১৮ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাকিস্তানকে হারিয়ে জয়ের ধারায় অস্ট্রেলিয়া

মিথুন আশরাফ ॥ বিশ্বকাপে জয়ের ধারায় ফিরেছে অস্ট্রেলিয়া। বুধবার টনটনে পাকিস্তানকে ৪১ রানে হারিয়েই এই ধারায় ফিরে অসিরা। ডেভিড ওয়ার্নারের ১০৭ রানের অসাধারণ ইনিংসের সঙ্গে এ্যারন ফিঞ্চের ৮২ রানের পর বল হাতে পেট কামিন্স (৩/৩৩), মিচেল স্টার্ক (২/৪৩) ও কেন রিচার্ডসনের (২/৬২) দুর্দান্ত বোলিংয়ে এই জয় আসে।

পাকিস্তান দলটিকে নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না! তা সবারই জানা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপে টনটনের ম্যাচটিতে তার প্রমাণ আবারও মিলল। আগে ব্যাটিং করে শুরুটা কী অসাধারণ করল অস্ট্রেলিয়া। একটা সময় মনে হয়েছিল ৪০০ রানের কাছাকাছি অনায়াসেই করবে অসিরা। কিন্তু হঠাৎ করেই সব ওলট পালট করে দিলেন মোহাম্মদ আমির। আমিরের (৫/৩০) বোলিং ধাঁধায় পড়ে ক্যারিয়ারের ১৫তম ও পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা তৃতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরি করা ডেভিড ওয়ার্নারের ১০৭ ও এ্যারন ফিঞ্চের ৮০ রানের পরও ৩০৭ রানের বেশি করতে পারল না অস্ট্রেলিয়া। ৪৯ ওভারেই আবার গুটিয়ে গেল। ছোট্ট মাঠ টনটনে এই রান খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। যেভাবে অসি ব্যাটসম্যানরা স্কোরবোর্ড অনেক ভারি করে তুলছিলেন, তাতে ৩০৮ রানের টার্গেট পাকিস্তানের অতিক্রম করারই কথা। স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যে পাকিস্তান দল বড় মাঠে ৩৪৮ রান করে, তাদের পক্ষেতো সম্ভবই। কিন্তু পাকিস্তান দল নিয়েতো আগাম কিছু বলা মুস্কিল। ব্যাটিংয়ে নেতিয়ে পড়ে পাক ব্যাটসম্যানরা। পেসার পেট কামিন্সের গতির কাছে হার মানতে হয় পাকিস্তান ব্যাটসম্যানদের। এরপর স্টার্ক ও রিচার্ডসন মিলে পাকিদের বেহাল করে তুলেন। শেষপর্যন্ত ৪৫.৪ ওভারে ২৬৬ রান করতেই অলআউট হয় পাকিস্তান।

টানা দুই ম্যাচ (আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ) জেতার পর তৃতীয় ম্যাচে এসে ভারতের কাছে হেরেছিল অস্ট্রেলিয়া। চতুর্থ ম্যাচে এসে পাকিস্তানকে হারায় অসিরা। চার ম্যাচে ৬ পয়েন্ট পায়। প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ডের সঙ্গে জিতে পাকিস্তান। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তৃতীয় ম্যাচটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়। চতুর্থ ম্যাচে এসে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারে পাকিস্তান। চার ম্যাচে ৩ পয়েন্ট পায় পাকিস্তান।

