১৮ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা

মানুষের মধ্যে আদিম পশুবৃত্তি ও জিঘাংসা যে কত প্রবল এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ তা আবার পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে স্কুলছাত্রী ও গৃহবধূকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার মাধ্যমে। রাজবাড়ীতে দশম শ্রেণীর এক ছাত্রীর জোরপূর্বক আপত্তিকর ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইলের অপচেষ্টায় টাকা আদায় করতে না পেরে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে এক নারীসহ চারজনের বিরুদ্ধে। এখানে মেয়েটিকে তার বাড়িতে এসে আগুন ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টায় নিরত ছিল চার বোরকা পরিহিত ব্যক্তি। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনসহ একাধিক মামলা হয়েছে। গ্রেফতারের খবরও আছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে যৌতুকের টাকা না পেয়ে গৃহবধূর শরীরে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবরের বিরুদ্ধে। চিকিৎসকের মতে, গৃহবধূর শরীরের প্রায় ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে। গ্রেফতারের খবরও আছে। মনে রাখতে হবে যে, এ দুটি ঘটনাই ঘটেছে ঈদের অবকাশে ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও দলবল কর্তৃক পুড়িয়ে মারার ক্ষত শুকোতে না শুকোতেই। বলা হয়ে থাকে যে, মানুষের পাশবিকতা, ক্রূরতা, নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতো। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, দিল্লীতে চলন্ত বাসে ‘নির্ভয়া’ ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের পর তা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশেও। দেশব্যাপী প্রবল গণপ্রতিবাদ ও বিক্ষোভ তা দমাতে পারেনি। অনুরূপ ঘটনা যেন ঘটেছে নুসরাত পরবর্তী পুড়িয়ে মারার ঘটনা সমূহে।

সারাদেশ তোলপাড় করে দেয়া নুসরাত হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দ্রুতই জমা দেয়া হয়েছে ফেনীর আদালতে। ১৬ আসামির মৃত্যুদ- চেয়ে ঘটনাপরম্পরা বর্ণনায় যে পাশবিক কাহিনী বের হয়ে এসেছে তা সভ্যতার এক চরম বিপর্যয়। তবে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে আসামি হিসেবে নাম না থাকায় পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষোভ জানানো হয়েছে। নুসরাতের ভিডিও ধারণ এবং প্রচারের দায়ে তার বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতারের আদেশটি দৃশ্যমান হলেও তিনি এখন পর্যন্ত গা-ঢাকা দিয়ে আছেন। শুধু তাই নয়, তিনি আগাম জামিন চেয়ে আদালতে আবেদনও জমা দিয়েছেন।

এদিকে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বন্ধ হোক শিশুধর্ষণ ও যৌন হয়রানি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে উঠে এসেছে গত ৫ মাসে দেশে ২৩৩ শিশু ধর্ষণ ও ২৫ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। সম্মেলনে অভিমত ব্যক্ত করা হয়, বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার অপসংস্কৃতি ধর্ষণের মতো একটি পশুবৃত্তিকে থামাতে ব্যর্থ হচ্ছে। নিপীড়িত অসহায় ও দুর্বল গোষ্ঠী এবং ক্ষমতাবান অপরাধী চক্র এমন অসম দুই শ্রেণীর লড়াইয়ে বিত্তবানরাই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়।

গত বছর গণপরিবহনে চাঞ্চল্যকর রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারিক রায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হলেও তার কার্যক্রম থেমে আছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী সময়ক্ষেপণ থেকে আইনকে আরও শক্তিশালী এবং প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরী। হত্যা, ধর্ষণের মতো পশুবৃত্তির দায়ে মামলার বিচারের যে রায় বিজ্ঞ আদালত দিয়ে থাকে সেখানে আপীল করার সুযোগ সীমিত করা উচিত কিনা সে ব্যাপারটি নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ এমন সুযোগের অন্তরালে রায়কে ভিন্ন খাতে মোড় ঘুরিয়ে দেয়াই শুধু নয়, তার চেয়েও বেশি অহেতুক সময় অপচয় করে রায়কে দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে দেয়া হচ্ছে। নুসরাত হত্যার বিচারে এমন অপসংস্কৃতি যেন কোনভাবেই জায়গা করে নিতে না পারে প্রথম থেকেই সেখানে তীক্ষ্ন নজরদারি করা মামলার স্বার্থেই জরুরী। যে দুর্ঘটনা নিয়ে সারাদেশ শিহরিত হয়, মানবতার স্খলন হয়, মনুষ্যত্বের চরম অপমান হয় তা শুধু দ্রুত বিচার আইনে নিষ্পত্তি করাই নয়, তা দ্রুত বাস্তবায়নও করতে হবে। একইসঙ্গে রাজবাড়ীতে স্কুলছাত্রী এবং ঈশ্বরগঞ্জে গৃহবধূকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টাকারীদের যথাযোগ্য শাস্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সম্মুখীন করা বাঞ্ছনীয়।

নির্বাচিত সংবাদ