১৮ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমদানী করা চালেই কৃষকের সর্বনাশ!

আমদানী করা চালেই কৃষকের সর্বনাশ!

স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর ॥ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান উৎপাদন করে কৃষকরা বোরো ধানের ন্যায্যমুল্য না পেলেও, ভারত থেকে ব্যাপকহারে হচ্ছে চাল আমদানী। এতে কম দামে চাল আমদানী করে আমদানীকারকরা লাভবান হলেও উৎপাদিত পন্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। মিল মালিকরা বলছেন, বিদেশ থেকে ব্যাপকহারে চাল আমদানীর ফলে বাজারে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। বিদেশী চালের কারনে বাজারে কমেছে চালের দাম ও চাহিদা। আর এ কারনেই তারা বেশী দামে ধান কিনতে পারছেন না। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সংকট না থাকা সত্বেও বিদেশ থেকে চাল আমদানী করায় বাজারে ধানের দাম কমছে। আমদানী বন্ধ না হলে কৃষকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিশেষজ্ঞ ও মিল মালিকরা। আমদানী নির্ভরতা না থাকলেও আমদানী করা চালই কৃষকের সর্বনাশ ডেকে আনছে বলে জানিয়েছেন তারা। আর কৃষকরা বলছেন, এভাবে লোকসান খেতে থাকলে ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন কৃষকরা।

চলতি বোরো মৌসুমে ধানের জেলা দিনাজপুরসহ সারাদেশে ধানের দাম না থাকায় কৃষকরা চরম লোকসানের মুখে পড়েছে। বাজারে ধান বিক্রি করে লাভ তো দুরের কথা, উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না কৃষকরা। বাজারে ধানের দাম না থাকায় ইতিমধ্যেই যারা ধান কর্তন করেছেন, তারা বাজারে পানির দামে ধান বিক্রি করে হতাশ ও বিমর্ষ হয়ে বাড়ী ফিরছেন। আর যারা এখনও ধান কাটেননি, তারা চড়াদামে মজুরী দিয়ে ধান কাটার সাহস পাচ্ছেন না। দিনাজপুরে বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতিমন ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। কৃষকরা জানান, এই দামে ধান বিক্রি করে লাভ তো দুরের কথা, উৎপাদন খরচও উঠবে না তাদের। বাজারে দাম না থাকায় বাধ্য হয়েই লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করছেন তারা।

দিনাজপুর সদর উপজেলার বোলতৈড় গ্রামের কৃষক সেলিম রেজা জানান, প্রতিবিঘা জমিতে ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে সব মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার টাকা। আর একবিঘা জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ৩৪ মন। এক বিঘা জমির ধান বাজারে বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন ১৭ হাজার টাকা। এতে করে বিঘাপ্রতি লোকসান এক হাজার টাকা। সাথে রয়েছে বিনিয়োগ ও নিজের শ্রম। আর যদি বর্গাচাষী হয় তাহলে এই লোকসানের পরিমাণ দাড়াবে প্রায় ৭ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা। গত কয়েক বছর ধরেই ধানে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদেরকে। এভাবে চলতে থাকলে ধানচাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন কৃষকরা বলে জানান তিনি।

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক তৌহিদুল ইকবাল জানান, দিনাজপুরে জেলায় এবার মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ মেট্রিকটন চাল। তিনি জানান, ইতিমধ্যেই বোরো ধান কাটা শুরু করেছে কৃষকরা। এবারে রোগ বালাই না থাকা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে।

এদিকে ধানের বাম্পার ফলন হলেও ভারত থেকে ব্যাপকহারে চাল আমদানী করা হচ্ছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থলবন্দর দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর শুল্ক ষ্টেশনের দেয়া হিসেবে, চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে মে মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত ভারত থেকে চাল আমদানী করা হয়েছে ৪৪ হাজার ৮৬ মে.টন। ২৮ শতাংশ শুল্ক মূল্যে এসব চাল আমদানী করা হচ্ছে। হিলি শুল্ক ষ্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা নুর আমীন জানান, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে গত জানুয়ারী মাসে ১১ হাজার ৮শ’ ৬৮ মে.টন চাল, ফেব্রুয়ারী মাসে ৭ হাজার ৯শ’ ৬৫ দশমিক ৭ মে.টন, মার্চ মাসে ৯ হাজার ৬শ’ ৯৭ দশমিক ৭৫ মে.টন, এপ্রিল মাসে ৮ হাজার ২শ’ ১২ মে.টন ও চলতি মে মাসের ২৩ তারিখ পর্যন্ত ৬ হাজার ৩শ’ ৪৪ মে.টন চাল আমদানী করা হয়েছে। এসব চালের বেশীর ভাগই সম্পা কাটারী বলে জানান তিনি। হিলি স্থলবন্দর আমদানী-রপ্তানীকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন-অর রশিদ হারুন জানান, বর্তমানে ভারত থেকে যে চাল আমদানী হচ্ছে, তা চিনিগুড়া জাতের আতপ চাল।

এদিকে সরকার কৃষকদের ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করতে সংগ্রহ অভিযানে চালের মুল্য নির্ধারন করছে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা। কিন্তু ভারত থেকে প্রচুর পরিমানে চাল বাংলাদেশে আমদানী হওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে। ফলে কৃষকরা ধানের ন্যায্যমুল্য পাচ্ছেন না। বাজারে ধানের দাম কমার বিষয়ে মিল মালিকরাও দুষছেন বিদেশ থেকে চাল আমদানীকে। দিনাজপুর জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মোসাদ্দেক হুসেন জানান, বিদেশ থেকে ব্যাপকহারে চাল আমদানীর ফলে বাজারে কম দামেই চাল বিক্রি করছে আমদানী কারকরা। এতে বাজারে চালের চাহিদা ও দাম দুটোই কমছে। তাই বেশী দামে ধান কিনে চাল বিক্রি করতে পারছেন না তারা। তিনি জানান, গত আমন মৌসুমেও বাম্পার ফলন হয়েছে। এবার বোরোতে ফলন হয়েছে বাম্পার। তাই দেশের কৃষকদের ন্যায্যমুল্য প্রদানে বিদেশী চাল আমদানীকে নিরুৎসাহিত করার গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি জানান, কৃষকদের স্বার্থে ও কৃষি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আমদানী নয়, বরং দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে চাল রফতানী করা উচিত। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ধান উৎপাদন বাড়লেও বিদেশ থেকে ব্যাপকহারে চাল আমদানী অব্যাহত থাকায় বাজারে ধানের দাম বাড়ছে না। আর বিদেশ থেকে চাল আমদানী করায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমুল্য পাচ্ছেনা। এতে কৃষকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এটিএম শফিকুল ইসলাম জানান, গত কয়েক বছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবং বাংলাদেশ ধান গবেষনা ইনষ্টিটিউটের কার্যকরী পদক্ষেপে দেশে ধান উৎপাদন অনেকগুন বেড়ে গেছে। এতে বার্ষিক চাহিদার তুলনায় অনেক বেশী পরিমান ধান উৎপাদন হচ্ছে। এই অবস্থায় প্রয়োজন না থাকা সত্বেও বিদেশ থেকে চাল আমদানী করা হচ্ছে। এর ফলেই কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমুল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি কৃষকদের ন্যায্যমুল্য প্রদানে এবং কৃষকদের বাঁচাতে যতদিন দেশে অতিরিক্ত ধান উৎপাদন হবে, ততদিন বিদেশ থেকে চাল আমদানী না করার উপর গুরুত্বারোপ করেন। আর তা না হলে কৃষি অর্থনীতিতে ধ্বস নামবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া