১৮ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিরাপদ মাতৃত্ব

  • নাজনীন বেগম

২৮ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হলো ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস।’ মেয়েদের জীবনে ঘটনাবহুল, আকর্ষণীয়, আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক মাতৃত্বের মহিমা এক গৌরবময় অধ্যায়। সেই ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন দেখা মায়ের আদলে নিজেকে গড়ে তোলা প্রতিটি নারীর জীবনে এক চিরায়ত বোধ। বাস্তবের পটভূমিতে সেই স্বপ্নচয়ন যখন প্রতিদিনের জীবন প্রবাহের অনুবর্তী তখন এক অনন্য নারী সত্তা ভেতর থেকে উদ্দীপ্ত হয়। সন্তানকে গর্ভে ধারণ করার যে আনন্দঘন অনুভূতি সেটাও যে কোন মেয়ের জীবনকে ঐশ্বর্যময় করে তোলে। তেমন অতুলনীয় সম্পদের কোন নজির খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। নয় মাস নয়দিন জঠরে ধারণ করা সন্তানটি যখন পৃথিবীর আলো দেখে তেমন শুভক্ষণে মাও আলোকিত জগতের দ্বার উন্মোচন করেন। যে বিশ্ব শুধু সন্তান আর তার নিজের। কিন্তু তারও আগে যখন সন্তান জানান দেয় সে আসছে তার সমস্ত আকাক্সক্ষা আর সম্ভার নিয়ে তখন থেকে মায়েরও প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় নাড়ি ছেঁড়া ধনকে বরণ করার অদম্য বাসনায়। গর্ভকালীন সময়ে প্রতি মুহূর্তে একদিকে যেমন আনন্দ আর খুশির বন্যায় দেহ-মন পুলকিত হয় ঠিক অন্যভাবে শঙ্কা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও হৃদয় মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। একটি সুস্থ স্বাভাবিক সন্তানের মা হওয়ার প্রত্যাশা সব নারীর এক দুর্লভ স্বপ্ন। তাই মাতৃত্বকালীন প্রয়োজনীয় সময়গুলো পার করা যে কোন মেয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এমন অবস্থায় মাকে থাকতে হয় অনেক সাবধান, বিপদের ঝুঁকি এড়াতে ব্যক্তিক সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরী। কারণ এখনও মাতৃত্বকালীন সময়ে বিপণ্ণতার আবর্তে পড়া নারীদের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। রক্ষণশীল, পশ্চাদপদ সমাজের গতানুগতিক মূল্যবোধগুলো অর্ধাংশ এই গোষ্ঠীর সুরক্ষার প্রতিকূলে। মাতৃত্বকালীন সময় তো অনেক পরের ব্যাপার। একজন শিশু কন্যা সন্তান জন্ম থেকেই বহু বন্ধন জালে আবদ্ধ হয়ে বড় হতে থাকে। ক্ষ্ব্ধু পরিবার এবং বৃহত্তর সমাজ যে বেষ্টনী তৈরি করে সেখান থেকে কন্যা সন্তানটির নিজস্ব স্বাধীন বোধ আর অভিব্যক্তিও ভেতর থেকে সেভাবে সাড়া দেয় না। মানে পরিবার কিংবা সমাজ যা বিধিনিষেধ আরোপ করে কন্যা সন্তানের জন্য সেটা অবধারিত। সেটাকে মেনে চলাই ন্যায়সঙ্গত। এক সময় মেয়েদের বেশিরভাগ অংশই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে থাকা মেয়েরা সংসার-ধর্ম পালনের প্রস্তুতি নিতে নিতে কোন এক পর্যায়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। বিয়ে মানে একেবারে বাল্যবিয়ে। গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘরে ঘরে এমন রেওয়াজই ছিল প্রচলিত সংস্কার। তেমন দুঃসময় এখন না থাকলেও বাল্যবিয়ের কবল থেকে মেয়েরা আজ অবধি নিজেকে বের করে আনতে পারেনি। এটা শুধু বাংলাদেশ নয় সারাবিশ্বে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর এক অলিখিত সংস্কার। শিক্ষার আলো গ্রামবাংলার মেয়েদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লেও বাল্যবিয়ে নামক সামাজিক অভিশাপ আজও তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তবে এখানেও কিছু স্বপ্নপূরণের ইঙ্গিত ইতোমধ্যে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। শিক্ষার মতো আলোকিত জগতে পা রাখতে গিয়ে বালিকাদের যে মাত্রায় আত্মবিশ্বাস এবং সচেতনতার ভিত্তি দৃঢ় হচ্ছে সেখানে তারা নিজেরাই তাদের প্রতি অল্প বয়সে বিয়েটাকে ঠেকিয়ে দিতে শক্তি অর্জন করছে। বাল্যবিয়ে মানেই অকাল মাতৃত্ব