২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাস বিকৃতির দায় কে বহন করবে?

  • আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল

ইতিহাস রচনা করেন বিজয়ীরা- এই চিরন্তন সত্যটির ব্যতিক্রম সম্ভবত একমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব হয়েছে। ইতিহাস বিকৃতির জন্য সমালোচিত ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ বই নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম প্রধান এ. কে. খন্দকার ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু দায় স্বীকার করে একটি স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট কি-না তা যেমন প্রশ্ন-সাপেক্ষ, তেমনিভাবে দৃশ্যত সুপরিকল্পিত ইতিহাস বিকৃতির দায় কে নিবে, জবাবদিহিতা কার হবে, এমন বেশকিছু বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

লেখক এ. কে. খন্দকার কি দায়মুক্তি পাবেন?

এ. কে. খন্দকারের বইয়ের প্রথম সংস্করণে উল্লেখ ছিল, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন। দ্বিতীয় সংস্করণে ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন লেখা হয়। তিনি ৭ মার্র্চের ভাষণ শুনেছেন বলে বইয়ে যে দাবি করেছেন তাও সঠিক নয়, তিনি নিজেই নজরদারিতে থাকার কথা লিখেছেন এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন ’৭১ এর মে মাসে। তাই ৭ মার্চ সংশ্লিষ্ট তার স্মৃতিচারণ গ্রহণযোগ্য ছিল না। তবে তার বইয়ের বিতর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে শুধু ৭ মার্চের ভাষণই নয়, আরও অনেক আপত্তিকর বিষয় স্থান পেয়েছে। নিজের কৃতিত্ব প্রকাশে তথ্য বিভ্রাট যেমন হয়েছে, তেমনি স্বাধীনতার ঘোষণার প্রেক্ষাপট এবং মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতের ভূমিকা নিয়ে অপ্রত্যাশিত বক্তব্য স্থান পেয়েছিল যা একজন মুক্তিযোদ্ধার মানসিকতার সঙ্গে অত্যন্ত বেমানান। অনেকেই ধারণা করেন এ বইয়ের নেপথ্যে ছিল ঘোস্ট রাইটার। প্রশ্ন থেকে যায়, একটি ভুল স্বীকারের মাধ্যমে তিনি কি জাতি ও প্রজন্মের কাছে দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবেন!

প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টরা কি জবাবদিহিতার উর্ধে?

এ. কে. খন্দকারের বইটি প্রথম আলোর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘প্রথমা প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত। জনাব খন্দকার তথ্য বিকৃতির জন্য প্রথমাকে দায়ী করেছেন। তবে যেহেতু তার সম্মতিতেই ভিত্তিহীন তথ্য সংযোজিত হয়েছে তাই নিজের দায়বদ্ধতা স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু প্রথমা বা এর কর্তৃপক্ষ শুধু প্রুফ রিডিং করে বই প্রকাশ করে ফেলেছেন এমন মনে করার সঙ্গত কোন কারণ নেই।

আমি নির্দ্বিধায় ও নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দুটি সংবাদপত্র পাঠকদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। প্রথমটি অবশ্যই দৈনিক জনকণ্ঠ, যা ইতিহাস বিকৃতি রোধ ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক পাঠ তুলে ধরতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। দ্বিতীয়টি দৈনিক প্রথম আলো এবং এই পত্রিকাটির ভূমিকা দুঃখজনকভাবে নেতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। দৃশ্যত প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নীতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যেমন নয়, তেমনি বিপক্ষেও নয়। কিন্তু কিছু বিষয় এমনভাবে সম্পৃক্ত যে ইতিহাস বিকৃতির অংশীদার বলা ছাড়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলারও সুযোগ নেই। যেমন:

১. প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় বিচারপতি হাবিবুর রহমানের প্রকাশিত লেখার সূত্র ধরে ‘বাংলাদেশের তারিখ’ বইটি আলোচনায় আসে এবং প্রতিবাদ হয়। সে সময় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে হাবিবুর রহমান বলেছিলেন, ভোরের কাগজে ‘বাংলা ভাষার অসমাপ্ত ইতিহাস’ শীর্ষক কলামে ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলার কথা উল্লেখ করায় কেউ প্রতিবাদ করেনি, তাই তিনি তা সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ’৭১ সালের ৮, ৯ ও ১০ মার্চের সংবাদপত্রে ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলার সত্যতা না পেয়ে দ্বিতীয় সংস্করণে তা সংশোধন করা হয়।

