১৮ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সামাজিক যোগাযোগে সত্য ও মিথ্যা

  • রেজা সেলিম

এখনকার দুনিয়ায় ইন্টারনেটভিত্তিক যে ক’টি সামাজিক মাধ্যম অব্যাহত আছে সেসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে ফেসবুক। আর যেসব সামাজিক সমস্যা ঘরের গন্ডি ছাড়িয়ে বাইরের জগতে, এমনকি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পর্যন্ত প্রভাব ফেলছে তার অনেকাংশেরই বাহন এখন ফেসবুক। এ সপ্তাহের সবচেয়ে বেশি আলোচিত এমন একটি ঘটনা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পীকার ন্যান্সি পেলোসির বানানো বা বিকৃত ভিডিও, যা ফেসবুক ও টুইটারে কয়েক মিলিয়ন শেয়ার হয়েছে, এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও শেয়ার করেছেন। এ ভিডিওতে দেখা গেছে, এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সময় ন্যান্সি পেলোসির কথা জড়িয়ে আসছে। দেখে মনে হবে তিনি মাতাল। পরে জানা গেল ইচ্ছাকৃতভাবে ‘এডিট’ করে পেলোসির কথার গতি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আর তাতেই মনে হচ্ছে পেলোসি মাতাল অবস্থায় কথা বলছেন। কোন কোন গণমাধ্যম তাদের নিউজ ফিড থেকে সেটি সরিয়ে নিলেও লাখ লাখ মানুষ ভিডিওটি ইতোমধ্যে দেখে ফেলেছেন। এতে ন্যান্সি পেলোসির মতো নামী মানুষের সামাজিক সম্মান যেটুকু হেয় হয়েছে তার চেয়ে বেশি হেয় হয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার। একজন নেতৃস্থানীয় মানুষের মিথ্যা বা বানানো বিকৃত ভিডিওকে সত্য মনে করেছেন অনেক মানুষ। ফেসবুক নানা অজুহাতে এটি সরিয়ে নিতে চাইছে না। তাদের যুক্তি, সত্য-মিথ্যা যাচাই করবেন যিনি ভিডিও দেখেছেন তিনি নিজেই। ফলে তারা এটা সরাবে না। ইউটিউব এই ভিডিও অবশ্য সরিয়ে নিয়েছে।

সংবাদ পরিবেশনে ‘ফেক নিউজ’ বলে একটি কথা চালু আছে। অপর একটি হলো ‘বিকৃত বা ডিস্টোর্টেড নিউজ’। যেহেতু এখন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় নানা পদ্ধতিতে সংবাদ পরিবেশন হয় ও তার বেশিরভাগই হয় ইন্টারনেটভিত্তিক। ফলে যে কোন সংবাদ বিকৃত করে পরিবেশন সহজ। চাইলে যখন খুশি তা সরিয়েও নেয়া যায় বা অস্বীকার করা যায়। যদিও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এসবের সূত্র বের করা এখন মোটেই কঠিন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এভাবে সংবাদ পরিবেশন বা ইচ্ছাকৃত ভিডিও বিকৃতির কাজ মানুষ কেন করে? ফোর্বস ম্যাগাজিনে ১৮ মার্চ ২০১৬ তারিখে এ রকম বিতর্ক নিয়ে একটি রচনা প্রকাশিত হয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। লেখক এ জে আগরওয়াল উল্লেখ করেছিলেন এ রকম বিকৃত সংবাদ পরিবেশন তখনই হয় যখন কেউ সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আসক্ত হয়। কিন্তু সবসময়ই এই আসক্তি খারাপ হয় না, যদি কেউ নেটওয়ার্কে নিয়মিত উপস্থিত থাকে ও খবরের মূল উদ্দেশ্য বুঝতে চেষ্টা করে। তিনি এমনও উল্লেখ করেছেন, যদি গাড়ি চালাবার সময় কোন চালক মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সেটা অনেক বেশি বিপজ্জনক। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাস্তার সঙ্কেত বা ট্রাফিক পরামর্শ কখনও কাম্য হতে পারে না। সেক্ষেত্রে চালক পথের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এতে বিপদ ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে অনলাইনে সড়কের তথ্য দিয়ে ম্যাপ বা এফএম রেডিও অনেক বেশি ভাল উদ্যোগ হতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। অনেকে ফেসবুকে পথে-ঘাটের বা রাস্তার যানজটের খবর দেন। কোন চালক যদি সেসব খবর বারবার দেখতে আসক্ত হয়ে পড়েন তাহলে তিনি অন্য মাধ্যমের ওপর ভরসা রাখবেন না। তাই এসব বিষয়ে লেখক আগরওয়াল ভাবতে পরামর্শ দিয়েছেন।

