১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রোহিঙ্গা ইস্যু

ত্রিদেশীয় সফর শেষে রবিবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছেন। গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের প্রশ্নে বারবারই উঠে এসেছে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পাঠাতে আমরা চুক্তি করেছি। সব রকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের (মিয়ানমার সরকার) সঙ্গে যোগাযোগও আছে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী নয়।’

সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গেই বৈরিতা নয়- আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র। তাতে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সহাবস্থান এবং সহিষ্ণুতা ও স্বাভাবিক সৌজন্যমূলক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষার মনোভাবই প্রধান হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সংঘাত নয়, আলোচনার যে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী সামনে নিয়ে এসেছিলেন, তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। পরিতাপের বিষয় হলো, খোদ মিয়ানমার সরকার কাজের কাজ কিছুই করছে না।

একেবারে শুরুর দিকে আমাদের দেশে মিয়ানমার রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ঠেলে দেয়ার পর হাজার হাজার রোহিঙ্গা যখন নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশের ভূসীমানায় আশ্রয় নিতে থাকে, সে সময় আকাশসীমা লঙ্ঘন করে মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছিল। সেটি ছিল পরিষ্কার উস্কানি। কিন্তু বাংলাদেশ সে ফাঁদে পা দিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়নি। বরং কূটনৈতিকভাবেই সেটি মোকাবেলা করা হয়। দৃঢ় প্রতিবাদ জানানো হয় ওই অসঙ্গত তৎপরতার। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গেই উচ্চারণ করেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শান্তিপূর্ণ হলেও কেউ আক্রমণ করলে তার জবাব দেয়ার মতো প্রস্তুতিও থাকতে হবে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের সে প্রস্তুতি রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলার মানুষ অনেক সহনশীল। নিজেরা দুঃখ-কষ্টে থাকলেও অন্যের দুঃখ-কষ্টে তাদের মন কাঁদে। ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী স্বদেশ থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সত্তায় একজন মমতাময়ী জননী মিশে আছেন বলেই একজন অসহায় রোহিঙ্গার অপমৃত্যু কিংবা অনিশ্চিত বিপদসঙ্কুল জীবন যাত্রা তিনি মেনে নিতে পারেননি। সীমান্ত এক প্রকার খুলেই রাখা হয়েছিল ২০১৭ সালে, যাতে তাড়া খাওয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় পেতে পারে। আমাদের সরকার প্রধানের এই মানবিক গুণ সম্পর্কে গোটা বিশ্ববাসী জানে। মাদার অব হিউম্যানিটি অভিধা প্রদানের মধ্য দিয়ে এক ধরনের কৃতজ্ঞতাও জানানো হয়েছে তাঁকে। কিন্তু এরপর? মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী হচ্ছে না আদৌ। তাই আমাদের সেই পুরনো প্রবচনটিই মনে পড়ে যাচ্ছে- সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করার প্রয়োজন পড়ে। যদিও বাংলাদেশ বিশ্ববিবেক ও বিশ্ব অভিভাবকদের ওপরই ভরসা রাখতে চায়। বিশ্বনেতারা অনুধাবন করছেন যে, মিয়ানমার অন্যায় আচরণ করছে। অপরদিকে বাংলাদেশ স্থাপন করেছে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোই হবে যথোপযুক্ত তৎপরতা।

সদিচ্ছা থেকে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি ‘সেফ জোন’ তৈরির প্রস্তাব নিয়েও কাজ করছে। রাখাইনে একটি সেফ জোন হলে যাতে ভারত, চীন ও আসিয়ানের দেশগুলো রোহিঙ্গাদের দেখাশোনা করতে পারে। এদের প্রতি মিয়ানমারের আস্থা আছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকারীদের জন্য নিরাপদ ভূমি তৈরি হলে উদ্ভূত সঙ্কটের সুন্দর একটি সমাধান হতে পারে। অথচ মিয়ানমার বরাবরের মতোই গড়িমসি করছে। তাদের অভিপ্রায় পরিষ্কার। সুফল ফলাতে তাই বিশ্বনেতাদের সক্রিয় ভূমিকাই কাম্য।