২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চিরায়ত চুরুলিয়া

  • বিচারপতি ওবায়দুল হাসান

শুভ্র তুষারে আচ্ছাদিত কাশ্মীরের গুলমার্গ, পেহেলগাম, শ্রীনগর ঘুরে বেড়ানো আর ডাল লেকের হাউসবোটে রাত যাপন। এ যেন এক অনন্য অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি যা মলিন হওয়ার নয়। জম্মুতেও দু’দিন কাটল। এরপর ২২ মার্চ আকাশপথে কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা। রাত ৮টায় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামি। কলকাতা হাইকোর্টের অতিথি ভবন ‘বিজনভবন’ কোয়রটেকার গৌতম চক্রবর্তী। বিমানবন্দরে নেমেই তার কাছে খোঁজ নেই চুরুলিয়া যাওয়ার জন্য গাড়ি ঠিক রয়েছে কি-না। গৌতম ফোনে জানায়, গাড়ির ব্যবস্থা করা আছে। জেনে স্বস্তি বোধ করি। এরপর বিমানবন্দর থেকে এক বাঙালী নিরাপত্তা কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে নির্ধারিত গাড়িতে উঠি। জানতে চাইলে সে বলে কলকাতার সল্টলেক থেকে চুরুলিয়ার দূরত্ব গাড়িযোগে গেলে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার পথ। ভাবলাম তাহলে আসানসোলে রাত যাপনের প্রয়োজন নেই। দিনে গিয়ে দিনেই চুরুলিয়া থেকে সল্টলেকে ফিরে আসব।

এর আগেও অনেকবার গিয়েছি কলকাতায়। কিন্তু চুরুলিয়া যাওয়া হয়নি। খুব ইচ্ছে ছিল প্রিয় জাতীয় কবি নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত জন্মভিটায় কিছুটা সময় হলেও দাঁড়িয়ে, হেঁটে, চারপাশে তাকিয়ে হারিয়ে যাব কবির দ্রোহ ও মানব প্রেমের নানান ভাবনায়। কবির জীবনের গোধূলীটা ছিল নির্বাক। এ সময়টি তাঁর কেটেছে আমাদের বাংলাদেশে। আসলে কবির জীবন যেন অন্তহীন। যেন সদা উন্নত শিরে কারার লৌহকপাট ভেঙ্গে দ্রোহী কণ্ঠে কবি এখনও সবাক ও গীতিপ্রিয় অসাম্প্রদায়িক একজন মানুষ। বিদ্রোহী কবিতার দৃশ্যমান তর্জন যেন বঞ্চিতের দ্বিরুক্ত দ্রোহ। এসব ভাবনায় রোমাঞ্চিত হয়ে পরিকল্পনা করি পরদিন খুব সকালে কলকাতার সল্টলেক থেকে কবির স্মৃতি বিজড়িত জন্মভিটা চুরুলিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করব। সেটিই হলো।

পরদিন সকাল ৯টায় যথারীতি হোটেলের সামনে গাড়ি প্রস্তুত। সাত আসনের একটি ইনোভা গাড়ি।’ আমার স্ত্রীসহ ভ্রমণসাথী হিসেবে আরও ক’জন স্বজনের যাওয়ার কথা থাকলেও তারা যেতে পারেননি। তাদের কলকাতায় রেখে আমার পুত্র আহমেদ শাফকাত হাসান ও ওর মামা অধ্যাপক আব্দুল মতিনকে সফরসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে নিয়ে চুরুলিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। সঙ্গে আরও ছিল দিপঙ্কর নামে অন্য একজন বাঙালী নিরাপত্তাকর্মী। আসানসোল হয়ে চুরুলিয়া যেতে হবে। দিপঙ্কর বলে, আসানসোল পৌঁছাতেই তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগবে। ঠিক তাই। দুপুর প্রায় ১টা নাগাদ আসানসোল পৌঁছি। পূর্ব ঘোষিত নির্বাচনী তফসিলের কারণে স্থানীয় জেলা প্রশাসন আসানসোলে আমাদের স্বল্পকালীন অবস্থানের জন্য সার্কিট হাউস বরাদ্দ দিতে পারেনি। তবে এর পরিবর্তে Steel Authority of India Limited (SAlL) এর পুরনো কিন্তু অভিজাত একটি গেস্ট হাউসের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। সেখানেই পৌঁছি বেলা ১.৩০ মিঃ এ। খুব সুন্দর গেস্ট হাউসটি। সেখানে সামান্য বিশ্রাম ও সবাই মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নেই।

