২৫ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমাদের গ্রাম এখন ...

  • তৌফিক অপু

ট্রেনের হুইসেল বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মন টা হু হু করে উঠল। ধীরে ধীরে ট্রেন স্টেশনের প্লাটফর্ম যত পেরুতে থাকল ততই যেন হৃদয় কোণে বিষাদের টান অনুভব হতে থাকল। এ মহামায়া বলে বোঝাবার নয়। প্রতিবারই ঈদের পর গ্রামের বাড়ির মায়া ছেয়ে শহরে প্রবেশের আগে এমন অনুভূতি হয় না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। শান্ত নিটোল পরিবেশে, পাখির কলতানে মেতে থেকে যে সময় পার হয় তা আর অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। হাঁটতে চলতেই দেখা হয়ে যায় অনেক পরিচিত মুখ। তাদের নিয়ে খড়ির চুলায় ধোঁয়া ওঠা চায়ের দোকানে আড্ডা জমাতে তাই সময় লাগে না। দীর্ঘদিন দেখা হয় না এমন মানুষের সঙ্গেও দেখা হয়ে যায় গ্রামের বাজারে। ব্যস আর যায় কোথায়? হয়ে যায় মনখুলে ভাব বিনিময়। ঈদের ছুটিতে গ্রামের এ দৃশ্য যেন অতি পরিচিত। আহা গ্রাম, নিজের গ্রাম, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে বসে যদি ক্ষণিকের জন্যও এ নিয়ে ভাবা যায় মুহূর্তের ভাল লাগায় ভরে যায় মন। অনেকটা মোবাইল ফোনের ব্যাটারি রিচার্জের মতন। যখনই ভাবনা তখনই মন চাঙ্গা। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো কর্ম ব্যস্ততার ফাঁকে কখনও যদি গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সিডিউল করা হয় ঠিক তখন থেকে ব্রেন এক অন্যরকম ভাল লাগার সিগনাল দিতে থাকে। আর শুরু হয় দিন গোনা কবে যাওয়া হবে বাড়ি। পরিচিত সেই গানের সঙ্গে মন তাই গেয়ে ওঠে ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার’।

গ্রাম-পল্লী প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সৃষ্টিকর্তার অপরূপ নিদর্শনগুলোর একটি। ‘God made the village and man made the town’ পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে তাই এই কথাটি বেশ জনপ্রিয়। গ্রামীণ জীবন প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। প্রকৃতির স্নিগ্ধ সবুজ, প্রশান্তির ছায়া, কোমল হাওয়া, কাক ডাকা ভোর বা টিনের চালে ঝম্ঝম্ বৃষ্টির শব্দ প্রভৃতি আনন্দময় অনুভূতি ও মুহূর্ত কেবল মাত্র গ্রামীণ জীবনের সংস্পর্শেই পাওয়া যায়। গ্রামের সারি সারি গাছপালা, আঁকা-বাঁকা মেঠোপথ, ফসলের ক্ষেত, বসতবাড়ি, পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরার দৃশ্য সবকিছুই ছবির মতো। সব কিছু মিলে গ্রাম-বাংলার জীবনযাত্রা পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ এর মতোই অনিন্দ সুন্দর ও স্নেহ-মমতা জড়ানো।

প্রকৃতির অপার লীলাভূমি আমাদের গ্রাম

পল্লী প্রকৃতিকে ভালবেসে মমতা ভরা হৃদয়ে কবি রচনা করে গেছেন-

‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায়

হেরিনু পল্লী জননী’... এমন পল্লী জননীও আমাদের অনেকের দেখার সৌভাগ্য হয় না। ছোটবেলার দেখা আসা গ্রাম বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কতটুকু বদলালো তা না দেখার আফসোসও কুড়ে কুড়ে খায়। হয়তো সে আফসোস থেকে কবি মহাদেব সাহা লিখেছেন ‘আমার সবুজ গ্রাম’ কবিতাটি-