পাকিস্তানের ইনিংসে শুরুতেই ধ্বস নামান কামিন্স। পাকিস্তান স্কোরবোর্ডে ২ রান যোগ হতেই ফখর জামানকে সাজঘরে ফেরান। এরপর ওপেনার ইমাম উল হক ও বাবর আজম মিলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে কোল্টার নাইল আউট করে দেন বাবর আজমকে (৩০)। দলের ৫৬ রানে ২ উইকেট হারিয়ে খাদের কিনারায় পড়ে যায় পাকিস্তান। সেখান থেকে দলকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন ইমাম উল হক ও মোহাম্মদ হাফিজ। তারা দলকে আশাও দেখান। সুন্দরভাবে পথও পাড়ি দিচ্ছিলেন। কিন্তু দুইজনের জুটিতে ৮০ রান হতেই কামিন্স আবার আঘাত হানেন। এবার হাফ সেঞ্চুরিয়ান ইমাম উল হককে (৫৩) আউট করে দিয়ে পাকিস্তান ইনিংসের মেরুদ- যেন ভেঙ্গে দেন। এরপর আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি পাকিস্তান। দেখতে দেখতে ১৬০ রানের মধ্যে মোহাম্মদ হাফিজ (৪৬), শোয়েব মালিক, আসিফ আলী (৫) আউট হলে পাকিস্তানের হার যেন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। হাফিজ আউট হওয়ার পর যখন মালিক ব্যাট হাতে নামেন, তখনও আশা দেখা হয়। কিন্তু কামিন্সের ছোবলে রানের খাতা খোলার আগেই ফকির বেশে সাজঘরে ফিরেন মালিক। এরপর সরফরাজ আহমেদ উইকেটে থাকলেও হতাশার রেখাই দেখার মিলতে থাকে।

হাসান আলী যেন আউট হতে ছটফট করছিলেন। তাইতো ১৫ বলেই ৩ চার ও ৩ ছক্কা হাঁকিয়ে ৩২ রান করে আউট হয়ে যান। সরফরাজ ও ওয়াহাব রিয়াজ মিলে শেষ মুুহূর্তে রোমাঞ্চ তৈরি করেন। রিয়াদ ছক্কা, চার হাঁকাতে থাকেন। তাতে করে দুইজন মিলে ৫০ রানের জুটিও গড়ে ফেলেন। খেলাতেও উত্তেজনা তৈরি হয়। সরফরাজের চেয়েও দ্রুত রান তুলতে থাকেন ওয়াহাব। সরফরাজও বারবার ওয়াহাবকেই স্ট্রাইক দিতে থাকেন। দলের যখন ২৬৪ রান এমন সময় ৩৯ বলে ৪৫ রান করা ওয়াহাবকে আউট করে দেন মিচেল স্টার্ক। ক্যাচ আউটটি আম্পায়ার না দিলেও ‘রিভিউ’ নিয়ে ওয়াহাবকে সাজঘরে ফেরানো হয়। ওয়াহাব থাকতে খেলাতেও উত্তেজনা ছিল। উত্তাপ তৈরি হয়েছিল। মুহূর্তেই সমাপ্তি ঘটে। ৪৫তম ওভারে এসে ওয়াহাবের পর আমিরকেও যখন বোল্ড করে দেন, তখন আর কোন আশাই বেঁচে থাকেনি। স্টার্ক কাজের কাজটি সময় মতো করে দিলেন। দলের সেরা পেসার কী আর এমনিতেই! সরফরাজও (৪০) শেষপর্যন্ত রান আউট হয়ে গেলেন। তাতে ৪৫.৪ ওভারেই গুটিয়ে গেল পাকিস্তান। অস্ট্রেলিয়া যে রান করে, তাই পাকিস্তানের সামনে অনেক বড় হয়ে ধরা দেয়।

টনটনের কাউন্টি গ্রাউন্ড অন্য স্টেডিয়াম থেকে অনেক ছোট্ট। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে যে দলই ব্যাটিং নির্ভর উইকেট পাচ্ছে, তারাই ৩০০ রান অনায়াসে অতিক্রম করে সাড়ে তিনশ রান করে ফেলছে। ছোট্ট মাঠ হওয়াতে অস্ট্রেলিয়া সেইরকম কিছুই করবে, তা মনে হতে থাকে। টস হেরে আগে ব্যাটিং করার সুযোগ পেয়ে শুরুতেই যে অসাধারণ খেলতে থাকেন দুই ওপেনার ফিঞ্চ ও ডেভিড ওয়ার্নার। খুব বুঝে এগিয়ে যেতে থাকেন। দুইজন মিলে খুব দ্রুতই ১০০ রানের জুটি গড়ে ফেলেন। ১০০ বলে স্কোরবোর্ডে ১০০ রান যোগ হয়ে যায়। দেখতে দেখতে ১৫০ রানের কাছেও চলে যায় অস্ট্রেলিয়া। ফিঞ্চ ও ওয়ার্নার হাফসেঞ্চুরিও করে ফেলেন। যখন দলের রান ১৪৬ রানে যায়, তখনই বিপদ ঘনিয়ে আসে। যেখানে বিশ্বকাপে প্রথম ৪০০ রানের আলামত মিলছিল, সেখানে ফিঞ্চকে (৮২) মোহাম্মদ আমির আউট করে দিতেই খেলা ঘুরতে শুরু করে দেয়। ২২তম ওভারে ১৪৬ রান হয়ে যাওয়ায় হাতে থাকে ২৮ ওভার। একই গতিতে রানের চাকা চললে স্বাভাবিকভাবেই ৪০০ রান বা তার কাছাকাছি হওয়ার কথা। কিন্তু আমির যে ‘ব্রেক থ্রু’ এনে দেন, এরপরই অস্ট্রেলিয়া যেন ছন্নছাড়া হয়ে যেতে থাকে।

