২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৭১-এর এই দিনে ॥ ১২ জুন, ১৯৭১ ॥ বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবি!

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ১২ জুন দিনটি ছিল শনিবার। একাত্তরের এই দিন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী লন্ডনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেন, যারা আমাদের শিশু ও মহিলাদের খুন করছে তাদের আমরা কোন দিন ক্ষমা করতে অথবা তাদের অপরাধ ভুলে যেতে পারব বলে কি মনে করেন? নিশ্চয় না। এই গণহত্যার পর দেশের দুই অংশের একসঙ্গে থাকার আর কোন প্রশ্নই ওঠে না। এদিন টাঙ্গাইলে কালিহাতীর বল্লায় কাদেরিয়া বাহিনীর সঙ্গে পাকহানাদার বাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ হয়। এতে ৪ জন পাকসেনা নিহত হয়। পাকবাহিনী প্রচুর ক্ষতি স্বীকার করে পিছু হটে। সিলেটের এনায়েতপুর নামক স্থানে মুক্তিবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে পাক হানাদার বাহিনী প্রচুর ক্ষতি করে। নওগাঁয় পাকসেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচ- সংঘর্ষ হয়। পাকিস্তান সফররত ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দলের সদস্য জেম কি ইর্ডার বলেন, এটা পরিষ্কার, উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবর্তন সুগম করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে অবশ্যই স্বাভাবিক অবস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠা করা একান্ত আবশ্যক। ব্রিটিশ জনগণ ও সরকার পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিতে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। প্যারিসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুমা বাংলাদেশ ও উদ্বাস্তু পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশের সীমান্ত পার হয়ে ভারতে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর কন্যা বেগম আখতার সোলায়মান গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার সুযোগ গ্রহণ করে নিজ নিজ এলাকায় প্রত্যাবর্তন করার জন্য সকল এমএনএ এবং এমপিএদের প্রতি আহ্বান জানান। দৈনিক কালান্তর ‘পাক হানাদারদের ওপর মুক্তিফৗজের পাল্টা আক্রমণ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, মুক্তিফৗজের গেরিলা তৎপরতায় চট্টগ্রাম শহর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় পাক সেনারা প্রতিদিনই নাজেহাল হচ্ছে। আজ সন্ধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত সংবাদে বলা হয়েছে যে সম্প্রতি গেরিলা বাহিনী চট্টগ্রাম শহরের নিউমার্কেট, খাতুনগঞ্জ, চট্টেশবরী রোড, চকবাজার, লালদীঘির মাঠ প্রভৃতি স্থানে গ্রেনেড ও হাতবোমাসহ আক্রমণ চালায়। চকবাজারে ২ জন পাক হানাদার নিহত হয়েছে। সংবাদে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম এখন পরিত্যক্ত নগরী। দোকানপাট বন্ধ। শতকরা মাত্র ১৫ জন লোক দৈনন্দিন কাজে যোগ দেয়ার জন্য পথে বেরুচ্ছেন। বেলা ৩টার পর রাস্তায় কাউকে খুব কম দেখা যায়। বন্দর এলাকায় মাত্র ৫০ জন লোক কাজ করছে। চট্টগ্রামের হাজী ক্যাম্প এলাকায় দ্বিতীয় ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন করা হয়েছে। বাগানবাজার ও আঁধারমানিক অঞ্চলে দুটি পৃথক আক্রমণে গেরিলারা ৪০ জন পাক সৈন্যকে খতম করেছে। শ্যামপুরে ৮ জন দৌলতপুর-চাঁদিরহাটে ৪০ জন কুমিল্লার হরণপুর, হৃদয়পুরে ১৩জন এবং যশোহর রণাঙ্গনে ১৫ জন পাক হানাদার গেরিলাদের হাতে নিহত হয়েছে। রামগড় থেকে কড়েরহাটের পথে ৩ জন পাক সামরিক অফিসার নিহত হয়েছে। গেরিলা বাহিনী মুসলিম লীগের দালালসহ পাক দালালদেরও বিভিন্ন স্থানে খতম করে চলছেন। জাকিগঞ্জে ৪ জন দালাল নিহত এবং ১ জন গ্রেফতার হয়েছে। মুক্তিসেনারা জাকিগঞ্জের পুলিশ স্টেশন দখল করেছেন এবং জাকিগঞ্জের পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করেছেন। কালীগঞ্জের মুসলিম লীগ চেয়ারম্যান অলি ম-লকে মুক্তিসেনারা খতম করে দিয়েছেন। ছাগলগঞ্জ বাজারে ১ দালালকে