কতেদিন হয়নি যাওয়া আমার সবুজ গ্রামে

সোনাবিল, পদ্মাদিঘি, উত্তরকঙ্গের

সেই ধুলোওড়া পথ, বিষণ্ণ পাথার,

আখ মাড়াইয়ের দৃশ্য, ক্লান্ত মহিস

কতেদিন হয়নি দেখা; কতেদিন হয়নি

শোনা দুপুরে ঘুঘুর ডাক, হুতোম পেঁচার

শব্দ ঃ হয়তো এখনো হাতছানি দিয়ে ডাকে

প্রায় শুকিয়ে যাওয়া গ্রামের নদীটি, কখনো

শহরে সবুজের সমারোহ দেখে এই প্রিয় গ্রামটিকে

মনে পড়ে যায় ঃ কোনো পুরনো দিনের

গান শুনে, দোয়েল-শালিক দেখে

আমি খুবই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি;

ফিরে যাই আমার সবুজ গ্রামে, হাটখোলাটিতে

এখনো টিনের চালে কখনো

বৃষ্টির শব্দ শুনে উত্তরবঙ্গের

সেই দুঃখিনী গ্রামটি মনে পড়ে।

এমনকি আছে তার মনে রাখবার মতো

তবু এই উলুঝুলু বন, বিষণ্ণ পাথর

নেহাৎ খালের মতো শুকনো নদীটি, এখনো

আমার কাছে রূপকথার চেয়েও বেশি রূপকথা।

কবিতাটি পড়লে সহজেই বোঝা যায় গ্রাম না দেখার আফসোস কতটা পুড়িয়েছে কবিকে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ গ্রামের দৃশ্য ও প্রেক্ষাপট প্রায় এক। চিরচেনা শান্ত নিটোল পুকুরের পার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ, বিস্তীর্ণ ফসলি ক্ষেত, পাখির কলতান সবকিছুই গ্রামের পরিচয় বহন করে। যদিও কালেও পরিক্রমায় অনেক পথ এগিয়েছে গ্রাম। তারপরও এ দৃশ্য এখনও বিলীন হয়নি।

গ্রামাঞ্চলের সঙ্গে বাঙালীর নাড়ির সম্পর্ক। পলাশ ডাকা-কোকিল ডাকা আর ধানের ক্ষেতে মৃদু মন্দ হাওয়ার ঢেউ খেলানোর মতো দৃশ্য গ্রাম বাংলার এক চিরাচরিত রূপ। দিগন্ত-জোড়া ফসলের ক্ষেতের মাঝখানে কিছুদূর পর পর দু-একটা বসতবাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। কল্পনার রাজ্যে তখন এই কুঁড়ে ঘরগুলোকেও রাজপ্রাসাদের মতো মনে হয়। দোয়েল, কোকিল, ঘুঘু, পাপিয়া, বৌ-কথা কও প্রভৃতি পাখি গ্রাম্য প্রকৃতিকে সারাবেলা মোহনীয় সঙ্গীতে মাতিয়ে রাখে। ধানের ক্ষেতে অল্প পানিতে বকের এক পায়ে-দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য, মাছরাঙ্গা পাখির পুকুর থেকে মাছ শিকারের ফন্দি দেখা, ঝড়ের দিনে আম কুড়ানোর মতো সুখ কেবলমাত্র গ্রামে এলেই মানুষ পেতে পারে।