বাংলাদেশে যারা নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহার করেন তাদের অনেকেই বিভিন্ন সময় নানারকম তথ্য বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছেন এমন উদাহরণ মোটেই কম নয়। এসব বিভ্রাটের অন্যতম কারণ দুই পক্ষেরই ভুল ধারণা। যারা এসব ভুল তথ্য দেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গবেষণায় তাদের দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণীভুক্ত মানুষ সম্পূর্ণ জ্ঞাতসারে, উদ্দেশ্যমূলক পরিকল্পনা নিয়ে এসব করে থাকেন আর দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্তরা না বুঝে, অনেকটা ইন্দ্রিয়তাড়িত আসক্তি থেকে এমন ভুল তথ্য বা মিথ্যা কথা পরিবেশন করেন, যা তাদের মস্তিষ্কের বিবেচনাবোধ নিয়ন্ত্রণে অক্ষম। অপরদিকে যারা এসব তথ্যে বা সংবাদে সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে পড়েন বা তাড়িত হন তাদেরও বিবেচনাবোধের অভাব রয়েছে। কিন্তু সমাজে যারা বিচলিত হয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তাদের চিন্তা করতে হবে এসব তথ্যে কারও ব্যক্তি জীবনের, সমাজের, রাষ্ট্রের কি কি ক্ষতি হতে পারে বা কি প্রভাব পড়তে পারে তা বুঝবার ভাবনাটুকু তিনি করেছেন কি-না। আমাদের ডিজিটাল আইনে সেরকম একটি সুযোগ রাখা হয়েছে, কেউ আপত্তিকর কিছু লিখলে বা করলে তা নিয়ে গবেষণামূলক তদন্ত করে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিয়ে থাকে।

কিন্তু সরকারী পদক্ষেপের আগে আমাদের আসক্তির বিবেচনা জরুরী। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ফেসবুকের যেসব মিথ্যা বা বিকৃত তথ্যে মানুষ কম প্রতিক্রিয়া জানায় সেগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। কারণ, নেটওয়ার্কের সদস্যরা বিবেচনা করে বুঝতে পারে এমন সব তথ্য সঠিক নয়। সব মিথ্যার জবাব দেয়া জরুরী নয়; কিন্তু কিছু মিথ্যা আছে সেসবের জবাবের চাইতে সে মিথ্যার স্বরূপ উন্মোচন করা অতি গুরুত্বপূর্ণ। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় হেফাজত পক্ষ ও কিছু অতি ধর্মীয় গোষ্ঠী শাহবাগের জামায়াতের অনুসারীদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। এক সময় নাস্তিকের এই প্রচারণা এমন রূপ নেয় যে, অনেক সাধারণ মানুষ যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন তারা যে নাস্তিক নন সে ব্যাখ্যা দিতে দিতে হিমশিম খেতে হয়েছিল। এর প্রধান কারণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মুহূর্তে সত্য-মিথ্যার ধূম্রজাল তৈরি করে যে কারও ভাল উদ্দেশ্য, এমনকি কোন ন্যায্য আন্দোলনের উদ্দেশ্যকেও চ্যালেঞ্জ করে বসতে পারে। তখন যে কোন নেটওয়ার্ক সদস্যের কাজ হলো গভীরভাবে ভেবে-চিন্তে সে বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটি ধারণায় পৌঁছানো। আমাদের অনেকেই হুট করে কিছু একটা লিখে দেন, যা সামাজিক যোগাযোগের ব্যবহারিক সংস্কৃতির সংজ্ঞায় সঠিক নয়। নেটওয়ার্কগুলোর এমন অনেক নির্দেশনা ও পরামর্শ আছে যেগুলো আমাদের ভাল করে পড়ে ও বুঝে নেয়া উচিত।

