২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রত্ন স্থাপনায় জাদুঘরে তিনগুণ দর্শনার্থী, মুখরিত প্রাঙ্গণ

প্রত্ন স্থাপনায় জাদুঘরে  তিনগুণ দর্শনার্থী,  মুখরিত প্রাঙ্গণ
  • ঈদ ফিরিয়েছে ইতিহাস ঐতিহ্যের কাছে

মোরসালিন মিজান ॥ বাঙালীর এখন কী আছে আর কী নেই, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে অতীতটা ছিল অনেক বেশি গৌরবোজ্জ্বল। সমৃদ্ধ সেই ইতিহাস-ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শন সাজিয়ে রাখা আছে জাদুঘরে। চার শ’ বছরের পুরনো শহর ঢাকার অলিতে গলিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন স্থাপনা। আরও অনেক কালের সাক্ষী মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু নিজেকে, নিজের চারপাশটাকে জানার এই সহজ সুযোগ ক’জন গ্রহণ করছেন? সংখ্যাটি, যে কেউ মানবেন, হাতেগোনা।

তবে ঈদের ছুটিতে দৃশ্যপট বদলে যায়। এবারও তা-ই দেখা গেল। উদাসীনদের, সিরিয়াস চর্চার প্রতি বিমুখদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কাছে ফিরিয়েছে ঈদ। ঈদ মানে, ঈদের ছুটি। বরাবরের মতো এবারও লম্বা ছুটি পেয়ে জাদুঘরে, প্রতœ স্থাপনায়, চিড়িয়াখানায় ঘুরে বেড়িয়েছে মানুষ। সাধারণ সময়ের চেয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যা তিন থেকে চারগুণ বেশি ছিল।

সবচেয়ে বেশি ভিড় পরিলক্ষিত হয় জাতীয় জাদুঘরে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জাদুঘরটি দেশের প্রধান সংগ্রহশালা। এখানে বর্তমানে ৯২ হাজারের বেশি নিদর্শন রয়েছে। চারতলা ভবনের তিনটি ফ্লোরে ৪৫টি গ্যালারি। নিয়মিত এসব গ্যালারি পরিদর্শন করছেন দর্শনার্থীরা। তবে ঈদের ছুটিতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে এসেছিলেন বহু মানুষ। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে জাদুঘরে প্রবেশ করতে দেখা গেছে তাদের। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখ করার মতো। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরাও জাদুঘরের নিদর্শন দেখে অভিভূত হয়েছে।

জাদুঘরের কীপার শিহাব শাহরিয়ার জানান, ঈদের পর গত শুক্রবার জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন মোট ৯ হাজার ৬শ’ ৬৭ জন। পরদিন শনিবার এসেছিলেন ৯ হাজার ৬শ’ জন। রবিবার দর্শনার্থী সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৯শ’ ৬ জন। মঙ্গলবার জাদুঘর পরিদর্শন করেন ২ হাজার ৬ শ’ ৩৮ জন দর্শনার্থী। সাধারণ সময়ের চেয়ে এই সংখ্যা অনেক বেশি। ঈদের ছুটিতে কোনদিন তিনগুণ, কোনদিন চারগুণ দর্শনার্থী পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

পুরান ঢাকায় অবস্থিত লালবাগ কেল্লায়ও ঢল নেমেছিল সাধারণ মানুষের। ছেলে বুড়ো সকলেই ঘুরে বেড়িয়েছেন। মুঘল আমলে নির্মিত দুর্গটি লালবাগে অবস্থিত। নামটি মূলত কেল্লা আওরঙ্গাবাদ। লালবাগ কেল্লা নামে বেশি পরিচিত। কেল্লার চত্বরে রয়েছে দরবার হল ও হাম্মামখানা। আছে পরী বিবির সমাধি এবং শাহী মসজিদ। বাংলাদেশে এই একটি মাত্র ইমারতে মার্বেল পাথর, কষ্টি পাথর ও বিভিন্ন রঙের ফুল-পাতা সুশোভিত চাকচিক্যময় টালির সাহায্যে অভ্যন্তরীণ নয়টি কক্ষ অলঙ্কৃত করা হয়েছে। কক্ষগুলোর ছাদ কষ্টি পাথরে তৈরি। মুঘল স্থাপনাটি সত্যি দেখার মতো। বার বার দেখা। তবুও দেখতে মন চায়। ঈদে তাই সবুজ খোলা চত্বর জুড়ে মানুষের ঢল নেমেছিল। অন্য সময়ের চেয়ে ঈদে বহুগুণ ছিল দর্শনার্থী।

লালবাগ কেল্লার কাস্টডিয়ান হালিমা আফরোজ জানান, ঈদের পরদিন বৃহস্পতিবার ঐতিহাসিক প্রত্ন স্থাপনা দেখতে এসেছিলেন ১৬ হাজার ৫শ’ জন। শুক্রবার সংখ্যাটি ছিল ১৫ হাজার। পরদিন শনিবারও সমপরিমাণ দর্শনার্থী ছিল কেল্লায়। ঈদে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি কেল্লার ইতিহাস সম্পর্কে জানার ব্যাপারেও অনেকে আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে জানান তিনি।