বাংলাদেশের গ্রাম ও পাশ্চাত্যের গ্রাম

নগর ও গ্রাম এ দুটি শব্দ পৃথিবীর সব দেশের জন্য প্রযোজ্য। গ্রামে গ্রামে ভিন্নতা রয়েছে ঠিকই তবে গ্রাম যে নগরের মতো নয় এ কথা সত্যি। তবে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে গ্রাম বলতে যা বোঝায়, বাংলাদেশের গ্রাম তা নয়। পাশ্চাত্যের দেশগুলো শহরকেন্দ্রিক। শহরকে কেন্দ্র করেই তাদের লোকালয় গড়ে উঠেছে। কিন্তু জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি কাজ, ক্ষেত খামার, পশু চারণ ভূমি, ফলের বাগান, মাছের চাষ প্রভৃতি কাজকর্ম শহর থেকে কিছুটা দূরবর্তী স্থানে সম্পাদন করা হয়। এ ধরনের অঞ্চলকেই তারা গ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে এসব কাজকে কেন্দ্র করে সেখানে আমাদের দেশের মতো লোকালয় বা সমাজ গড়ে উঠে না। পাশ্চাত্যের দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট উন্নত। যান্ত্রিক সভ্যতার প্রভাবে তাদের গ্রামাঞ্চলগুলোতেও আধুনিকতার ছোঁয়া রয়েছে। উন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড গুঁড়া দুধ উৎপাদনে শ্রেষ্ঠ। এসব উন্নত দেশের গ্রামগুলোতে উৎপাদিত ফসল ও গোবাদি পশুর দুধ বা মাংস ইত্যাদি উপাদান সংরক্ষণ ও যথাসময়ে নির্ধারিত স্থানে সরবরাহ করার যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা রয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থায়ও কোন অসুবিধা নেই। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন পাশ্চাত্যের এই উন্নত দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা পশ্চাৎপদ। গ্রামকে কেন্দ্র করেই আমাদের সমাজ গড়ে উঠেছে। শতকরা পঁচাশি জন লোক গ্রামে বাস করে। আমাদের দেশের অনেক গ্রাম এখনও বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ হওয়ার কারণে গ্রামের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে সারাদেশের মানুষ।

গ্রামীণ ঐতিহ্য

বাঙালীর কৃষ্টি কালচারের ঐতিহ্য হাজার বছরের। মূলত গ্রাম থেকেই নগরের সৃষ্টি। যে কারণে একটি দেশের ঐতিহ্য বহন করে গ্রামীণ পটভূমি। সে ঐতিহ্যই ছড়িয়ে পড়ে নগর থেকে নগরে। তবে সূত্রপাত কিন্তু সেই গ্রামেই। বাঙালী ঐতিহ্য ও গ্রামীণ সমাজ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলার ঐতিহ্যবাহী জারি গান, সারিগান, গাজীর গান, পালা গান, ভাটিয়ালী গান, যাত্রা গান বাঙালীর সূচনা লগ্ন থেকে গ্রামীণ সমাজ তার বুকে ধারণ করে আসছে। যেমন কি নগর কি গ্রাম সর্বত্র আজ সাম্যের এক উৎসবে রূপ নিয়েছে চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব।

দীর্ঘকাল ধরেই বাংলার বহু স্থানেই চৈত্রসংক্রান্তির মেলা বসে থাকে। তবে হিন্দু সম্প্রদায় যুগ যুগ ধরে এ ধরনের মেলা আয়োজন করে থাকে। এতে বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটি ও ধাতুর তৈরি বিভিন্ন ধরনের খেলনা, তৈজসপত্র, ফল-ফলাদি, মিষ্টি ইত্যাদি পাওয়া যায়। থাকত নানা ধরনের চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা। যেমন বায়োস্কোপ, সার্কাস, পুতুল নাচ, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদি। আবার বছরের শেষ দিনে শুভ বিদায় জানিয়ে বিভিন্ন বন্দনা, গান গাওয়া হয় আর বৈশাখের শুরুতে বর্ষকে বরণ করে নেয়ার প্রস্তুতি। দূর্বা-ঘাস, ডালা দিয়ে বরণ করে নেয়া হতো নতুন বছরকে। বিভিন্ন মেলায় শোভা পেত বৈশাখী জিনিসপত্র। সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রথা হচ্ছে হাল খাতা। ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনে হালখাতা চালু হলেও সবার মাঝেই তা নিয়ে উৎসাহ বিরাজমান।

এছাড়া খেলাধুলার মধ্যে হা ডু ডু, নৌকাবাইচ প্রভৃতি ও বাংলার ঐতিহ্যকে বহন করে। এসব ঐতিহ্যবাহী গান ও খেলা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভা-ারে মণি-মুক্তার সঙ্গে তুলনীয়। কবির সেই বিখ্যাত কবিতা আজও চির অমলিন-

‘আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন

মাটির তলায় এর ছড়ানো রতন’।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্রাম

