১৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করতে পারবে না ফেসবুক গুগল ও ইউটিউব

  • বাংলাদেশে অফিস স্থাপন করতে হবে অথবা মূসক এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে

রহিম শেখ ॥ আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটারসহ জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউব ও সার্চ ইঞ্জিন গুগল ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না। ব্যবসা পরিচালনার জন্য এসব কোম্পানিকে বাংলাদেশে অফিস স্থাপন করতে হবে অথবা মূসক এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে। এজেন্ট ব্যবসা পরিচালনা বাবদ বাংলাদেশ সরকারকে রাজস্ব প্রদান করবে।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশের গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন খরা চলছে। সে বিজ্ঞাপনের বাজার ধীরে ধীরে স্থান করে নিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউব ও অনুসন্ধান ইঞ্জিন গুগল। সহজে বহু মানুষের কাছে পৌঁছায় বলে সহজে এসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দেয়ার হিড়িক পড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউব ও গুগল বছরে বিজ্ঞাপন বাবদ দেশ থেকে কী পরিমাণ টাকা নিয়ে যাচ্ছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই। বৈধর চেয়ে অবৈধভাবে এসব প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন বিল পরিশোধ করা হয় বলে হিসাব নেই। বাংলাদেশে এসব কোম্পানির ভ্যাট বা কর নিবন্ধন নেই। ফলে ভ্যাট ও কর না দিয়েই অবৈধ বা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা নিয়ে যায় কোম্পানিগুলো। তবে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে তা আর সম্ভব হবে না। আইন অনুযায়ী প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বাধ্যতামূলকভাবে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হবে। অন্যথায় আইন অনুযায়ী এসব সাইট বন্ধ করে দেয়া হবে।

এনবিআর সূত্র জানায়, নতুন ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২’ আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী ফেসবুক, ইউটিউব, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানকে মূসক নিবন্ধন নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অফিস স্থাপন করতে হবে। অন্যথায় এসব প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে তাদের মূসক এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে। নিবন্ধন এসব প্রতিষ্ঠানের নামে হলেও মূসক এজেন্ট এসব প্রতিষ্ঠানের হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করবে। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন ও তাদের আয়ের ওপর মূসক ও আয়কর পরিশোধ করবে। আইন অনুযায়ী, নিবন্ধন না নিলে ব্যবস্থা নেবে এনবিআর। সে ক্ষেত্রে এনবিআর এসব প্রতিষ্ঠানের সাইট বন্ধ করে দিতে বিটিআরসিকে চিঠি দেবে। ফলে বাংলাদেশে ব্যবহারকারীরা এসব সাইট ব্যবহার করতে পারবেন না। এসব প্রতিষ্ঠানের এদেশে অফিস হলে মূসকের পাশাপাশি আয়করও আদায় করা যাবে। সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে ফেসবুক বা গুগল কী পরিমাণ অর্থ আয় করে তার কোন সঠিক জরিপ নেই। তবে সম্প্রতি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ফেসবুক-গুগলে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে বছরে গড়ে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। এছাড়া দেশে প্রায় দুই হাজার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ এসব মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে ব্যয় করে। আবার দেশে ইউটিউব চ্যানেলও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। গান, নাটকসহ নানা বিনোদনের ভিডিও দিয়ে তরুণরা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একটি অংশ ইউটিউবের সঙ্গে ‘প্রফিট শেয়ারিং’ করছে।

আবার ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে ফেসবুক পোস্টে বিজ্ঞাপন দিয়ে আয় করছেন। যেসব ফেসবুক পেজের লাইক বা ফলোয়ার লাখের বেশি তারা এই সুযোগ নিচ্ছেন। আবার কোন অনলাইন প্রতিষ্ঠান সরাসরি তাদের আর্টিক্যাল, পণ্যের বিজ্ঞাপন অথবা কোন বক্তব্য সরাসরি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ফেসবুককে অর্থ দিয়ে বুস্ট করছেন। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে এসব বিজ্ঞাপনের অর্থ পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু খুব কমসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট কার্ডে অর্থ পরিশোধ করে। বেশিরভাগই হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করে। ক্রেডিট কার্ডে পরিশোধ করলে সরকার ১৫ শতাংশ ভ্যাট পায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) পর্যন্ত ফেসবুক, ইউটিউব, গুগলসহ ডিজিটাল মার্কেটিং থেকে প্রায় ৭০ কোটি টাকা আদায় করেছে।

এনবিআরের একজন কর্মকর্তা (ভ্যাট) বলেন, সম্প্রতি এনবিআর থেকে তথ্য নিয়েছে বিটিআরসি। তাতে বলা হয়েছে, ২০১২ সালের পর থেকে ফেসবুক এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ব্যবসা করেছে। বিটিআরসি বলছে, ফেসবুক বাংলাদেশে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে বাধ্য করতে পারলে বছরে শতকোটি টাকার ভ্যাট আদায় হবে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে স্পেনের বার্সেলোনায় ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে ফেসবুক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়। বৈঠকে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে অফিস খোলার আগ্রহ দেখায়। এর আগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ফেসবুকের প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করেন। সে সময়ও ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে আঞ্চলিক অফিস খোলার আশ্বাস দেয়। এ দেশে মূলত সেলস অফিস খোলার মাধ্যমে ফেসবুক বিভিন্ন বিজ্ঞাপন সেবা বিক্রি করবে। এছাড়া ২০১২ সালে গুগল ঢাকায় অফিস খোলার ঘোষণা দিলেও এখনও করেনি। গুগল বাংলাদেশের জন্য সিঙ্গাপুরে কান্ট্রি কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়। এ বিষয়ে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, ফেসবুক, ইউটিউব, গুগলের মতো জনপ্রিয় মাধ্যম থেকে এখন তেমন ভ্যাট আদায় হয় না। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের মূসক নিবন্ধন নেই। দেশে তাদের কোন অফিসও নেই। এছাড়া এসব সাইটে প্রচুর পরিমাণ বিজ্ঞাপন দেখা যায়। কিন্তু এ বিজ্ঞাপন থেকে কী পরিমাণ আয় করে বা টাকা কীভাবে পরিশোধ হয় তাও জানা নেই। তবে নতুন আইন অনুযায়ী নিবন্ধন নিয়ে ব্যবসা করতে হবে। আইনের ব্যত্যয় হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে সাইট বন্ধ করে দেয়ার এখতিয়ার আইনে রয়েছে।