২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আইনের শাসন, নাগরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে দেশ

  • আলোচনা সভায় নাগরিক নিরাপত্তা জোট

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হলেও মানবাধিকার সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিলে উন্নয়ন দীর্ঘস্থাীয় হয় না বলে মনে করছে নাগরিক নিরাপত্তা জোট। দেশের বিভিন্ন বিশিষ্টজন মানবাধিকারকর্মী, সমাজকর্মী, পরিবেশবিদসহ বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের জড়িত কয়েকটি সংগঠন মিলে নাগরিক নিরাপত্তা জোট গঠন করা হয়েছে। জোটের নেতৃবৃন্দ বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিস্থিতি মহামারি আকার ধারণ করেছে। তাই নাগরিকের নিরাপত্তায় প্রয়োজন বৃহৎ ঐক্য। দেশে বর্তমানে সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতি বিরাজ করছে আর এ থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের কাছে ১১ দফা দাবি পেশ করেছে।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে ‘আইনের শাসন, নিরাপত্তা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার’ দাবিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জোটের ব্যানারে বিশিষ্টজনেরা এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ড. হামিদা হোসেন, নিজেরা করি সংগঠনের মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে তারিক আলী, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল, শীপা হাফিজা, শাহীন আনাম, জারিক হোসেনসহ প্রমুখ। এসময় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ বি এম শামসুল হুদা।

জোটের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, সরকার যেখানে জনগণের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রদানে সাংবিধানিকভাবে দায়বদ্ধ, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে সরকার ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা জনগণের মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে।

খুশী কবীর বলেন, আমরা মনে করি জীবনের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা এসেছে তা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। বাংলাদেশ অন্য দেশ থেকে কেন অনন্য তা ধরে রাখতে হবে। নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা অনেক উদ্বেগ প্রকাশ করছি। সেই সঙ্গে একটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই কথা বলব বলেই এটি করেছি। সেখানে সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত প্রায় অনেকেই আছেন। আমরা সাধারণ ছাত্র সংগঠন যা কি না কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নেই তারাও আমাদের সঙ্গে আসতে চাচ্ছেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তা হচ্ছে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে মুক্তচিন্তা ও বাক স্বাধীনতা ব্যাহত হচ্ছে। মানুষ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারছে না। স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও আমাদের এমন দাবি তুলতে হবে সেটা কখনও চিন্তায় ছিল না। স্বাধীনতার মধ্যে যে বিষয়গুলো ছিল তা আমাদের দাবি করতে হচ্ছে, মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তাসহ অন্য বিষয়গুলোতে আমাদের দাবি করতে হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে নানা সমস্যা হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, দুর্নীতি বেড়েছে, জবাবদিহিতা কমেছে। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। আইনের শাসন চেয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর দাবি জানান তিনি।

তারিক আলী বলেন, যারা লুটপাট করছে তাদের কোন ছাড় দেয়া যাবে না। কৃষক ও কৃষির যে সমস্যা তা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপের কথাও বলেন তিনি।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে প্রতিনিয়ত নানা অন্যায়, অবিচার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, গুম, নির্যাতন, মত প্রকাশ ও মুক্ত চিন্তার অধিকারের ওপর আঘাত, নারী ও শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের মতো জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। রাষ্ট্রে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার অভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘনকে আরও বেশি সঙ্কটাপন্ন করে তুলছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর এক পরিসংখ্যান দিয়ে বলা হয় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১১৮ জন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- চলছে।

এসব বিষয়ে সত্যতা কিছু থাকলেও সরকার আন্তরিক হলে মাদক বহনকারী, মাদক ব্যবাসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলেও জানান। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে তা যত বড় অপরাধই হোক। এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- আইনের শাসনের প্রতি আস্থাহীনতাকে প্রকট করছে। আরও বলা হয়, গত চার মাসে নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৫৪টি, শিশু ধর্ষণ ২৩৪টি, ১৪৪ শিশু হত্যার শিকার এবং ১৭১ জন শিশু নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানির বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারেরও এ বিষয়ে কোন তদারকি নেই বলে জানানো হয়। সড়ক দুর্ঘটনা একটি নিত্যনৈমিত্যিক বিষয় হয়ে গেছে। পরিবহন খাতে সরকার দলীয় লোকদের প্রভাবের কারণেই এখাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসছেনা বলে জানান লিখিত বক্তব্যে।

আল কায়েদার মুখপাত্র বালাকোট মিডিয়ার ‘লোনউলফ’ গাইড মার্চ ২০১৯ প্রকাশিত সংখ্যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনকে হত্যার হুমকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমরা মনে করি এদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার। দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত উগ্রপন্থীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং পূর্ববর্তী ঘটনার সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত জরুরী। বক্তারা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সমাজে অন্যায়, অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজমান, সর্বোপরি জনগণের মধ্যকার নিরাপত্তাহীনতা একটি ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে, যা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তারা প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণ বন্ধেও সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেন।

এ সময় সম্মিলিতভাবে নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিতে সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। যা হলো- রাষ্ট্রীয় বাহিনী দ্বারা কোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শাস্তি প্রদান। আটক বা গ্রেফতারের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে চলা। নাগরিকদের মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার ও মৌলিক মানবাধিকার খর্ব না হয় তা নিশ্চিত করা। গণমাধ্যম ও নাগরিকদের মত প্রকাশের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা। নারী শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কার্যকর সচেতনতামূলক ও প্রতিরোধ কর্মসূচী। ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি, বিচার ব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা। আদিবাসীদের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করা। জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ শক্তিশালী করা এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার বিষয়ে সহযোগিতা করা।

সংবাদ সম্মেলনে দাবি জানানোর পাশাপাশি কয়েক মাসের কর্মসূচীও দেয়া হয়। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশব্যাপী মানববন্ধন করা হবে যা পরবর্তীতে তারিখ জানানো হবে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র, আইন, নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়, আইজিপি, সকল জেলা-উপজেলা, মানবাধিকার কমিশনে স্মারকলিপি প্রদান, ওয়াজ ও জুমার নামাজের খুতবায় নারীর প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালানো, তরুণ জনগোষ্ঠীকে মানবাধিকার রক্ষায় এবং জঙ্গীবাদ দমনে সম্পৃক্ত করা হবে বলে জানানো হয়। এ সময় অন্য সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্বরা উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া