দুপুরের খাবার সেরে খাবারের বিল ও গেস্ট হাউসের ভাড়া মিটাতে গিয়ে একটু বিস্মিত হয়েছি। গেস্ট হাউসের কেয়ারটেকার প্রণাম জানিয়ে বলল ‘স্যার আপনি আমাদের সম্মানিত অতিথি। SAIL এর প্রধান কর্তাব্যক্তি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন আপনার নিকট থেকে কক্ষ ভাড়া ও খাবার বাবদ যেন কোন বিল না নেই। তাই আমরা কোন বিল নিতে পারব না।’ যা হোক, SAIL এর আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ হলাম। কর্মচারীদের কিছু বখশিশ দিয়ে চুরুলিয়ার দিকে রওয়ানা হলাম ২.১৫ মিনিটে। ২০/২২ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে আমরা ১০ মিনিট কম তিনটায় চুরুলিয়ায় পৌঁছি। পূর্ব থেকেই জানা ছিল বিধায় কবি তীর্থে পৌঁছার পর চুরুলিয়া নজরুল একাডেমির পক্ষ থেকে আমাকে এবং আমার দুই সফরসঙ্গীকে মালা ও ফুল দিয়ে স্বাগত জানান একাডেমির কর্ণধার ৮০ বছরের বৃদ্ধ জনাব কাজী রেজাউল করিম। তিনি কবির ভাতুষ্পুত্র। তিনিও একজন কবি। তার সঙ্গে ছিলেন তার মেয়ে সোনালী কাজী ও আরও বেশ কয়েকজন। অত্যন্ত অনাড়ম্বরপূর্ণ ছোট্ট একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উত্তরীয় পরিয়ে, একটি ক্রেস্ট প্রদানের মধ্য দিয়ে তারা আমাকে বরণ করেন। ও অনুষ্ঠানটি ছিল ছোট ও সাদামাটা। কিন্তু আন্তরিকতায় ছিল ভরপুর। সোনালী কাজী কবি নজরুলের কারার ঐ লৌহ কপাটসহ আরও দু/একটি গান শুনিয়েছিলেন। এরপর কবির জন্মভিটার বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখালেন কাজী রেজাউল করিম।

যে ঘরটিতে বর্তমানে নজরুল একাডেমী কাজ করে এটিই ছিল কবির জন্মভিটা। বর্তমানে এটা ১তলা বিশিষ্ট একটি ছোট্ট দালান ঘর। কবির জন্মের সময় এটি ছিল ছনের ছাউনির একটি মাটির ঘর। কবি পরিবারের অন্যদের ঘরগুলোর মধ্যে এখনও কিছু কিছু মাটির ঘর রয়েছে। আসানসোল-চুরুলিয়া অঞ্চল হলো রাঢ় অঞ্চল। খুবই শুষ্ক ও রুক্ষ আবহাওয়া। সম্ভবত প্রচন্ড গরম থেকে একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্যই এ অঞ্চলে অনেকে মাটির ঘরে বসবাস করেন। তবে এলাকাটি যে খুব সমৃদ্ধ বা সম্পদশালী তা মনে হলো না।

কবির ঘর থেকে বেরিয়ে হাতের ডান দিকে যেতে যেতে প্রথমে একটি বড় একতলা দালান বাড়ি, বামে সেই মক্তব যেখানে কবি নিজে পড়েছেন এবং পরে শিক্ষকতাও করেছেন। বর্তমানে এটি স্কুলে উন্নীত হয়েছে। একটু এগিয়ে গেলেই বিরাট মাঠ। মাঠটি কোন সময় বোধহয় রাজা নরোত্তমের গড় এর অংশ ছিল, বর্তমানে এটি সরকারী সম্পত্তি। এখানেই বছরে একবার নজরুল মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মাঠটির এক প্রান্তে কাজী পরিবারের সমাধি। এখানেই সমাধিস্থ হয়েছেন কবি পত্নী প্রমীলা। তার সমাধির পাশে আরেকটি সমাধি। এখানে কাউকে কবরস্থ করা হয়নি। কবির মৃত্যুর পর যখন মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সমাধিস্থ করা হয়, তখন কবি পরিবারের কেউই সম্ভবত ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন না। সমাধিস্থ করার পর কবিপুত্র কাজী অনিরুদ্ধ ঢাকায় এসে বাবার কবরের একটু মাটি নিয়ে গিয়েছিলেন কলকাতায়, পরবর্তী সময়ে সেই মাটিই রাখা আছে চুরুলিয়ায় প্রমীলার সমাধির পাশের সমাধিতে।

