২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দক্ষিণাঞ্চলের নৌরুটে নেই বয়া-বিকনবাতি ও মার্কার

  • সরু চ্যানেলে ডুবোচরের ঝুঁকিতে লাখো ঘরে ফেরা মানুষ

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ পবিত্র ঈদ-উল ফিতর উপলক্ষে নাড়ির টানে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে নৌপথে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে যাবেন কয়েক লাখ মানুষ। আবার ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফিরে যাবেন তারা। স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ মোকাবেলায় এ সময় ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে ২৩টিসহ অন্য পাঁচ জেলা বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা ও ঝালকাঠি থেকে বিরতিহীনভাবে যাত্রী পরিবহন করবে আরও প্রায় ৩০টি লঞ্চ।

তবে ডুবোচরসহ নানা সঙ্কটের কারণে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের নৌরুটগুলোকে বিপজ্জনক মনে করছেন নৌযান চালক ও মালিকরা। জরুরী ভিত্তিতে এসব সঙ্কট সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনায় ভোগান্তিতে পড়তে পারেন ঈদ-উল ফিতরে ঘরমুখো ও ফিরতি যাত্রীরা।

ঢাকা-বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের নৌরুটগুলোয় যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা করতে বর্তমানে যেসব সঙ্কট বিরাজ করছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বয়া ও বিকনবাতি এবং মার্কার না থাকা। নৌযান চালকদের মতে, বয়া-বিকনবাতি ও মার্কার ছাড়া রাতে লঞ্চ চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়াও পল্টুন সঙ্কট, সরু চ্যানেল এবং অধিকাংশ রুটে রয়েছে অসংখ্য ডুবোচর। ঈদের প্রাক্কালে স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি যাত্রীর চাপ থাকে। ফলে বোঝাই লঞ্চ নিরাপদে চালিয়ে নিতে এখন জরুরী প্রয়োজন দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথগুলো ঝুঁকিমুক্ত করা।

ঢাকা-বরিশাল রুটের সুরভী-৮ লঞ্চের প্রধান মাস্টার আবুল কালাম আজাদ জানান, ঢাকা থেকে আসতে ও বরিশাল থেকে যেতে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ভাষানচরের আগে, বামনীরচরের বামে, লতা নদী ও মেঘনার লালখাড়াবাদের ডানে নেই কোন বয়াবাতি। এসব পয়েন্ট অতিক্রম করতে হয় চরম ঝুঁকি নিয়ে। দীর্ঘ এ নৌপথে বিকনবাতিও অপর্যাপ্ত। মার্কার নেই অধিকাংশ স্থানে। বামনীরচর সংলগ্ন মেঘনার সরু চ্যানেলের দুপাশে মার্কার না থাকায় অনুমাননির্ভর হয়ে লঞ্চ চালাতে হয়। এতে যে কোন সময় বিপদ হতে পারে। তিনি বলেন, ঈদের বিশেষ সার্ভিসের সময় বরিশাল ঘাটে এসে যাত্রী নামাতে ভোগান্তি হয় পল্টুন সংকটের কারণে। মাত্র তিনটি পল্টুনে ঈদের বিশেষ সার্ভিস দেয়া ২৩ লঞ্চে যাত্রী নামানো দুঃসাধ্য হয়ে পরে। যাত্রীরা তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। ঈদের আগে বরিশাল বন্দরে আরও তিনটি পল্টুন বাড়ানো জরুরী হয়ে পড়েছে।

এ্যাডভেঞ্চার-১ লঞ্চের মাস্টার জামাল হোসেন বলেন, বরিশালের হিজলা সংলগ্ন মেঘনার মোহনায় স্পেরিক্যাল বয়া পয়েন্টে ডুবোচর আছে। একই উপজেলার ধুলখোলা টার্মিনাল সংলগ্ন মেঘনায়ও গভীরতা কম। মেঘনার এই দুই পয়েন্টে ১০-১৫ কিলোমিটার নদী বিপজ্জনক। তাই প্রয়োজন পর্যাপ্ত মার্কার স্থাপন করা। ঢাকা-বরিশাল নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোয় কোন বিকনবাতি নেই। তিনি জানান, বরিশাল ঘাটে পল্টুন সংকটে ঈদে ঘরে ফেরা যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