আগে একটা সময় ছিল যখন গ্রামে বিকেল হলেই মাঠগুলো ভরে উঠতো কানায়। শিশু বৃদ্ধ বণিতা সবাই খেলার মাঠে নিজেদের মতো করে সময় কাটাতো। কেউ ব্যস্ত থাকতো খেলা নিয়ে কেউ বা খেলা দেখা নিয়ে আবার কেউ কেউ আড্ডায় মশগুল হয়ে যেত। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত জমজমাট এক দৃশ্য ছিল উপভোগ করার মতো। অবশ্য সে সময়ে এই বিকেলটুকু ছিল বিনোদনের অন্যতম মাত্রা। এখন বিনোদনের মাধ্যম অনেক সহজলভ্য হয়ে উঠাতে দিন দিন সেসব প্রযুক্তিতে বুঁদ হয়ে যাচ্ছে মানুষ। সে প্রভাব গ্রামেও রয়েছে। বিকেল বেলায় গ্রামের মাঠগুলো এখন আর খেলোয়াড়দের দখলে নেই। কিছু কিছু মানুষ বিক্ষিপ্ত আকারে মাঠের এপ্রান্তে কিংবা অপর প্রান্তে মোবাইল ফোনে আপন মনে সময় কাটাচ্ছে। নেই প্রাণবন্ত আড্ডা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশ এগুচ্ছে ঠিকই কিন্তু কেমন যেন এক কৃত্রিমতা চেপে ধরেছে। এর থেকে বের হয়ে আসা উচিত। প্রযুক্তির ভালটুকু গ্রহণ করে মন্দ থেকে দূরে থাকাটাই বুদ্ধিমানে কাজ।

তবে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় গ্রামীণ জন জীবনে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে। গ্রামের মানুষ এখন বহু ধরনের পেশায় নিজেদের যুক্ত করে জীবন বদলে দিচ্ছে। প্রত্যন্ত গ্রামেও চলে গেছে ব্যাংকের সেবা। উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছে গ্রামের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাও। গ্রাম মানেই খন আর কৃষি কাজ নয়। এক দশক আগেও বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির অবস্থা এখনকার মতো ততটা চাঙ্গা ছিল না। তখন শহরের অর্থনীতি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যে বিরাট পার্থক্য ছিল। অভাব, দুঃখ, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার, অজ্ঞতা, পশ্চাৎমুখী সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের অচলায়তন সৃষ্টি করে রেখেছিল। বর্তমানে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের গা ঝাড়া মনোভাব লক্ষ্য করা যায় খুব সহজেই। বলা যায়, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নবজাগরণ এসেছে। যার ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। এতে করে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে গেছে আগের তুলনায়। বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামের সাধারণ কৃষক শ্রেণির ভাগ্য বদলে যাচ্ছে খুব দ্রুত। কৃষি খাতে তো অবস্থা ভালই, এমনকি কৃষির বাইরেও গ্রামীণ অর্থনীতি বর্তমানে চমৎকার ভাল অবস্থায় রয়েছে। গ্রামীণ জনগণের মধ্যে এখন কৃষির পাশাপাশি ছোট ছোট শিল্প স্থাপনের প্রতি আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে।

স্রেফ কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন নয়, এর পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষের মাধ্যমে গ্রামের মানুষ তাদের ভাগ্যোন্নয়নে পুরোপুরি সচেষ্ট বলা যায়। আজকাল প্রায় প্রতিটি গ্রামেই হাঁস-মুরগির খামার, দুগ্ধ উৎপাদনকারী ডেইরি ফার্ম, মৎস্য চাষ প্রকল্পের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা যায়। এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ। আগে স্রেফ ধান পাট শাক-সবজি শস্য উৎপাদনের মধ্যেই গ্রামের মানুষ তার কর্মকা- সীমাবদ্ধ রাখতেন।

যেখানে বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে শুরু করে শহুরে জীবনের মতো উন্নত নানা সুযোগ-সুবিধা থাকছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে গ্রামীণ জীবন-যাপনে আধুনিকতার ছাপ ক্রমেই সুস্পষ্ট হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের চেহারাটাই বদলে যাচ্ছে খুব দ্রুত। এখন গ্রামের ছেলেমেয়েরা উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করে মেধা ও যোগ্যতার বলে জীবনে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তারা শহরের বড় বড় পদে চাকরি করছে। বড় বড় ব্যবসায় নিয়োজিত হচ্ছে। তারাও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করছে।