বাংলাদেশে টুইটার খুব একটা জনপ্রিয় নয়। কিন্তু ভারতসহ প্রায় সব দেশের উচ্চস্থানীয় ব্যক্তিত্বসহ সরকারী-বেসরকারী প্রচারণায় টুইটারের ব্যবহার অনেক বেশি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রচুর টুইট করেন। যে কারণে পর্যবেক্ষক ও সামাজিক যোগাযোগ নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের মতে তিনি প্রচুর ভুল টুইট করেন, যা তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে কাম্য নয়। ট্রাম্পের অনেক টুইট বিশ্বব্যাপী ভুল বার্তা দিয়েছে, যা মার্কিন সরকারের জন্যও কখনও কখনও বিব্রতকর হয়েছে। কারণ, মনোসংযোগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেক বেশি তাৎক্ষণিক। ফলে তাঁর অনেক টুইটের বক্তব্য কূটনৈতিক শিষ্টাচার ছাড়িয়ে গেছে বলেও পর্যবেক্ষক ও গবেষকগণ মনে করছেন।

তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, উপকারী ও একইসঙ্গে ক্ষতিকর। সমাজের জন্য ভাল এমন কাজ এই মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি করা সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই মাধ্যমের অপব্যবহারও হয়েছে ও হচ্ছে অনেক বেশি। ফেসবুক বাণিজ্য সেবায় বাজার দখলের উদ্দেশ্যে এফ-কমার্স চালু করে বিশ্ব ইলেক্ট্রনিক কমার্স বা ই-কমার্স ব্যবসার মূলে কুঠারাঘাত করেছে বলে অনেকে ফেসবুকের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের এমন উদ্দেশ্যকে সমর্থন করতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগের কথা বলে যে আন্তঃযোগাযোগের সৃষ্টি হলো তাতে এখন ফেসবুক বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা ব্যবসা চালু করেছে যা একচেটিয়া বাজার দখলের ‘বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদ’ বলে মনে করা হচ্ছে। মানুষকে একটি পারস্পরিক যোগাযোগের আওতায় এসে শেষমেশ পুঁজির দাপটের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে, আর তার ফলে ফেসবুক বিশ্ব বাণিজ্যের নিয়ামক হয়ে এখন তার মালিক পৃথিবীর সবচেয়ে ধনীদের একজন হয়েছেন। অপরদিকে সব সদস্যের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে নানা অপকর্মের সঙ্গেও সে যুক্ত হয়েছে ও হচ্ছে। ফলে নৈতিকতার বিচারে ফেসবুক নিজে থেকে কোন সত্য-মিথ্যার লড়াইয়ে পাকাপোক্ত অবস্থান নিতে পারে না। আর এসবের মাশুল দিতে হচ্ছে সরলপ্রাণ নেটওয়ার্ক সদস্যদের, যারা আইনের বিচারে ভিক্টিম হচ্ছেন।

ডিজিটাল বাংলাদেশে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার-আপনার কতখানি অংশগ্রহণ থাকবে তাই নিয়ে। দিনরাত অবিরত এসব অজ্ঞান চর্চাকে ক্ষান্তি দিয়ে কেমন করে তাকে জ্ঞানের কাজে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার। এরা সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার করে অন্তত একদিনের জন্য হলেও দুনিয়ার ইতিহাসটাই পাল্টে দিতে পারে, যদিও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। কিন্তু আমাদের মানস সংস্কৃতির অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যাবার আগে বুঝতে হবে এসব যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে কালের বিচারে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আমাদের ভূমিকা কতখানি কার্যকর ছিল।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প

rezasalimag@gmail.com

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া