যেখানে অসিদের ১ উইকেট শিকার করতে ১৪৬ রান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে পরের ৯টি উইকেট ১৬১ রানেই হজম করে ফেলে পাকিস্তান। যে আমিরকে বিশ্বকাপ দলেই নেয়া হয়নি শুরুতে, সেই আমির বুঝিয়ে দেন তাকে কতটা দরকার।

ফিঞ্চ আউট হওয়ার পরও হাল ছাড়েনি অস্ট্রেলিয়া। ওয়ার্নারতো আগের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে যে বেশি বল খেলে কম রান করে আউট হয়েছিলেন, বুধবার যেন প্রতিজ্ঞা করে নামেন, কিছু একটা করে দেখাবেন। তিনি ঠিকই করে দেখালেন। সেঞ্চুরির পর একবার ‘নতুন জীবন’ পেয়ে ১১১ বলে ১১ চার ও ১ ছক্কায় ১০৭ রান করে শাহিন শাহ আফ্রিদির গতির কাছে হার মেনে আউট হলেন। ততক্ষণে দলও ২৪২ রানে চলে যায়, কিন্তু রানের গতি কমে যায়। কারণ, এরআগেই যে স্টিভেন স্মিথকে (১০) মোহাম্মদ হাফিজ ও গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে (২০) শাহিন শাহ আফ্রিদি আউট করে দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে বেহাল দশায় ফেলে দেন। এরপর আর কোন ব্যাটসম্যান নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। ঠিক যেন ভারতের ম্যাচের মত হলো। ফিঞ্চ, ওয়ার্নার, স্মিথ, ম্যাক্সওয়েল, খাজা আউট হতেই ভারতের জয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। ঠিক তেমনি পাকিস্তানের সঙ্গেও ফিঞ্চ, স্মিথ, ম্যাক্সওয়েল, ওয়ার্নারের পর দলের ২৭৭ রানের সময় উসমান খাজা (১৮) আউট হতেই সাড়ে তিনশ রানও যে অসিরা করতে পারবে না, তা বোঝা হয়ে যায়।

খাজা আউটের পরতো ৩০ রানেই ৫ উইকেট খতম হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার। এরমধ্যে শেষ ৫ উইকেটের চারটিই আমির হজম করেন। কী অসাধারণ বোলিং করেন। টস জিতে যখন পাকিস্তান ফিল্ডিং নিল, ফিঞ্চ ও ওয়ার্নার খুব স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে থাকলেন, তখন ফিল্ডিং নেয়াই ভুল ছিল; এমন মনে হচ্ছিল। কিন্তু যেই আমির প্রথম উইকেট শিকার করলেন, খেলাই ‘ইউটার্ন’ নিয়ে ফেলল। ১০ ওভার বোলিং করে ২ মেডেনসহ ৩০ রান দিয়ে ৫ উইকেট নেন আমির। তার বোলিং তা-বেই অস্ট্রেলিয়া ৩০৭ রানের বেশি করতে পারল না। কিন্তু পাকিস্তান ব্যাটসম্যানরা হতাশ করলেন। তারা এই রান তুলবেন দূরে থাক, ২৬৬ রানের বেশি করাই গেল না। পাকিস্তানকে হারিয়ে জয়ের ধারাতেও ফিরল অস্ট্রেলিয়া।