গ্রামের অর্থনীতির পরিবর্তনটি চোখে পড়ে বাজারের কোন মুদি দোকানে গেলেই। সেখানে এখন শুধু চাল, ডাল আর কেরোসিন তেলই নয়, বিক্রি হয় শ্যাম্পু, সুগন্ধি সাবানসহ প্রসাধন সামগ্রীও। গ্রামের মানুষ এখন আর কাঠ কয়লা দিয়ে দাঁত মাজে না, মাঝে টুথপেস্ট ব্রাশ দিয়ে কিংবা নিদেনপক্ষে টুথ পাউডার দিয়ে। চিপস্, কোল্ড ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস ফ্রুট ড্রিংকস-এমনকি মিনারেল ওয়াটারও পাওয়া যায় গ্রামের বাজারের দোকানে। বিভিন্ন বাড়িতে রয়েছে মোটরসাইকেল। মেয়েরাও অনেক গ্রামে সাইকেল চালিয়ে স্কুল কলেজে যায়। দেশের ১৩ কোটি মোবাইল ফোন গ্রাহকের বড় অংশ গ্রামের মানুষ। তাদের কেউ কেউ স্কাইপ ব্যবহার করতেও শিখে গেছে। বিদেশে থাকা স্বজনরা এখন আর টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করে নিজের গলার আওয়াজ পাঠায় না। গ্রামে কম শিক্ষিত অনেক তরুণ-তরুণী আজকাল নিয়মিত ফেসবুক চালায় তাদের ফেসবুক এ্যাকাউন্টে নিজের মতামত পোস্ট করে চমকে দেয়। গ্রামের মানুষ এখন ইন্টারনেট ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বড় গ্রাহক। প্রায় এক কোটি গ্রামবাসী কৃষকের আছে নিজস্ব ব্যাংক এ্যাকাউন্ট।

চিকিৎসা ক্ষেত্রেও এখন আর নিজ জেলার বাইরে খুব একটা যেতে হয় না। আধুনিক চিকিৎসার মান এখন ঘরের কাছেই মিলছে। বেড়েছে জায়গা জমির দাম। সহজ হয়েছে যোগাযোগ মাধ্যম। যে কারণে এখন মানুষ নিজ বাড়িতে যেতে আরও বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষি জমি কিছুটা কমে আসলেও প্রাকৃতিক শোভা বহনকারী গ্রাম এখনও রয়েছে। দিনে দিনে আবিষ্কার হয়েছে কম জায়গায় বেশি ফলনের চাষাবাদ। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল অফুরন্ত সৌন্দর্যে ভরপুর এক অপরূপ লীলাভূমি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সবুজ শ্যামলীমায় শোভিত আমাদের গ্রামাঞ্চলগুলো। আমাদের দেশের চালিকাশক্তির অন্যতম উৎস গ্রামাঞ্চল। সুতরাং এই গ্রামাঞ্চলের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি বজায় রাখাকে অবজ্ঞা করলে চলবে না। গ্রামে যে প্রাকৃতিক সম্পদ ও ঐশ্বর্য রয়েছে সেগুলোকে সঠিকভাব কাজে লাগাতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে চাষাবাদ, কতিপয় উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ, গ্রাম্য জনগণের একতাবদ্ধতা ও সরকারের সহযোগিতামূলক মনোভাবই পারে গ্রামীণ জীবনের হাসি আনন্দ ধরে রাখতে। আমাদেরও সচেতন হতে হবে গ্রামীণ পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখার প্রতি। যত্রতত্র স্থাপনা বা ইটভাটা না করে পরিকল্পনানুযায়ী করা উচিত। এখনও সুযোগ আছে সুন্দর পরিকল্পনার আওতায় গ্রামকে সাজানোর। আর এভাবেই ভালবাসা ও মমতায় ঘিরে থাকুক আমাদের গ্রাম।