১৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভারত-সোভিয়েত যৌথ ইশতেহার ॥ ১১ জুন, ১৯৭১

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ১১ জুন, দিনটি ছিল শুক্রবার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার বাংলার সর্বস্তরের মানুষের আস্থাভাজন। বাংলার আশা-আকাক্সক্ষা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে প্রতিফলিত। বাংলার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই সরকার প্রকৃত প্রস্তাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকারী। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁকে কারাগারে রেখে কোন আলোচনা চলতে পারে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ও বাঙালীর পক্ষে অভিমত দেয়ার একমাত্র অধিকারী। আলোচনা চালানোর জন্য তাঁর ও তাঁর সহকর্মীদের বিনা শর্তে মুক্তি দিতে হবে। আর পশ্চিম পাকিস্তানীরা গত ২৩ বছরে বাংলাকে শোষণ করে, বঞ্চিত করে এবং সর্বশেষ গত মার্চ মাসের ২৫ তারিখ থেকে হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যেভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অন্যথায় রণাঙ্গনের ফয়সালায় চূড়ান্ত! বাংলায় স্বাভাবিক অবস্থা বাঙালীরাই ফিরিয়ে আনবে। প্রতিটি বাঙালী আজ দৃঢ়প্রতিজ্ঞা যে, সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর নয়নমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করে, হানাদার বাহিনীকে বাংলার মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করে, বাংলার স্বাধীনতা স্বীকৃতি আদায় করবেই। এইদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চতুর্থ বেঙ্গল ‘ডি’ কোম্পানির এক প্লাাটুন যোদ্ধা কসবার উত্তরে চার্নল নামক জায়গায় পাকসেনাদের এ্যামবুশ করে। এ অভিযানে ১২ জন পাকসৈন্য নিহত হয়। পর্যুদস্ত পাকসেনারা ইয়াকুবপুরের দিকে পলায়ন করে। ইয়াকুবপুরের আরেক দল মুক্তিযোদ্ধা পলায়নরত পাকসৈন্যদের এ্যামবুশ করে। এতে পাকবাহিনীর ৮ জন সৈন্য নিহত ও ১৩ জন আহত হয়। এ দুটি এ্যামবুশের পর অনেক অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ মুক্তিবাহিনীর হস্তগত হয়। মুক্তিবাহিনীর গেরিলা দল কুমিল্লার পাকবাহিনীর বিভিন্ন অবস্থানে হামলা চালায়। এতে পাকসেনাদের যথেষ্ট ক্ষতি হয়। লাকসামে মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর একটি গাড়িতে এ্যামবুশ করে। এ অভিযানে ৫ জন পাকসৈন্য নিহত হয়। ফেনীর বিলোনিয়ায় পাকবাহিনী পুনরায় মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায় এবং মুক্তিবাহিনী এককভাবে শত্রুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে তাদের আক্রমণ প্রতিহত করে দেয়। এভাবে পাকিস্তানী বাহিনী মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপর ১১ বার নিষ্ফল আক্রমণ চালায়। তারা দিন-রাত মুক্তিবাহিনীর অবস্থানগুলোর ওপর অবিরাম গোলাবর্ষণ অব্যাহত রাখে। পরিশেষে শত্রুরা বুঝতে পারে যে এভাবে আক্রমণ করে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান ধ্বংস করা সম্ভব নয়। মস্কো সফররত ভারতীয পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং ও সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের মধ্যে বৈঠক শেষে এক যৌথ ইশতেহারে বলা হয়, অবিলম্বে পূর্ব বাংলায় এমন একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে সেখান থেকে ভারতে উদ্বাস্তু যাওয়া নিশ্চিতরূপে বন্ধ হয়। উভয়পক্ষই এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেন যে, শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং উদ্বাস্তুরা যাতে নিরাপদে তাদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে তার সমস্ত ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পূর্ব পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি খাজা খায়রুদ্দিন ও পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাত করে প্রদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপের জন্য তাকে অভিনন্দন জানান এবং আশ্বাস দেন, শান্তি কমিটি এক পাকিস্তানের আদর্শ রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আইনজীবী জুলমত আলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ জনগণের বিপুল ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। তারা উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে কিছুসংখ্যক বিচ্ছিন্নতাবাদীকে খেপিয়ে তুলছে। এসব দুষ্কৃতকারীদের অত্যাচারে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ হস্তক্ষেপ না করলে বিশ্বের মানচিত্র থেকে অখন্ড পাকিস্তানের নাম মুছে যেত। সেনাবাহিনী হিন্দু ও আওয়ামী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছে।’ পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির সহকারী সম্পাদক এমএ রব বলেন, ‘সেনাবাহিনী দেশদ্রোহীদের ধ্বংস করেছে। এখন সাংবাদিকদের উচিত ভারতীয় প্রচারণার বিরুদ্ধে কলম ধরে দেশের মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। ’১৯৭১ সালের এইদিনে আর্জেন্টিনার বুদ্ধিজীবী মহলের একটি প্রতিনিধিদল সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. লুইস মারিয়া ডি পাবলো পার্ডোর সঙ্গে সাক্ষাত করেন এবং পশ্চিমবঙ্গে যেসব শরণার্থী এসেছিল তাদের জরুরী সাহায্য-সহযোগিতা পাঠানোর অনুরোধ করে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। আর্জেন্টিনার প্রথম সারির লেখক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিত্রশিল্পী, বিচারক এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, সঙ্গে স্বনামধন্য লেখক মাদামি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এবং জর্জ লুইস বার্জেস এবং শ্রদ্ধেয় ফাদার ইসমাইল কুলিস, ইএল সালভাদর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন। স্মারকলিপির পাঠযোগ্য অংশ আর্জেন্টিনার পত্রিকায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল।