কবি পরিবারের সমাধিটি দেখে ফিরে আসি সেই একতলা ভবনটিতে যার কথা ইতোমধ্যে বলেছি। এটি হলো একটি সংগ্রহশালা। কবি ও কবির স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যদের ব্যবহৃত কাপড় চোপড়, বাদ্যযন্ত্র, থালা বাসন প্রভৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে এই সংগ্রহশালায়। কবির খুবই প্রিয় মানুষ ছিলেন কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মোজাফফর আহমদ (সন্দ্বীপ)। তাঁর নামেই এই ভবনটির নামকরণ করা হয়েছে ‘মোজাফফর আহমদ ভবন’। চুরুলিয়া যাওয়ার পূর্বে আমি কলকাতার নেত্রকোনা সম্মিলনির সাধারণ সম্পাদক মানিক সরকারের সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমাকে বলেছিলেন চুরুলিয়ায় কবির জন্মভিটেটি বলতে গেলে অবহেলিত অবস্থায় আছে। কবির ভাতুষ্পুত্র কাজী রেজাউল করিম ও তার কিছু আত্মীয়-পরিজন এগুলো দেখাশোনা করেন। কিছুদিন পূর্বে নেত্রকোনার সমাজকর্মী মোঃ ইকবাল হাসান তপু ও আরও কয়েকজন চুরুলিয়ায় গিয়েছিলেন। তপুও আমাকে চুরুলিয়ায় কবির জন্ম ভিটে সম্পর্কে একই ধারণা দিয়েছিল। বাস্তবে পেলামও তাই।

কবির জন্ম ভিটে দেখা শেষ হলে আমরা কলকাতায় ফেরার উদ্যোগ নেই। এ সময় রেজাউল করিম আমার হাতে একটি খাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি অনুগ্রহ করে এটি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে পৌঁছে দিবেন। তিনি জানতেন আমার ছোট ভাই সাজ্জাদুল হাসান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের সচিব। চিঠিটির খামের মুখ বন্ধ ছিল। আমি জানতে চেয়ে বলেছিলাম চিঠির বিষয়বস্তু কি এবং তা আমাকে একটু বললে ভাল হয়, কেননা আমার ছোট ভাইকে এটি দেয়ার সময় যাতে আমি বলতে পারি চিঠির বিষয়বস্তু। তিনি বললেন, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার নামে বাংলাদেশে অনেক কিছুই হয়েছে এবং হচ্ছে। ভারতের পশ্চিম বাংলায়ও বেশ কিছু স্থাপনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু তার জন্মভিটের দিকে কারও খুব একটা নজর পড়ছে না। যদি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টিতে একটু নজর দেন, তাহলে দুই দেশের সরকার পর্যায়ে কথাবার্তা বলে শান্তি নিকেতনের বাংলাদেশ ভবনের আদলে কিছু একটা চুরুলিয়াতেও করা যেতে পারে। এ জায়গাটিকে মানুষের কাছে আরও আর্কষণীয় করে তুলতে পারলে মানুষ কবির জন্মভিটায় আসতে আগ্রহী হবে। তার কথার গুরুত্ব অনুধাবন করে আমি চিঠিটি ঢাকায় বয়ে এনে, সেটা আমার ভাইয়ের নিকট পৌঁছে দেই।

বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে রেজাউল করিম কি লিখেছেন তার বিস্তারিত জানার কোন সুযোগ আমার নেই। তবে আমি চুরুলিয়ায় কবির জন্মভিটের যে অবস্থা দেখেছি তাতে আমারও মনে হয়েছে এর আরও সংস্কার প্রয়োজন। এ সংস্কার ভারত সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার করবেন কিনা এটা একান্তই ভারত রাষ্ট্রের নিজস্ব ব্যাপার। আমার বা আমাদের কারোরই কিছু বলার নেই। তবে বাংলাদেশের মাননীয় প্রাধানমন্ত্রীকে আমি শুধু বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করব- তিনি বিষয়টি নিয়ে যেন একটু ভাবেন। কবি নজরুল আমাদের জাতীয় কবি, যাকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু নিজ উদ্যোগে এ দেশে নিয়ে এসেছিলেন। এমন একজন মানুষের জন্মভিটে কেন উপেক্ষিত থাকবে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলব- যদি দু’দেশের সরকারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কবির জন্মভিটেটি ভালভাবে সংরক্ষণ ও সংস্কারের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে উভয় বাংলার বাঙালীরা অবশ্যই একে সাধুবাদ জানাবেন। আমাদের বর্তমান সরকার বাঙালীর শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে লালন করার বিভিন্ন প্রয়াস নিচ্ছেন। তারই অংশ হিসেবে যদি কবির জন্মভিটে সংরক্ষণ এর প্রচেষ্টা নেন তাহলে, সেটি হবে আমাদের জাতীয় কবির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন। কাজী রেজাউল করিম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিটি আমাদের হাতে দেয়ার সময় আরও বলেছিলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আমাদের অনুরোধ রক্ষা করবেন। যে কবি জন্মেছিলেন অবিভক্ত বাংলার বর্ধমানের চুরুলিয়ায় তার জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে ঢাকায়। বঙ্গবন্ধু যদি কবিকে বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ না নিতেন তাহলে কবির এদেশে আসার প্রশ্নই ছিল না। বঙ্গবন্ধু তার বিশাল নেতৃত্ব দিয়ে বাংলা ভাষীদের জন্য একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়ে গেছেন। কবি নজরুল উভয় বাংলার একজন অন্যতম প্রধান কবি, তাই বঙ্গবন্ধু জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে কথা বলে তার নির্মিত সোনার বাংলায় কবিকে নিয়ে এসেছিলেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তার থাকার ব্যবস্থাও করেছিলেন। আর এ ব্যবস্থা বঙ্গবন্ধু করেছিলেন বলেই আমাদের জাতীয় কবি আজ বাংলাদেশের মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন।