২. হুমায়ূন আহমেদের ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ উপন্যাসটি প্রকাশের আগে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক ভোরের কাগজে। সেখানে হুমায়ূন আহমেদ ‘জিয়ে পাকিস্তান’ প্রসঙ্গ এনেছিলেন। এ ইস্যু নিয়ে সমালোচনা হওয়ায় হুমায়ূন আহমেদ ২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ উপন্যাসে প্রশ্ন রেখেছেন, ’৭১ এর ৮, ৯ মার্চের কোনও পত্রিকায় ‘জিয়ে পাকিস্তান’ খুঁজে পাইনি, তাহলে এমন ধারণার কারণ কি!’

এ দুটো বিষয় উল্লেখ করার কারণ, ৭ মার্চ প্রসঙ্গ সমালোচিত হয় প্রথম আলোতে হাবিবুর রহমানের এ সংশ্লিষ্ট লেখা প্রকাশের পর। অন্যদিকে ১৯৯৮ সালে ভোরের কাগজে হাবিবুর রহমান ও হুমায়ূন আহমেদের লেখা যখন প্রকাশিত হয়েছিল, তখন সম্পাদক ছিলেন মতিউর রহমান। এটা কি কাকতালীয়?

প্রথম আলোতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কিন্তু যেগুলো প্রকাশিত হয়েছে, তা তাদের গবেষণা সেলের লেখা হোক, কিংবা কে. এফ. রুস্তমজীর মতো কারও অনূদিত লেখা হোক, মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের বিকৃতি পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া ইতিহাস বিকৃতিতে সিদ্ধহস্ত হিসেবে পরিচিত ‘মূলধারা ’৭১’-এর মঈদুল হাসানের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিকে যদি প্রথমা প্রকাশন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনায় সম্পৃক্ত করে তাহলে, সেটি পাকিস্তানের পক্ষে হবে কি-না এমন সন্দেহ থেকেই সচেতন পাঠক মুক্ত হতে পারবেন না! প্রথম আলোর সরকারবিরোধী বা আওয়ামী লীগ বিরোধী মতাদর্শ বা প্রচার কৌশল থাকতেই পারে। কিন্তু এই বৈরিতা যদি বঙ্গবন্ধু ইস্যুতে প্রয়োগ করা হয় তাহলে তা অসততায় পর্যবসিত হতে বাধ্য যা প্রকারান্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার শামিল।

জয়, জিয়ে নাকি পাকিস্তান জিন্দাবাদ?

৭ মার্চের ভাষণের শেষে পাকিস্তান উচ্চারণের দাবি যে অগ্রহণযোগ্য তার বড় প্রমাণ ‘জয় বাংলা’র পর বঙ্গবন্ধু ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন, নাকি ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলেছিলেন, নাকি ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলেছিলেন তার সুনির্দিষ্ট কোন দাবি কেউ উত্থাপন করতে পারেনি। এ নিয়ে যাদের বক্তব্য সমালোচিত হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম মঈদুল হাসান, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, সাংবাদিক নির্মল সেন, হুমায়ূন আহমেদ, শামসুর রাহমান এবং সর্বশেষ এ. কে. খন্দকার। নির্মল সেন ছাড়া উল্লিখিত কেউ ৭ মার্চের ভাষণের উপস্থিত শ্রোতা ছিলেন না।

শামসুর রাহমান ভুল স্বীকার করেছিলেন। অন্যদিকে সাংবাদিক নির্মল সেনের লেখা দাবি করে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলার সপক্ষে একটি লেখা প্রচার করা হয় যা তার লেখা নয়। নির্মল সেনের লেখনীর সঙ্গেও সেই লেখা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অপপ্রচারকারীদের সম্ভবত ধারণা ছিল না যে- ৭ মার্চ ও স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে এবং ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধারণাকারীদের বিরুদ্ধে নির্মল সেন তার বইয়ে এবং জনকণ্ঠে প্রকাশিত কলামে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন।

