২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভুট্টা উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান বাংলাদেশের

  • এস এম মুকুল

মাছ বা অন্য প্রাণীজ খাদ্যের পাশাপাশি ভুট্টা খাবারের টেবিলেও জায়গা করে নিচ্ছে। বহুবিধ ব্যবহার বাড়ছে দানাদার এ শস্যের। সম্প্রতি বছরগুলোতে দেশে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদনও বেড়েছে। ভুট্টার কোন অংশই ফেলে দিতে হয় না। উপরের পাতা গো-খাদ্য, ডালপালা জ্বালানি, মাড়াই করে ভুসি পোলট্রি খাবার ও আটা-ময়দা তৈরি হয়। ভুট্টা থেকে শিশু খাদ্য, গ্লুুকোজ, বার্লি, এ্যারারুট ও তেল হয়। ভুট্টার আটা-ময়দায় বিস্কুট ও পাউরুটি হয় সুস্বাদু। কাঁচাভুট্টা পুড়িয়ে খাওয়া যায়। তৈরি হয় খৈ। ভুট্টার পপকর্ণ শহরাঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়। মানুষের জন্য নানা রকমের খাবার তৈরি করা যায় ভুট্টা থেকে। রুটি, আটা বা গোলআলুর সঙ্গে মিশিয়ে রুটি, পুরি, ভুট্টার প্যানকেক, ভুট্টার বিস্কুট, ভুট্টা খিচুড়ি, ভুট্টা-চাল খিচুরি, ভুট্টা পোলাও, সবুজ ভুট্টার দানা, সিদ্ধ বা পুড়িয়ে অনেকভাবেই ভুট্টাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়। বাংলাদেশে মূলত হাঁস-মুরগির ও গোখাদ্য হিসেবে ভুট্টার দানা ব্যবহার করা হয়। মৎস্য খাদ্যেরও একটি অন্যতম উপকরণ হলো ভুট্টা দানার গুঁড়া। চিকিৎসকদের মতে, ধান ও গমের তুলনায় ভুট্টার পুষ্টিমান বেশি। ভুট্টা শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করতে সাহায্য করে। এতে থাকা এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। ভুট্টায় বিদ্যমান ভিটামিন-এ এবং সি ত্বক ভাল রাখতে সাহায্য করে। ভুট্টা শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়, এতে হৃদরোগের ঝুঁকিও কমে। এটি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। ভুট্টাতে থাকা বিটা ক্যারোটিন চোখের দৃষ্টি বাড়াতে সাহায্য করে। সূত্র জানায়, ভুট্টার বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ১০-১২ ভাগ। ভুট্টার তেল ভোজ্যতেল হিসাবে উত্তম। শিশু, গর্ভবতী মহিলা ও দুগ্ধপানকারী মায়ের জন্য ভুট্টার তেল উত্তম। তাছাড়া ভুট্টাতে ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম এবং সালফার এসব গৌণ খনিজ উপাদান বেশ ভালই রয়েছে।

.

চাষে শীর্ষ চুয়াডাঙ্গা জেলা

আবহাওয়া অনুকূলে থাকালে চুয়াডাঙ্গায় ভুট্টা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। বহুমুখী ব্যবহার ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অধিক লাভজনক হওয়ায় ভুট্টা এখন এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় ভুট্টার আবাদ বাড়ছে। চাষীরা অর্থকরী এ ফসল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবার রেকর্ড চাষাবাদ হয়েছে। তথ্যানুযায়ী দেশের সবগুলোর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুট্টা আবাদ হয় এ জেলায়। দেশে প্রতিনিয়ত ভুট্টার চাষ বাড়ছে। গত কয়েক বছরে ধানের দাম কম থাকায় ভুট্টা চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকের। কম খরচে লাভ বেশি হওয়ায় হাসি ফুটছে কৃষকের মুখেও। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ভুট্টার উৎপাদন ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে ভুট্টার উৎপাদন ছিল ১৫ দশমিক ৫২ লাখ টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই উৎপাদন বেড়েছে ২৭ দশমিক ৫৯ লাখ টন। এই পাঁচ বছরে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ১২ দশমিক ০৭ লাখ টন।

.

বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে ভুট্টায়

জমির উর্বরা শক্তি, অনুকূল আবহাওয়ায় বাংলাদেশে ভুট্টার আবাদ ও উৎপাদন বাড়ছে। ভুট্টা উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। ভুট্টা উৎপাদনের দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই বিশ্বের মধ্যে ২য় অবস্থানটি বাংলাদেশের। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বে হেক্টরপ্রতি ভুট্টায় গড় উৎপাদন ৫ দশমিক ১২ টন। বাংলাদেশে এই হার ৬ দশমিক ৯৮ টন। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় প্রধান দানা ফসল ভুট্টা মেইজ, কর্ণ ও পপকন নামে পরিচিত। দেশে সবজি বিপ্লবের সঙ্গে যোগ হয়েছে ভুট্টা বিপ্লব। বাংলাদেশের তৃতীয় প্রধান দানাশস্য হিসেবে ভুট্টা গুরুত্বপূর্ণ ফসল হিসেবে অবদান রাখছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত চার বছরে ভুট্টা উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি অসামান্য। ভুট্টার উৎপাদন ৪০ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতি হেক্টরে ১০ দশমিক ৩৪ টন উৎপাদন করে শীর্ষে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরের অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পরে রয়েছে আর্জেন্টিনা, চীন ও ব্রাজিল। ভুট্টা চাষ সম্পর্কে কৃষি বিজ্ঞানী ডক্টর আখতারুজ্জামান জানান, ভুট্টা চাষের বড় সুবিধা হলো রোগবালাই ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ কম ঘটে। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় ভুট্টা চাষে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসছে কৃষকদের। আবাদ ও উৎপাদনে নেই কোন ঝুঁকি। ফলনে গমের চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেশি।

.

রফতানির লক্ষ্যে ‘ভুট্টা হাব’

দেশের কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখায় অবদান রাখছে ভুট্টা। কৃষি খাতের জিডিপি গণনায় বিবেচিত ১২৮টি ফসলের মধ্যে আগে প্রধান শস্য হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হতো গম, পাট, আলু, আউশ, আমন ও বোরো ধানকে। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভুট্টা। বিভিন্ন পরিসংখ্যান তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত এক দশকে দেশে ভুট্টার আবাদি এলাকা, উৎপাদন ও হেক্টরপ্রতি ফলন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

.

ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজন প্রচারণা

ধানের আবাদের চেয়ে ভুট্টার আবাদ অনেক লাভজনক হওয়ায় তার দেখাদেখি অনেকেই এ ফসল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হলেও ৩৫ থেকে ৪০ মণ পর্যন্ত ভুট্টা উৎপাদন সম্ভব। ভুট্টার শুকনো গাছ ও ভুট্টা মাড়াইয়ের পর তা জ্বালানি হিসেবে বাজারে বিক্রি করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। তবে খাদ্য হিসেবে ভুট্টার উপযোগিতা সম্পর্কে প্রচারণা না থাকায় মানুষের অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য তালিকায় এখনও জায়গা করে নিতে পারেনি। ভুট্টা পুড়িয়ে খই ছাড়া এর ব্যবহার তেমন নেই। যদিও দেশে উৎপাদিত অধিকাংশ ভুট্টা পোলট্রি ও গোখাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ বিষয়ে কৃষিবিদ উর্মি আহসান বলেন, ‘ভুট্টা থেকে তৈরি হতে পারে রুটি, খিচুড়ি, ফিরনিসহ নানা পুষ্টিকর খাবার। মজাদার চাইনিজ খাবার তৈরিতে অপরিহার্য যে কর্নফ্লাওয়ার ব্যবহৃত হয় তা ভুট্টারই অবদান। কচি অবস্থায় ভুট্টা সুপেও ব্যবহার করা যায়। তবে এর জনপ্রিয়তায় ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন আছে’। আমরাও মনে করি এখন এটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণসহ বিদেশে রফতানির ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।