যা কোন মেয়ের জীবনে সুখ-স্বপ্নের চাইতেও আশঙ্কা এবং ঝুঁকির পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। একজন বালিকা নিজেকেই পরিপূর্ণভাবে সামলাতে পারে না। মাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে তাকে দেখে রাখতে হয়। সেই অবোধ বালিকা কি করে তার অনাগত সন্তানের যথার্থ পরিচর্যায় নিজেকে নিবেদন করতে পারে? সেটা তার গর্ভেই হোক কিংবা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেও সন্তান লালন পালনের ক্ষেত্রেও হতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে উল্লেখ করা আছে বয়ঃসন্ধিকাল, বিয়ের উপযুক্ত সময় এবং সন্তান ধারণের যথার্থ নিয়ম-বিধি। শরীর এবং মনের পুরিপুষ্টতা যে কোন মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। কন্যা সন্তানের বেলায় তো সব থেকে বেশি। কারণ তাকে সন্তান ধারণ করে নিজেকে পূর্ণ করতে হয়। সুস্থ স্বাভাবিক সন্তান জন্ম দিয়ে পৃথিবীর আলো দেখা হয়। তার ওপর গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় পর্ব তো আছেই। এসব কিছুর জন্য একজন মেয়েকে পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিতে হয় শরীর এবং মন উভয় দিক থেকেই। এর ব্যত্যয় হলে ঝুঁকি কিংবা বিপদের আশঙ্কা বাড়া ছাড়া কোন উপায়ও থাকে না। তাই নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসে শুধু সুস্থ মা এবং শিশুর জীবন শঙ্কামুক্ত করাই নয় তার চেয়েও বেশি যথাসময়ে বিয়ে এবং মা হওয়ার ব্যাপারটিও বিশেষ বিবেচনায় আনতে হবে। বাল্যবিয়ে মানেই অকাল মাতৃত্ব এমন অভিশাপ যেন অপরিণত বালিকাদের জীবন বিঘ্ন আর বিপত্তির মুখে ফেলে দিতে না পারে। তেমন প্রতিজ্ঞাই হোক ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসের’ দীপ্ত অঙ্গীকার। এ ছাড়াও মনে রাখতে হবে দিবসটি মাত্র একদিনের নয়, প্রতিদিনের, অনুক্ষণের। সুতরাং মাতৃত্বকালীন সময়ে নিজেকে সুরক্ষা দেয়াও গর্ভকালীন মায়েদের বিশেষ দায়িত্ব। চারপাশের অতি নিকটজনদেরও অনেক কিছু করার আছে। প্রসূতি মায়েরা যাতে এমন কোন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে না পারে সেক্ষেত্রে তার প্রাণসংহারের মতো অবস্থয় পৌঁছাতে হয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে আজ মানুষের একান্ত কাছাকাছি। যার কারণে স্বাস্থ্যসেবাও অনেকটা অবারিত আর উন্মুক্ত। মাতৃত্বকালীন সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া এমন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তার ওপর প্রসূতি মায়ের পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ এবং বিশেষ সাবধানতায় সময়গুলো পার করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এসব ব্যাপারে সামান্য হেলা-ফেলা বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনা অস্বাভাবিক নয়। অদক্ষ কিংবা গ্রামগুঞ্জের অশিক্ষিত ধাত্রী দিয়ে কোনভাবেই প্রসব যন্ত্রণা সামলানো নয় কিংবা সন্তান ভূমিষ্ঠের মতো ঝুঁকিও নেয়া যাবে না। ধারে কাছের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনে নিয়ে যেতে হবে। সেখান থেকে আরও কোন বড় চিকিৎসালয়ের পরামর্শ আসলে সেটাও তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নিতে হবে। হাতের কাছে সম্ভাব্য সমস্ত নিরাপদ ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো খুবই জরুরী। প্রসূতি এবং তার সন্তান যাতে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে তাদের স্পর্শকাতর সময়গুলো পার করে নিতে পারে। একজন সুস্থ মাই পারে ভবিষ্যত প্রজন্মকে সুন্দর এবং স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে নিয়ে আসতে। এমন প্রত্যাশায় নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসের তাৎপর্যকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। সুস্থ মা এবং সুন্দর ফুটফুটে শিশু দেশের সব থেকে বড় সম্পদ।