দৈহিকভাবে না হলেও ১৯৪২ সালের জুলাই মাসেই কবির মানসিক মৃত্যু ঘটেছে হঠাৎ। তিনি তার জীবনে ঘটে যাওয়া এরূপ একটি ঘটনার জন্য তৈরি ছিলেন কিনা জানি না, তবে তাঁর লেখা থেকে আন্দাজ করা যায় তিনি হয়ত কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছিলেন, তাই তো তিনি বলেছিলেন,

‘তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না,

কোলাহল করি সারাদিনমান কারো ধ্যান, ভাঙ্গিব না

নিশ্চল নিশ্চুপ, আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিধূর ধূপ,

সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সরব গর্জনের প্রতিফলন দেখি তার কাব্যে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনেও তা পাই। তিনিই বাংলাদেশ স্বাধীনের পর কবিকে নিয়ে আসেন বাংলাদেশে। দেয়া হয় নাগরিকত্ব। জীবনের শেষ ক’টা বছর এখানে কাটলেও বরাবরের মতো এখনও দুই বাংলাতেই মর্যাদার সঙ্গেই পালিত হয় তার জন্ম ও প্রয়াণ দিবস। দুই বাংলাতেই তার সাহিত্য কীর্তি ও জীবন দর্শন সমভাবে অনুশীলিত। ধর্মীয় ও লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধেও তার অনেক লেখার পরতে পরতে দ্রোহের অকপট স্ফুরণ। এ জন্যই তিনি বিদ্রোহী কবি। তার রচিত ‘চল চল চল উর্ধ গগনে বাজে মাদল...’ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃত।

আমাদের প্রিয় কবি, জাতীয় কবি নজরুলের ক’টি গানে হৃদয় নিঃসৃত এক আকুতি...

‘মসজিদের পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই

যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই।’

এই আকুতিকে সম্মান জানিয়ে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়।

চুরুলিয়া থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ চত্বর, এ পথ পারি দিতে গিয়ে কবিকে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরুতে হয়েছে। যারা কবি নজরুলের জীবনী পড়েছেন তারা প্রত্যেকেই জানেন মক্তবে চাকরি থেকে শুরু করে, চা রুটির দোকানের কর্মচারী, লেটোর দলের সঙ্গে কাজ করা থেকে শুরু করে সাংবাদিকতা, রাজনীতি, সৈনিক জীবন যাপন সবই করেছেন কবি নজরুল তার জীবন ধারণের প্রয়োজনে। কিন্তু জীবনে তার কোন আপোসকামিতা ছিল না। দারিদ্র্য যার মাথা নোয়াতে পারেনি সেই অসাম্প্রদায়িক কবির সমাধিকে যেভাবে আমরা এখানে (ঢাকায়) সুন্দর ব্যবস্থাপনার মধ্যে রেখেছি, যার নামে এদেশে বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক কিছু হয়েছে, তার জন্ম ভিটেটাও আরও সুন্দরভাবে সংরক্ষিত হওয়া উচিত বলে একজন কবিভক্ত হিসেবে আমি মনে করি। তাহলে কবির আত্মা শান্তি পাবে। কেন জানি না কবি তার জীবদ্দশাতেই আক্ষেপের সুরে লিখে গেছেন-

‘আমি যেদিন রইবো না গো লইবো চির বিদায়

চিরতরে স্মৃতি আমার জানি মুছে যাবে হায়।’

কবির উদ্দেশে আমরা শুধু এটুকু বলতে চাই, আপনার স্মৃতি মুছে যায়নি, যেতে পারে না। বাংলাদেশ ও বাঙালীরা তা ধারণ করে রেখেছে পরম মমতায়।

লেখক : বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