১৪ জুন ২০১৯

পিকুর বুদ্ধি

জুবায়েদ সাহেবকে বেশ চিন্তিত লাগছে। অফিস সহকর্মী ইকবাল সাহেব কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন জুবায়েদ সাহেব?

-আর বলবেন না ভাই। পিকুকে নিয়ে একটু চিন্তায় আছি। ছেলেটা এভাবে চলতে থাকলে তো সমস্যা।

-ঠিক বুঝলাম না।

-আমার ছেলের কথা বলছিলাম আর কি। ওর ভাল না পিয়াস। আমি আর ওর মা ছোট থেকে আদর করে পিকু বলেই ডাকি। ওকে নিয়েই ভাবছি।

- কেন, কি হয়েছে?

- দিন দিন ছেলেটার ভিডিও গেম খেলার নেশা বেড়েই চলেছে। বাসায় পুরোটা সময় কম্পিউটার বা মোবাইলে গেম খেলতেই দেখি। কথা বলার সময় বা খাওয়ার সময়ও ওর একই কাজ। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার সময়ও নিজের মতো করে গেম খেলতে থাকে। এমন চলতে থাকলে তো অসামাজিক হয়ে যাবে ছেলেটা। আর পড়ালেখার যেমন ক্ষতি হবে, পাশাপাশি চোখ-কান এসবও নষ্ট হতে বেশিদিন বাকি নেই।

-হুম, বিষয়টা চিন্তারই দেখছি। আজকালকার ছেলেমেয়েদের এই মোবাইল বা কম্পিউটার গেম খেলার হার খুবই বেশি। এটা যে কতটা ক্ষতিকর সেটাও বুঝতে চায় না ওরা।

-বুঝবেই বা কিভাবে বলুন? বাবা-মা হিসেবে আমরাও তো সময় দিতে পারি না। এদিকে দালানকোঠায় ঘেরা এই শহরে খেলাধুলা করার মতো জায়গারও অভাব। অবসর সময়টা কাটাবে কিভাবে ওরা! দোষটা তো একেবারে ওদেরও নয়।

-তাও ঠিক। এক্ষেত্রে আমি একটা পরামর্শ দিতে পারি আপনাকে। ছেলেকে একটু অন্য পরিবেশে ঘুরিয়ে নিয়ে আসুন কয়েকদিনের জন্য। খোলামেলা পরিবেশে খেলাধুলা করার আনন্দটা উপভোগ করতে পারলে, ঐসব ভিডিও গেমের মোহ সহজেই কেটে যাবে।

বিষয়টা ভেবে দেখলেন জুবায়েদ সাহেব। সত্যিই তো ছেলেটা সবসময় ঘরবন্দী হয়ে থাকে। বাইরে গিয়ে খেলাধুলা করা বা ঘোরাফেরার সুযোগ নেই। তাই সময় কাটাতে ভিডিও গেমই খেলতে হয়। আর সেটাই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘরবন্দী পরিবেশ থেকে ওকে একটু খোলামেলা পরিবেশে নিয়ে গিয়ে মেশাতে হবে। এর জন্য সবচাইতে ভাল হয় গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলেই। খোলামেলা পরিবেশও পাবে, আবার খেলাধুলা করারও বেশ সুযোগ আছে। যেগুলো শারীরিক এবং মানসিক দুই ধরনের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। তাছাড়া পিকু কখনও নিজের গ্রামের বাড়িতে যায়নি। যাবেই বা কিভাবে! গত ছয়-সাত বছর যাবত তারাও তো কেউ যান না গ্রামে। বাবা-মা বেঁচে থাকার সময় ছুটিতে বাড়িতে যাওয়া হতো প্রতিবারই। এখন আর সে মায়ার টানও যে নেই।

রাতে বাড়ি যাওয়ার জন্য টিকেট কেটে বাসায় ফিরলেন জুবায়েদ সাহেব। সাতদিনের ছুটি নিয়ে এসেছেন তিনি অফিস থেকে। পরদিন সকালেই ট্রেন। এদিকে অফিস থেকে ফিরে মিসেস রাবেয়াও সব ব্যাগপত্র গোছগাছ করে ফেলেছেন।

পরদিন সকালে ট্রেনে রওনা হলেন সবাই। পিকু প্রথমে যেতে চাইছিল না। গ্রামে গেলে ইন্টারনেট দিয়ে অনেক গেম খেলতে পারবে না সে। তাছাড়া বিদ্যুতেরও সমস্যা গ্রামে। তাই মোবাইল চার্জ করে মোবাইলে গেম খেলতেও পারবে না সব সময়। কিন্তু বাবা-মায়ের জোরের জন্য আসতেই হলো ওকে। তবে গ্রামের মেঠোপথে এসেই কিছুটা মন খারাপ কেটে গেল পিকুর। রাস্তার ধারে ওর বয়সী কিছু ছেলে মিলে মজা করে কি যেন একটা খেলছে। ঈশারায় দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল পিকু, ওরা কি খেলছে বাবা?

