২০ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সোনাগাজীর ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেল পিবিআই

  • নুসরাত হত্যা মামলা

নিয়াজ আহমেদ লাবু ॥ মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যায় সোনাগাজী মডেল থানার ওসি (প্রত্যাহার) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলার তদন্ত শেষে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছেন পিবিআই সদর দফতরের সিনিয়র এএসপি রিমা সুলতানা। তিনি জানান, তদন্ত শেষে রবিবার সাইবার আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। সিনিয়র এএসপি রিমা সুলতানা জানান, গত ১৫ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (প্রত্যাহার) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় করা অভিযোগটি পিটিশন মামলা হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেয় আদালত। তদন্তে থানায় বক্তব্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়াসহ প্রত্যেকটি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। তদন্তে প্রমাণিত সব তথ্য-উপাত্তসহ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এর আগে গত ১৫ মে পিবিআই প্রধান উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার জানিয়েছেন, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে নুসরাতের জবানবন্দী মোবাইলে রেকর্ড করে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। শীঘ্রই এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে মে মাসের মধ্যেই মামলার চার্জশীট আদালতে জমা দেয়ার কথাও জানান তিনি। এদিকে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার সত্যতা মিলেছে আগেই। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের তদন্ত প্রতিবেদনেও ওসি মোয়াজ্জেমসহ চার পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে। এরই জের ধরে ইতোমধ্যে ওসি মোয়াজ্জেমকে সাময়িক বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই অভিযোগে ফেনী জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত এসআই মোঃ ইউসুফকে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় এবং এসআই মোঃ ইকবাল আহাম্মদকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সংযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে পুলিশ সদর দফতরের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী অভিযুক্ত সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এসপিসহ অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যকেই অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২৭ মার্চ নুসরাত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা শ্রেণীকক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন। এমন অভিযোগ উঠলে দু’জনকে থানায় নিয়ে যান ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। ওসি নিয়ম ভেঙ্গে জেরা করতে নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন। মৌখিক অভিযোগ নেয়ার সময় দুই পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেলেও সেখানে নুসরাত ছাড়া অন্য কোন নারী বা তার আইনজীবী ছিলেন না। ভিডিওটি প্রকাশ হলে অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীদের সঙ্গে ওসির সখ্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ওসির সামনে অঝোরে কাঁদছিলেন নুসরাত। সেই কান্নার ভিডিও করছিলেন সোনাগাজী থানার ওসি। নুসরাত তার মুখ দুই হাতে ঢেকে রেখেছিলেন। তাতেও ওসির আপত্তি। বারবারই ‘মুখ থেকে হাত সরাও, কান্না থামাও’ বলার পাশাপাশি তিনি এও বলেন, এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ওসি মোয়াজ্জেম অনুমতি ছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে নুসরাতকে জেরা এবং তা ভিডিও করেন। পরবর্তীতে ওই ভিডিও ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায় ওসি মোয়াজ্জেম অত্যন্ত অপমানজনক ও আপত্তিকর ভাষায় একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন নুসরাতকে। নুসরাতের বুকে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানি করা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নও করতে দেখা যায় ওসি মোয়াজ্জেমকে। অধ্যক্ষের নিপীড়নের ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। এরপর গত ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাত আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান। এ সময় মাদ্রাসার এক ছাত্রী নুসরাতকে বলে তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে। পরে নুসরাত দৌড়ে ওই বিল্ডিংয়ের চার তলায় যান। সেখানে বোরকা পড়ে চার-পাঁচজন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। নুসরাত অস্বীকৃতি জানালে তারা তার গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়।

নির্বাচিত সংবাদ