বন্দী করা হয়েছে এবং যুবতীকে উদ্ধার করা হয়েছে। সিলেট সেক্টরে মুজিফৌজের হাতে একটি রেল সেতু ধ্বংস হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি একদল সাংবাদিক বাংলাদেশের দক্ষিণ রণাঙ্গনে সফরে গিয়েছিলেন। মুক্তিফৌজের জনৈক মেজর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, মুক্তিফৌজ বর্তমান পাক হানাদারদের ওপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে এবং সর্বত্র পাকসেনাদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। উক্ত মেজর সাংবাদিকদের আরও জানিয়েছেন যে দক্ষিণ রণাঙ্গনে পাঠান ও বালুচ সেনারা নিরস্ত্র বাংলাদেশ নাগরিকদের ওপর গুলি করতে অস্বীকার করায় তাঁদের অন্যত্র বদলি করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রায় ৪০০ জন বেলুচ সেনাকে জাহাজে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়েছে। দৈনিক যুগান্তর ‘কুমিল্লা শহরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, বাংলাদেশের মুক্তিফৌজ কুমিল্লা শহরটি গতকাল দখল করে আবারও স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়েছে। সেই সঙ্গে নানা অঞ্চলে গেরিলা তৎপরতা ও তীব্রতর হয়ে উঠেছে। ইউএনআই জানাচ্ছেন সারা বাংলাদেশজুড়ে শেখ মুজিবের মুক্তিফৌজ গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে বলে সীমান্তের ওপারে মুক্তিবাহিনীর কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে খবর এসেছে। সীমান্তের ওপার থেকে জানা গেছে, মুক্তিফৌজ পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংক, হাবিব ব্যাংক লিমিটেড, মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, জজ কোর্ট এবং টাউন হল ভবনে গ্রেনেড আক্রমণ চালায়। গেরিলা বাহিনী কুমিল্লা শহরের দক্ষিণাঞ্চলে একটি রেল ইঞ্জিন উড়িয়ে দিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিদ্যুত কেন্দ্রটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিন জনাব সামাদ ইউএনএর সচিব ইউ থান্টের কাছে আবেদন করেছিলেন, যে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলকে ইউএনএ, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের সামনে তাদের ব্যাপারটি উপস্থাপনা করার অনুমতি দেয়ার জন্য। তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী জনগণের জন্য বিশেষ কিছু করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ জেনারেল ইয়াহিয়া খান কর্তৃক নিষ্ঠুরভাবে তাদের ওপর গণহত্যা, লাঞ্ছনা ও তাদের অপহরণ করা হচ্ছিল এবং তাদের বাড়ি থেকে উৎখাত করা হয়েছিল। ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শৃঙ্খলিত ও হতাশ করা হলে বিশ্বকে নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকলে চলবে না।’ সকল সরকার ও ইউএনএর উচিত ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণকে গণহত্যা এবং পরিকল্পিতভাবে খাদ্যাভাবে রাখার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা, তাদের উচিত বাংলাদেশ থেকে পেশাগত বাহিনী দ্রুত প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করা। জনাব সামাদ যিনি সম্প্রতি বুদাপেস্ট শান্তি কনফারেন্সে যোগ দেন এবং অনেক ইউরোপীয় রাজধানী পরিদর্শন করেন, তিনি বলেন যে, বাংলাদেশ সরকারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সেখানে দুর্ভিক্ষ এবং মহামারী প্রকট আকার ধারণ করেছে যাতে প্রচুর লোক মারা যাচ্ছে। একদিকে বর্ষার কারণে জনসাধারণ দুর্ভোগ আছে অন্যদিকে দখলদার সেনাবাহিনী তাদের ঘর ছাড়া করছে। গত নবেম্বরে ঘূর্ণিঝড়ের শিকারদের জন্য যে রিলিফ পাওয়া গেছে তা ইসলামাবাদ সরকার পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে দিয়ে বাংলাদেশের নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষকে গণহত্যার জন্য ব্যবহার করছে।’ ত্রাণসামগ্রীর কার্যকরী বণ্টন নিশ্চিত করতে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের সেনানিবাস থেকে প্রত্যাহার করা উচিত।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com