উল্লেখ্য, আবুল মনসুর আহমেদ প্রকাশ্যেই পাকিস্তান সমর্থন করেছিলেন। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত তার লেখা ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ হাজার’ বইয়ে ৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে আপত্তি জানালেও, নিজ কানে শোনার দাবি করে তিনি লিখেছেন, ‘কিছুদিন ধরিয়া তিনি (বঙ্গবন্ধু) সব বক্তৃতা শেষ করিতেন এক সঙ্গে জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান বলিয়া। এই দিনকার সভায় প্রথম ব্যতিক্রম করিলেন। শুধু জয় বাংলা বলিয়া বক্তৃতা শেষ করিলেন।’

৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে বিতর্কের ভিত্তি মিথ্যার বেসাতিতেই:

৭ মার্চের ঐতিহাসিক মহাসমাবেশের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সেদিন বঙ্গবন্ধু ছিলেন একক বক্তা। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতার মাঝেই রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্তের কথা জেনেছিলেন। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কারণে তা ৮ মার্চ সম্প্রচারিত হয়। ভারতের এইচএমভি এর রেকর্ডও প্রকাশ করেছিল যা মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে সম্প্রচার হয়। এছাড়া ভাষণের লিফলেট প্রচারিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাকসহ সব পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণই ছিল মূল শিরোনাম। এদিন ‘সামরিক আইন প্রত্যাহার কর’ শিরোনামে শেষের পাতায় পুরো ভাষণটি প্রকাশ করে দৈনিক পূর্বদেশ। প্রকাশিত ওই ভাষণের বিভিন্ন সংস্করণে বানানের ভিন্নতা ছাড়া ‘জয় পাকিস্তান’ বা ‘জিয়ে পাকিস্তান’ এর কোন উল্লেখ নেই। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বা সংবাদপত্র আর্কাইভ থেকে যে কেউ তা যাচাই করতে পারেন।

জয় বাংলার পরে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ‘জয় পাকিস্তান’, ‘জিয়ে পাকিস্তান’ ইত্যাদি মিথ্যাচার শুরু হয় আশির দশকে জামায়াতের মুখপাত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’ এর মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে এ দায়িত্ব নেন মঈদুল হাসান। তিনি ‘জয় পাকিস্তান’ এর সন্ধানে পাকিস্তানের ডন পত্রিকার দ্বারস্থও হয়েছিলেন বলে জানা যায়, কিন্তু ডন পত্রিকার সংস্করণেও পাকিস্তান খুঁজে পাননি। একই চেষ্টা করেছিল বিএনপি সরকারও। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে প্রথম যে দুটি অনৈতিক নির্দেশ দিয়েছিলেন তার একটি ছিল, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাজারবাগের বিদ্রোহী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা করা এবং দ্বিতীয়টি ছিল ডিএফপি, রেডিও এবং পিআইডি বরাবর ডেপুটি চিফ মার্শাল ল’ এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিস থেকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট পুরনো সব ছবি, রেকর্ড ও ফিল্ম পুড়িয়ে ফেলার স্ট্যান্ডিং অর্ডার। চিত্রগ্রাহক এম এ মবিন সেগুলো না পুড়িয়ে সংরক্ষণ করেছিলেন এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার কাছে উপস্থাপন করেছিলেন। এম এ মবিন একটি টিভি চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদা ৭ মার্চের অডিও-ভিডিও রেকর্ড ‘কম করে হলেও ১০ বার’ দেখেছেন, বঙ্গবন্ধু কোন জায়গায় ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলেছেন কিনা তা বের করতে।

কারও একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্বে, সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। অথচ প্রায় অর্ধ শতাব্দী পাড়ি দেয়া স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা থেমে ছিল না, থেমে নেই। এর কারণ সম্ভবত স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সত্তা অর্জন করেও এদেশের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এখনও পাকিস্তানী মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ইতিহাসের বিপরীতমুখিতা তাদের মজ্জাগত। অন্যদিকে ইতিহাসে যার যা অবস্থান তার চেয়ে বেশি কৃতিত্ব ও কর্তৃত্বের বিশেষণ যদি যুক্ত করার অপপ্রয়াস চলে, তখন তা ইতিহাস বিকৃতির ধারাকেই সচল রাখে। ইউরোপের হলোকাস্ট ডিনায়াল এ্যাক্টের মতো এদেশে ইতিহাস বিকৃতি রোধে অনেকেই একটি আইন প্রণয়নের দাবি করে আসছেন। বাক স্বাধীনতা বা মুক্তমত মানে অবশ্যই মিথ্যাচার নয়। তাই এ বিষয়টি বোধহয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

লেখক : রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক

abdullah.harun@live.com