পূর্ববঙ্গের সাম্প্রতিক দুঃখজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশাল জনগোষ্ঠী নারী, পুরুষ, শিশু পালিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়েছে এবং বিশাল সমস্যা তৈরি হয়েছে। নিজেদের ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ভারত তার শান্তি, সহ অবস্থান ও পারস্পরিক সহযোগিতা কামনা করছে। শরণার্থীরা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের জন্য কঠিন সংগ্রাম করছে। ভারত, যারা নিজেরাই নিজেদের জাতিগঠনে কাজ করছে, তারা এই বিশালসংখ্যক শরণার্থী একা আশ্রয় দিতে পারছে না। আন্তর্জাতিক সমস্যা মানুষের দুঃখ দুর্দশার ঘটনা কোন সীমারেখা মানে না। পৃথিবীর যে কোন স্থানের দুঃখ, মুত্যু, দরিদ্রতা পুরো মানবজাতির জন্য উদ্বেগের। তবুও এটা দুঃখজনক যে, পূর্ববঙ্গের ঘটনায় এখনও বিশ্ববিবেক জাগ্রত হয়নি অথবা মানবিক সমস্যা, যেগুলো অন্যকোথাও সৃষ্টি এবং যার উপর কোন হাত নেই, সেগুলো সমাধানের জন্য ভারতকে সাহায্য করার ব্যাপারেও যথেষ্ট সাড়া পাওয়া যায়নি। আশা করছি যে, আমাদের সরকার নিজেদের সার্বজনীন ও পারস্পরিক সংহতির ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দ্রুততার সঙ্গে যথাসাধ্য সর্বোচ্চ সাহায্য করবে, যেন অবস্থার প্রেক্ষিতে গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতের উপর আরোপিত এই সঙ্কটের সমাধান হয়। দৈনিক কালান্তরে ‘মুক্তিযোদ্ধারা দেশের মাটি থেকে পাক হানাদারদের উৎখাত করতে বদ্ধপরিকর’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী জনাব এম মনসুর আলী বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে চার দিনব্যাপী সফরের পর আজ মুজিবনগরে প্রত্যাবর্তন করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা দেশের মাটি থেকে পাক হানাদারদের উৎখাত করতে বদ্ধপরিকর। ওই সফরের সময় তিনি মুক্তিফৗজ নিয়ন্ত্রিত কতিপয় শিবির পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, ওই শিবিরসমূহে তিনি ‘তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অদম্য মনোবল ও অনমনীয় দৃঢ়তা’ প্রত্যক্ষ করেছেন। আকাশবাণীর খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশ সরকারের জনৈক মুখপাত্র বাংলাদেশের পাক সামরিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত স্বাগত কেন্দ্রগুলোকে বন্দী শিবিরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি জানান, সম্প্রতি ভারতের পথে আসার সময় বহুসংখ্যক শরণার্থীকে পাক সামরিক কর্তৃপক্ষ জোর করে ওই স্বাগত কেন্দ্রগুলোতে ধরে নিয়ে গেছে। ঢাকা থেকে পাকসামরিক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত ইংরেজী দৈনিক মর্নিং নিউজ পত্রিকার অধিকাংশ বাঙালী কর্মচারীকে কর্মচ্যুত করা হয়েছে বলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সংবাদ প্রচার করে। পাক অধিকৃত বাংলাদেশে সামরিক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত ওই সকল পত্রিকার কোন গ্রাহক নেই। সামরিক কর্তারা পত্রিকার ২০০০ কপি কিনে নেয়, মাঝে মাঝে সেনাদের মধ্যে বিমান থেকে এগুলো ফেলে দেয়া হয়। কিন্তু সাধারণ নিরপেক্ষ কোন বেসামরিক পাঠক নেই। করাচীর ডন পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক জনাব আলী জাফরী আজ লন্ডনে বাংলাদেশে সংঘটিত পাক নৃশংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিবাদ জানিয়ে জনসাধারণের কাছে এই মর্মে আবেদন জানিয়েছেন যে, তাঁরা যেন ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী টেস্ট ম্যাচগুলো বয়কট করে। জনাব আলী জাফরী ইতিপূর্বে পাকিস্তানে ব্যক্তি স্বাধীনতা অপহরণের প্রতিবাদে পাক নাগরিকত্ব বর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশের গেরিলাবাহিনীর তৎপরতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। গেরিলাদের হাতে মার খেয়ে পাক হানাদাররা নিজেদের মধ্যে সেমসাইড করে বসেছে। চুয়াডাঙ্গার কাছে দুই দল পাক সৈন্যের পরস্পর সংঘর্ষে ১৩ জন নিহত হয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আজ সন্ধ্যায় ওই সংবাদের কথা উল্লেখ করে চুয়াডাঙ্গার শেয়ালমারীতে গেরিলা বাহিনীর একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের সংবাদ দিয়েছে। গত ৫ জুন শেয়ালমারীতে মাইন বিস্ফোরণে ২টি সামরিক ট্রাক ধ্বংস হয়ে ২৯ জন পাকহানাদার নিহত এবং ৪ জন আহত হয়। ওই মাইন বিস্ফোরণের শব্দে ভীত পাক হানাদাররা জীবননগর দর্শনা থেকে ঘটনাস্থলের দিকে আসে। দুইপক্ষেই পরস্পর মুক্তিসেনা বলে ভুল করে এবং পরস্পরের ওপর গুলি চালাতে থাকে। ফলে ১৩ জন পাকহানাদার নিজেদের গুলিতেই নিহত হয়।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com