আহসান মঞ্জিল ঘিরেও সমান কৌতূহল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পুরান ঢাকার সদরঘাটে অবস্থিত প্রাসাদ ভবন অন্য অনেক স্থাপনা থেকে আলাদা এবং আকর্ষণীয়। এটি ছিল ঢাকার নওয়াবদের আবাসিক প্রাসাদ ও জমিদারির সদর কাচারি। ১ মিটার উঁচু বেদির ওপর নির্মিত দ্বিতল প্রাসাদ ভবন এখন দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। উপরের দিকে সুদৃশ্য গম্বুজ। অনেকদূর থেকে চোখে পড়ে। দক্ষিণ দিকের দোতলার বারান্দা থেকে নিচে নেমে যাওয়া খোলা সিঁড়িটি আরও বেশি দৃষ্টিনন্দন। সারা বছরই দর্শনার্থীর আসা-যাওয়া লক্ষ্য করা যায়। তবে যানজটের কারণে ইচ্ছা সত্ত্বেও অনেকে যেতে পারেন না। ঈদে সমস্যাটি একেবারেই ছিল না। ফাঁকা ঢাকায় যে যার মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন। পৌঁছে গেছেন আহসান মঞ্জিলেও। বিভিন্ন বয়সী মানুষ জাদুঘরটি পরিদর্শন করেছেন। সেইসঙ্গে বাইরের খোলা চত্বর ঘুরে বেড়িয়েছেন।

আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের ডেপুটি কীপার ইলিয়াস খান জানান, ঈদের ছুটিতে দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়েছিল। সাধারণ দিনগুলোতে জাদুঘর পরিদর্শনে আসেন দেড় শ’ থেকে ৩শ’ জন। আর ঈদের চতুর্থ দিন গত শনিবার জাদুঘর পরিদর্শন করেন ৮ হাজার ৭শ’ দর্শনার্থী। ঈদের তৃতীয় দিন শুক্রবার এসেছিলেন ৮ হাজার ৪শ’ জন। এমনকি ঈদের দিন প্রচন্ড বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রায় ১ হাজার দর্শনার্থী জাদুঘরে আসেন বলে জানান তিনি।

আগারগাঁওয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরেও সাধারণ সময়ের চেয়ে দর্শনার্থী সংখ্যা অনেক বেশি ছিল বলে জানা যায়। মিরপুর শেওড়াপাড়া কাজীপাড়াসহ আশপাশের এলাকা থেকে বহু মানুষ ঈদে জাদুঘর পরিদর্শনে এসেছিলেন।

এসবের বাইরে জাতীয় চিড়িয়াখানা ঘিরেও ছিল বিপুল কৌতূহল। ঈদের দিনগুলোতে এখানে সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ দর্শনার্থী ছিল বলে জানা গেছে। চিড়িয়াখানার কিউরেটর এসএম নজরুল ইসলাম জানান, ঈদের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। শুক্রবার সংখ্যাটি ছিল পৌনে দুই লাখ আর গত শনিবার ছিল দেড় লাখ দর্শনার্থী। সাধারণ সময়ে ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার দর্শনার্থী পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।

ঢাকার অন্যান্য প্রত্ন স্থাপনা, জাদুঘর এবং ইতিহাস ঐতিহ্যের দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এমন স্থানগুলোতেও ভিড় ছিল দর্শনার্থীদের।

বিষয়টিকে খুব ইতিবাচকভাবেই দেখছেন ইতিহাসবিদ ও জাদুঘর বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে কথা হয় বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও জাতীয় জাদুঘরের সাবেক কর্মকর্তা ড. ফিরোজ মাহমুদের সঙ্গে। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে জাদুঘরগুলোতে দর্শনার্থী সংখ্যা বহুগুণে বাড়ে। এবারও বেড়েছে। ঢাকার অন্যান্য প্রত্ন নিদর্শন এবং ইতিহাসের স্মারকগুলোও তারা দেখছেন। এটা খুবই ভাল খবর। এতে করে বোঝা যায় বিষয়গুলো নিয়ে তাদের আগ্রহ আছে। তবে এই স্রোত ধরে রাখার উপর জোর দেন তিনি। বলেন, জাদুঘরে এসে দেখার আগ্রহ যেন আরও বাড়ে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। ঈদ বিনোদনের অংশ হিসেবে যারা যাদুঘরে আসেন, প্রত্ন নিদর্শন দেখতে বের হন তাদের মধ্যে ইতিহাস চেতনা জাগ্রত করতে হবে। ঐতিহ্যের প্রতি প্রেম বাড়াতে হবে। এ জায়গাগুলোতে আরও বেশি করে কাজ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি পরামর্শ দেন তিনি।