে, এ বছর কীটনাশকের ব্যবহার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। যাদের বাগান ঘন তারাই শুধু কিছুটা কীটনাশক ব্যবহার করেছে। বর্তমানে বাগানে পাহারা বসানোর জন্য ঘর মেরামত বা কুঁড়ে তোলা হচ্ছে। অধিকাংশ গাছের ডালপালায় অধিক আম আসায় তা ধরে রাখতে ঠেকা দেবার কাজ চলছে দ্রুত গতীতে। তবে এবার আম বাগানের তেমন দাম নেই বললেই চলে। এবছর বাগান কেনার ক্রেতার অভাব। তাই আম চাষীরা বাড়তি পরিচর্যায় তেমন একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এছাড়াও সম্প্রতি হাইকোর্টের একটি আদেশকে কেন্দ্র করে আম চাষীরা রায়টি সম্পর্কে ভাল না জানার কারণে এবং জ্ঞান না থাকায় আম চাষীরা অনেকটা উদাসীন ছিল। তবে আবহাওয়ার কারণে এবং পরিচর্যা খচর অর্ধেকে নেমে আসায় অন্যান্য বছরের তুলনায় লাভের আশা বেশি করছে। এখানে গুটি জাতের আম ও গোপালভোগ জুন মাসের আগে পাকবে না বা বাজারে আসবে না। তারপরই খিরাসাপাত জাতের সর্বশ্রেষ্ঠ আম বাজার আসবে। যা জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত চলে যাবে। এদিকে আমের বাজার ও বাগানগুলো মনিটরিং শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। এবার যেন অপরিপক্ব আম পেড়ে রাসায়নিক দিয়ে পাকাতে না পারে সেজন্য নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে শিবগঞ্জ এলাকার অর্থাৎ প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমির মধ্য ১২ হাজার হেক্টরের আম বাগান খুবই বিস্তৃত ও লম্বা। এইসব বাগানে কোন দিন সূর্যের আলো প্রবেশ করেনি। হাইকোর্টের নির্দেশের পর আম বাগান পরিচর্যায় কিছুটা বিব্রত প্রশাসন ও পুলিশ। কারণ বিশাল বিস্তৃত আম বাগান দেখভাল ও পরিচর্যার জন্য পুলিশের নেই তেমন জনবল। তাছাড়া তাদের সীমিত সদস্য দিয়ে দেখতে হয় আইনশৃঙ্খলার কাজ। তাই বাগান পরিচর্যার কাজে পুলিশ মোতায়েন করলে তাদের হাতে আর পুলিশ থাকবে না। যদিও তারা প্রকাশ্যে এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেনি। তবে কাজে কামে সেইভাবে বাগান পাহারা দেয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেছে অনেকেই। তাছাড়া বাগান মালিক বা চাষীরা কোন সময় ক্ষতি কারক কোন রাসায়নিক ব্যবহার করে না। আম পাড়তে আসার পর এই সব রাসায়নিক ব্যবহার করে থাকে ব্যবসায়ীরা। তাই এবার প্রশাসন ও পুলিশের কড়া নজরদারি রয়েছে বিভিন্ন আড়তের ওপর।

যেমন দেশের সর্ববৃহত আম বাজার হলো কানসাট। এখানে প্রায় হাজার খানেক আমের আড়ত বসে। তবে অস্থায়ী আড়তের সংখ্যা মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার আড়তে বিভিন্ন জাতের আম কেনা বেচা হয়ে থাকে। এই আম বাজার বিস্তৃত প্রায় কয়েক কিলোমিটার। এখান থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার ট্রাক আম বোঝাই করে ছেড়ে যায় গন্তব্যে। তাই প্রশাসন ও পুলিশ এবার কানসাট আম বাজারের উপর নজরদারি বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। বাজার নিয়ন্ত্রণে উভয় প্রশাসনের জনবল সঙ্কট হওয়ায় তাদের আগাম ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ আম বাজার তদারকিতে নামা মাত্র উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল কাজ কাম বন্ধ হয়ে যাবে। তার পরেও পুরো জনবলকে তারা কাজে লাগাবার অর্থাৎ আম বাজারজাত করণে বাড়তি নজরদারি অব্যাহত রাখবে। শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট আম বাগানের বিস্তৃতির কারণে ভারতের মালদহ পর্যন্ত তা বিস্তৃত।

গত দুই বছর আম পাড়ার সময় সীমা বেঁধে দেয়ায় ব্যবসায়ীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাপমাত্রা ও আবাহাওয়া জনিত কারণে নির্দিষ্ট বেঁধে দেয়া সময়ের অনেক আগেই আম পেকে যায়। এবার তা হচ্ছে না। কারণ আমের মৌসুম শুরু হতে অনেক দেরি। তাই কৃষকদের আতঙ্কিত না হয়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী বাগান পরিচর্যা করা তাদের জন্য উত্তম। আদালতের নির্দেশক্রমে ক্ষতিকারক রাসায়নিক দিয়ে আম পাকানোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ কিছু দিন আগে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আম পাড়ার বিষয়ে একটি সভা করেছে। এই সভায় এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম পাড়ার সময়সীমা নির্ধারণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এবারই প্রথম জি.আই অনুমোদন পেয়েছে চাঁপাইয়ের ক্ষিরসা আম। সব মিলিয়ে এবার রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে শতাধিক টন আম বিদেশে যাবে। যার মধ্যে ক্ষিরসাপাত সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে। এবার রাজশাহী থেকে ৫০ টন আম বিদেশে রপ্তানি করতে চায় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ।

রফতানিযোগ্য আম তৈরিতে অধিক ভূমিকা পালন করে থাকে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি। নানান জটিলতার কারণে চাঁপাই ও রাজশাহী হতে আম রফতানিতে তেমন গতি আসেনি।

কৃষি সম্প্রসারণ সূত্র নিশ্চিত করেছে বিদেশে আম রফতানি করতে হলে ২৬টি শর্ত মানতে হয়। ব্যাগিং হচ্ছে এইসব শর্তের একটি। গত বছর কোয়ারেনটাইল পরীক্ষার কড়াকড়ি করার কারনে আম রপ্তানি কম হয়। একটি বিশেষ জেলার জনৈক ব্যক্তি কোয়ারেন্টাইল দায়িত্বে থাকায় তিনি চান তার জেলার আম অধিক (রাজশাহী বা চাঁপাই নয়) পরিমানে রপ্তানি হোক। তাই সে সব ধরনের কড়াকড়ি করায় চাঁপাই ও রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা মার খেয়েছে। কারণ রাজশাহীতে আম রফতানিতে নিয়োজিত রয়েছেন ১৪ জন। সম পরিমাণ চাঁপাইয়েও রয়েছে। রাজশাহী গত বছর ১০০ মেট্রিক টন আম রফতানির জন্য তৈরি করেছিল। যে আম পরে স্থানীয় বাজারে কম মূল্যে ছাড়তে বাধ্য হয়। রাজশাহী ও চাঁপাই নবাবগঞ্জে এবার শুধু রফতানির লক্ষ্যে প্রায় সাড়ে তিন কোটি আম ফ্রুট ব্যাগ পদ্ধতিতে চাষ করা হয়।