১৮ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্যারিসের হৃৎপিন্ড নটর ডেম ক্যাথিড্রাল

  • জাস্টিন গোমেজ

বিকেলে আকস্মিকভাবে বিভিন্ন রঙের আগুনের ফুলকি ও গাঢ় ধোঁয়ায় আকাশ ভরে গেলে প্রথমে অনেকে ভেবেছিল হয়ত ক্যাথলিকদের দ্বারা ‘ইস্টার সানডে’ উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু পরক্ষণেই পর্যটক এবং পথচারীদের মনে ভৌতিক এক অনুভূতির জন্ম দেয়। আর এই অনুমান প্রকৃত অর্থে সত্যে রূপান্তরিত হয়। গত ১৫ এপ্রিল ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ, রোজ সোমবার, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের স্থানীয় সময় বিকেলে ঘটে এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা। আর এই ভয়াবহ আগুনে ভস্ম প্রায় হয়ে গিয়েছে ওই দেশের ৮৫০ বছরের ঐতিহাসিক স্থাপনা নটর ডেম ক্যাথিড্রাল। মধ্যযুগে নির্মিত দর্শনীয় এই পুরনো ঐতিহাসিক ক্যাথিড্রাল যখন ভয়াবহ আগুনে পুড়ছিল, তখন বিশাল জনতার ভিড় থমকে দাঁড়ায়। চুপচাপ দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে আগুনের ভয়াবহতা দেখছিল আর আকাশে বাতাসে ভেসে আসছিল ‘হে বিধাতা’। আগুনে ক্যাথিড্রালের ছাদ ও প্রধান চূড়া যখন ধসে পড়ছিল নগরবাসী তখন শুধু শোকে মর্মাহত হচ্ছিল। এটি বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এটি প্যারিসের হৃৎপিন্ড। এতে ছাদ ও প্রধান চূড়া ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পার্শ্ববর্তী দুটি টাওয়ারসহ প্রধান কাঠামো রক্ষা পেয়েছে। এ ঘটনায় ক্যাথিড্রালের কথা স্মরণ করে ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, এই ক্যাথিড্রাল আমাদের জীবনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে এবং প্রতিজ্ঞা করে বলেন, আমরা নটর ডেম পুনর্নির্মাণ করব। তিনি আরও বলেন, ‘পুড়ে যাওয়া মানেই সব শেষ নয়। বরং ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ? নতুন ক্যাথিড্রাল হবে আরও দৃষ্টিনন্দন।’

ভিক্টর হুগোর জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাঞ্চব্যাক অব নটর ডেম’ প্রকাশিত হওয়ার পর সবাই নতুন করে আবিষ্কার করে এই গির্জাকে। নটর ডেম ক্যাথিড্রালের নির্মাণ শুরু হয় খ্রিস্টীয় একাদশ শতকে। একশ’ বছর লেগেছিল এই কাজ শেষ করতে। তারপর কয়েকবার এর সংস্কার করা হয়। আগুন লাগার পূর্বে বর্তমানে ক্যাথিড্রালের অবস্থা বেশ নাজুক হয়ে পড়েছিল। ফরাসী বিপ্লবের সময় এই ক্যাথিড্রাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল একবার। এরপর ১৮৪৫ সালে এটি সংস্কারে বড় উদ্যোগ নেয়া হয়। ২৫ বছর কাজের পর পুনরায় দৃষ্টিনন্দন অবস্থায় ফেরে ইউরোপে মধ্যযুগের শেষার্ধের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা। আর তখন থেকে এটি খ্যাত হয় ‘হার্ট অব প্যারিস’ হিসেবে। মধ্যযুগে নির্মিত দর্শনীয় এই পুরনো ঐতিহাসিক ক্যাথিড্রাল যে কারণে ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ-

রোজ উইন্ডোজ : ক্যাথিড্রালে ১৩শ’ শতাব্দীতে নির্মিত রোজ উইন্ডোজ রয়েছে তিনটি। যেটি এটির সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ।

দুটি টাওয়ার : এখানে আসা অধিকাংশ পর্যটকদের আকর্ষণ ক্যাথিড্রালের উত্তর ও দক্ষিণের দুটি টাওয়ার। ভ্রমণপিপাসুরা দক্ষিণের গোথিক টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ও সময় কাটাতে ভালবাসতেন। গারগোয়লিস : গারগোয়লিস পৌরাণিক কাহিনীর প্রাণী। পাশেই আরেকটি ক্যাথিড্রালে এটির অবয়ব রাখা আছে। প্যারিসে ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকদের কাছে নটর ডেম টাওয়ারের এই পাশের অংশটিও জনপ্রিয়।

ইম্মানুয়েল বেল বা ঘণ্টা : ক্যাথিড্রালে রয়েছে ১০টি ঘণ্টা। সবচেয়ে বড়টির নাম ইম্মানুয়েল। যেটির ভর ২৩ টনেরও বেশি। দক্ষিণ টাওয়ারে এটি স্থাপন করা হয় ১৬৮৫ সালে। ২০১৩ সালে উদ্যাপন করা হয়েছিল ঘণ্টা ইম্মানুয়েলের ৮৫০ বছর পূর্তি। লেখক ভিক্টর ইয়ুগো তার ‘হাঞ্চব্যাক অব নটর-ডেম’ উপন্যাসে এই ঘণ্টার উপজীব্য নিয়েছিলেন।

গোথিক স্পায়ার : অগ্নিকান্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গোথিক স্পায়ার। আর এই গোথিক স্পায়ারটি হয় ক্যাথিড্রালের চূড়াটি। ১২শ’ শতাব্দীতে নির্মিত ক্যাথিড্রালের এই অংশটি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। ফরাসি বিপ্লবের সময় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ১৮৬০ সালে স্পায়ারটি পুনরায় নির্মাণ করা হয়।

খ্রিস্টধর্মের পুরাকীর্তি : নটর ডেম ক্যাথিড্রালের ভেতরে রাখা খ্রিস্টধর্মের বেশকিছু প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য যিশু খ্রিস্টের সময়কালের নিদর্শনও।

এছাড়াও গির্জার ভেতরে রয়েছে শত শত বছরের পুরনো কাচ, কাঠ, সিরামিক, পাথরসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম। আছে গোলাপের জানালাখ্যাত ফুলের নকশা আঁকা বিখ্যাত কাচের কাঠামো, আট শতাব্দীর পুরনো কাঠে নির্মিত বিভিন্ন কাঠামো, ২৩ টনেরও বেশি ওজনের জোড়া ঘণ্টা, জোড়া টাওয়ার, ত্রিকোণ গম্বুজ, বিভিন্ন আকৃতির গার্গলের মূর্তি। গির্জার টাওয়ার, বেল, ত্রিকোণ গম্বুজ, ভেতরের নকশা সব মিলিয়ে এর স্থাপত্য দৃষ্টিগতভাবে নান্দনিক। তাই ইউনেস্কো এটিকে বহু আগেই বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

লেখক : নটর ডেম কলেজ, ঢাকা

justingomes80@gmail.com