ভোলা-ঢাকা নৌপথে চলাচলকারী কর্ণফুলী-৯ লঞ্চের মাস্টার বাবুল হাওলাদার বলেন, ভোলা লঞ্চঘাটের মুখে ভেদুরিয়া চ্যানেলটি অত্যন্ত সরু। পানি কম থাকে। এ চ্যানেলটি এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে কোস্টগার্ড লঞ্চঘাটের কাছে জেটি স্থাপন করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে। পটুয়াখালী ঢাকা রুটের কুয়াকাটা-১ লঞ্চের মাস্টার কাঞ্চন আলী জানান, পটুয়াখালী থেকে ঢাকা পর্যন্ত নৌপথের অধিকাংশ স্থানে বয়াবাতি নেই। কোথাও বিকনবাতি চোখে পড়ে না। এছাড়া পটুয়াখালী ঘাট ছাড়ার পর লোহালিয়া নদীর লাউকাঠি, মুরাদিয়া, বগা এবং কারখানা নদীর কবাই ও লহ্মীপাশা পয়েন্টে অসংখ্য ডুবোচর রয়েছে। এসব ডুবোচর বিপদের কারণ হতে পারে। পিরোজপুর-ঢাকা রুটের পূবালী-১ লঞ্চের মাস্টার জহিরুল ইসলাম বলেন, বরগুনার বিষখালী নদীর কালিকাবাড়ী, বামনা ও কাঁঠালিয়া পয়েন্টে ডুবোচর রয়েছে। এসব ডুবোচরে মার্কার নেই। আবার মেঘনার মিয়ারচর চ্যানেলে ভাটার সময় পানি কমে যায়। ওই চ্যানেল তখন অতিক্রম করতে হয় অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে। ঈদের আগে নৌপথের এসব সঙ্কট দূর করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। পিরোজপুর-ঢাকা রুটের অগ্রদূত লঞ্চের মাস্টার জানান, কচা নদীর টগরা ও চরখালী পয়েন্টে ডুবোচরের কারণে ভাটার সময় ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। টগরা ও চরখালী পয়েন্ট ঈদের সময় লঞ্চ চলাচল ব্যাহত হতে পারে।

বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও সুন্দরবন নেভিগেশনের মালিক সাইদুর রহমান রিন্টু জনকণ্ঠকে বলেন, ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ সামলাতে লঞ্চের বিশেষ সার্ভিস দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হলেও নৌপথের নানাবিধ সঙ্কট মালিক ও চালকদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, যাত্রী চাপের কারণে লঞ্চগুলো ঢাকা থেকে দ্রুতগতিতে গন্তব্যে আসা-যাওয়া করে। এখন ঝড়-ঝঞ্ঝার মৌসুম। তাই নৌপথ নিরাপদ করা প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ সার্ভিস শুরুর আগেই পর্যাপ্ত বয়া, বিকনবাতি ও মার্কার স্থাপন করার জন্য ইতোমধ্যে লিখিত আবেদনে জানানো হয়েছে। ডুবোচরগুলোয় মার্কার না দেয়া হলে লঞ্চ আটকে পরে যাত্রী দুর্ভোগের আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া বরিশাল নৌবন্দরে পল্টুন সঙ্কটও ব্যাপক। তিনি বলেন, বরিশাল নৌবন্দর দেশের দ্বিতীয় হলেও এখানে বহুবার আবেদন-নিবেদন করার পরও পল্টুনের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি। ঈদের আগে ঢাকা থেকে ঘরমুখী ও ঈদের পরে বরিশাল থেকে কর্মস্থলমুখী জন¯্রােতকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ডবল ট্রিপে যাত্রী পরিবহন করা হবে। প্রায় একই সময়ে ২৩ থেকে ২৪টি নৌযান বরিশাল ঘাটে ভিড়ে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে আবার মূল গন্তব্যে চলে যাবে। কিন্তু বরিশাল নৌবন্দরে এত নৌযান ভেড়ানোর কোন ব্যবস্থা নেই। তাই লঞ্চের চালকরা বাধ্য হয়ে অন্য লঞ্চের পেছনে লঞ্চ ভিড়িয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দিতে বাধ্য হন। নৌ-যানচালক ও যাত্রীদের হুড়াহুড়ির কারণে এ সময়ে যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওঠানামা করতে হবে।

দক্ষিণাঞ্চলের নৌরুটগুলোর সঙ্কট সম্পর্কে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বরিশাল জোনের যুগ্ম পরিচালক আজমল হুদা মিঠু সরকার জনকণ্ঠকে জানান, বরিশাল ঘাটে পল্টুন সঙ্কট রয়েছে। সাধারণ সময়ে এতে সমস্যা না হলেও ঈদের আগে ও পরে যাত্রীরা দুর্ভোগ পোহাবেন। বয়া, বিকনবাতি ও মার্কার না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লঞ্চ চালকদের কাছে এ ব্যাপারে তথ্য চাওয়া হয়েছে। বিশেষ সার্ভিস শুরুর আগেই পর্যাপ্ত বয়া, বিকনবাতি ও মার্কার দেয়া হবে। যেসব পয়েন্টে ডুবোচর আছে, সেখানে সাবধানতার সঙ্গে অতিক্রম করার জন্য লঞ্চ চালকদের প্রতি তিনি আহ্বান করেন। অন্যদিকে পল্টুন সঙ্কটের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এ সমস্যার বিষয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া