১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট অর্থনীতি সমিতির

সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট অর্থনীতি সমিতির

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় সাড়ে ১২ লাখ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। তবে সরকার নতুন অর্থবছরে ৫ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে যাচ্ছে। সরকারের খসড়া বাজেটের চেয়ে অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দ্বিগুণেরও বেশি।

শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০১৯-২০’ উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন সমিতির সভাপতি অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জামালউদ্দিন আহমেদসহ সমিতির সদস্যরা এসময় উপস্থিত ছিলেন। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এ ধরণের বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা দিয়ে আসছে দেশের অর্থনীতিবিদদের এই সংগঠন। আগামী ১৩ জুন জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার কথা রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। ঢাকাসহ দেশের ২৬টি জেলা শহরে একই দিনে একই সময় এটি অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে, সমিতির প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৯০ কোটি টাকা যা অর্থমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রায় ৫ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা বাজেটের কমপক্ষে দ্বিগুন। প্রস্তাবিত রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ ২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৬৯ শতাংশ হবে প্রত্যক্ষ কর ও ৩১ শতাংশ হবে পরোক্ষ কর, অর্থ্যাৎ মোট বাজেট বরাদ্দের প্রায় ৮১ শতাংশের যোগান দেবে সরকারের রাজস্ব আয়।

আবুল বারকাত বলেন, অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে ২০টি নতুন উৎস নির্দিষ্ট করা হয়েছে যা আগে ছিল না। এর মধ্যে অর্থপাচার রোধ, কালো টাকা উদ্ধার ও সম্পদ কর এই তিনটি নতুন উৎস থেকেই সরকার মোট ৯৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারবে। আর এ টাকা দিয়ে প্রতিবছর তিনটি পদ্মাসেতু করা সম্ভব। তিনি বলেন, সমিতির প্রস্তাবিত বাজেট অর্থায়নে কোনো বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন হবে না। বরং প্রস্তাব অনুযায়ী বাজেটের আয় কাঠামোতে মৌলিক গুণগত রূপান্তর ঘটবে। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। কেউ হয়তো বলবেন অনেক বড় ঘাটতি। এক্ষেত্রে বলতে চাই, জাপানে বাজেট ঘাটতি ২৫৬ শতাংশ। ঘাটতি বাজেটে অসুবিধা হলে এক পয়সাও ঘাটতি না রেখে আমাদের প্রস্তাবিত রাজস্ব আয় দিয়েও মোট বাজেট প্রস্তুত করতে পারেন। আজকের উন্নত দেশের প্রায় সবাই যখন উন্নতি করছিল ১৯৩০-১৯৭০ দশক পর্যন্ত সময়ে তখন তাদের সবারই সরকারী ব্যয় বরাদ্দ ছিল বেশ বেশি। প্রবৃদ্ধির হারও ছিল বেশি।

অর্থনীতি সমিতির অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাতওয়ারি সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রস্তাব করেছে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে। এতে মোট ২ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। তারপর আছে জনপ্রশাসন, পরিবহন, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বাস্থ্যখাত, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাত। চলতি বছরের সরকারী বরাদ্দের চেয়ে বেশি সমিতির প্রস্তাবিত বাজেট বরাদ্দ অন্যান্য খাতগুলো হলো-কৃষি, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, শিল্প ও অর্থনৈতিক সার্ভিস, জনশৃঙ্খলা-নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা।

কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার বিষয়ে আবুল বারকাত বলেন, আমরা মনে করি, প্রস্তাবিত বাজেট বছরেই কৃষি ও কৃষক ভাবনার যথার্থতা বিচারে ১ লাখ ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে কমপক্ষে ২ লাখ বিঘা কৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়া সম্ভব। আর পাশাপাশি ২০ হাজার জলাহীন প্রকৃত মৎস্যজীবী পরিবারের মধ্যে কমপক্ষে ৫০ হাজার বিঘা খাস জলাশয় বন্দোবস্ত দেয়া সম্ভব। বিষয়টি বাজেটে অন্তর্ভূক্ত করে এ লক্ষ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দসহ বাস্তবায়ন কৌশল সংশ্লিষ্ট পথনির্দেশনা দেয়া জরুরি।

তিনি বলেন, দেশে প্রতি বছর ৩০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে কিন্তু তার মধ্যে ২০ লাখ মানুষেরই কর্মসংস্থান হয় না। ক্রমবর্ধমান মানব বঞ্চনা-বৈষম্য-অসমতা দূরীকরণ, শিক্ষা ব্যবস্থার মূলধারার অধিকহারে বৈষম্য রোধ, কর্মসংস্থান বাড়ানো ও বেকারত্ব কমাতে অন্যান্য অনেক কিছুর পাশাপাশি জাতীয় কর্মসংস্থান পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে। যুবকদের উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক হতে উৎসাহিত করতে স্টার্ট আপ পুঁজি সরবরাহ এবং শিক্ষাখাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব দেন আবুল বারকাত।

শিক্ষার সব স্তরে বাংলা ভাষাকে জ্ঞানচর্চার মূল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, সমগ্র শিক্ষা কাঠামোকে ঢেলে সাজাতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা অন্য কোনো ভাষা শিখবো না। অবশ্যই শিখবো। উচ্চ শিক্ষা স্তরে সব শিক্ষার্থীর জন্য কমপক্ষে দুটি বিদেশি ভাষাশিক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে আবুল বারকাত বলেন, অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের মোকাবেলার জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে তাদের পূর্ণউদ্যমে চালু শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ঠিক হবে না। সমস্যাটি জটিল তবে সমাধান সম্ভব বলে মনে করি। আগামী ৩ বছরের মধ্যে কমপক্ষে ৫ লাখ ভ্যাট লাইসেন্সধারীকে ভ্যাটের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়, এনবিআর ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে বাংলাদেশের ভ্যাট লাইসেন্সধারীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে বড়জোর ১ লাখ লাইসেন্সধারীর কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে।

আবুল বারকাত বলেন, সরকার সিগারেট থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, বিড়ি থেকে ১ হাজার কোটি টাকা এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য থেকে ১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণ করতে পারেন। সমিতির আরও কয়েকটি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে-ব্যক্তি পর্যায়ে কর হার কমিয়ে ৩ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ রাখা, ৫০ শতাংশ নি¤œতর কর দেবার যোগ্য কমপক্ষে ৫০ লাখ টিআইএন ধারী মানুষের সংখ্যা বাড়ানো। সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ স¤পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ এফসিএ। তিনি বলেন, সমিতির সদস্যদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বিকল্প বাজেট উপস্থাপনা করা হয়েছে।