হাসি মুখে জবাব দিলেন জুবায়েদ সাহেব, ওটা লাটিম খেলা। গোলাকার কাঠের টুকরোয় সুতা পেঁচিয়ে হাত দিয়ে ছুঁড়ে মারা হয়। এরপর সেটা ঘুরতে থাকে।

বাড়িতে ঢুকতেই চাচা-চাচি, কাজিনরা সবাই একসঙ্গে যেন এসে ঘিরে ধরল পিকুদের। অনেকদিন পর তারা গ্রামে এসেছেন। এরমধ্যে পিকু তো এবারই প্রথম গ্রামে এসেছে। পিকুকে ঘিরেই যেন সব উত্তেজনা আর আয়োজন। হাতমুখ ধোয়ার পর পিকুকে পিঠা খেতে দিলেন বড় চাচি। খাওয়া শেষে মোবাইল হাতে নিয়ে গেম খেলতে শুরু করল পিকু। এমন সময় সমবয়সী দুজন ছেলে এসে পরিচিত হলো ওর সঙ্গে। সম্পর্কে ওরা পিকুর কাজিন হয়। বলল, মোবাইলে একা একা গেম তো অনেক খেলতে পারবে। আজ বরং চল আমরা মাঠে গিয়ে ক্রিকেট খেলি।

-ঢাকায় ক্রিকেট খেলার মতো অত বড় মাঠ নেই। তাই বাস্তবে কখনও ক্রিকেট খেলিনি আমি। শুধুমাত্র মোবাইল আর কম্পিউটারেই ক্রিকেট খেলতে পারি।

-মাঠে গিয়ে ক্রিকেট খেললে আরও বেশি ভাল লাগবে তোমার। চল মাঠে গিয়ে ক্রিকেট খেলি। ভয় নেই, খেলতে খেলতে শেখা হয়ে যাবে তোমার।

মাঠে গিয়ে অবাক হলো পিকু। স্টেডিয়ামের মতো বিশাল বড় সবুজ ঘাসে ঢাকা খোলা মাঠ। সবাই মিলে ক্রিকেট খেলছে মাঠে। পিকুও খেলতে নেমে গেল ওদের সঙ্গে। খুব একটা খেলতে না পারলেও ভীষণ আনন্দ লাগছে তার। টিভিতে দেখা ক্রিকেটারদের মতোই মনে হচ্ছে নিজেকে। বাস্তবে ক্রিকেট খেলা তো কম্পিউটারে ক্রিকেট খেলার চাইতেও বেশি আনন্দের।

সন্ধ্যার সময় বাড়িতে ফিরল পিকু আর ওর কাজিন রাশেদ ও রবিন। এরপর যে যার মতো ঘরে গিয়ে পড়তে বসল ওরা। এদিকে পড়া না থাকায় মোবাইলে গেম খেলতে বসল পিকু। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করল বাইরে একটু হৈচৈ হচ্ছে। উঠানে এসে দেখল রাশেদ আর রবিন ঘরের বাইরে এসেছে। দুজনেরই পড়া শেষ। অন্ধকার উঠানে এখন দুজন মিলে জোনাকি পোকা ধরার চেষ্টা করছে। জোনাকি পোকা ধরাও যে এক রকম খেলা হতে পারে ভাবতেই পারেনি পিকু। জোনাকি পোকার আলো কখনও দেখেওনি সে। শুধু বইয়ের পাতায় পড়েছিল। ঘরের ভেতর মোবাইল রেখে এলো পিকু। রাশেদ আর রবিনের সঙ্গে সেও জোনাকি পোকা নিয়ে মেতে উঠল আনমনেই। এভাবেই এটা সেটা খেলতে খেলতেই সাতদিন কেটে গেল পিকুর। মোবাইলে গেম খেলার কথা যেন একবারও মনে আসেনি ওর।

ঢাকায় ফেরার সময় কিছুটা মন খারাপ হলো পিকুর। বাবাকে বলল, আমি যদি সবসময় গ্রামে থাকতাম বাবা! তাহলেই তো চমৎকার সব খেলা রোজ খেলতে পারতাম। সত্যিই খুব আনন্দের এই খেলাগুলো। সবাই মিলে খেলা যায়। আর বাসায় বসে কম্পিউটার বা মোবাইলে একাই খেলতে হয় আমাকে।

-এই তো বুঝতে পেরেছ বাবা। মোবাইল বা কম্পিউটার গেমের চাইতে সত্যিকারের খেলাধুলাই বেশি আনন্দের। শরীর ও মন দুয়ের জন্যই ভাল। তবে পুরোপুরি তোমার দোষ দেব না। আমরা কেউ সেভাবে সময় দিতে পারি না তোমাকে। তাই ভিডিও গেম খেলেই সময় কাটাও তুমি। হ্যাঁ, ঐ গেমগুলোও খেলা যাবে। কিন্তু কম কম খেলতে হবে। যেন এর কোন ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে তোমার জীবনে। এখন থেকে তোমাকে প্রতিবার ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে নিয়ে আসব। যেন প্রতিবার এসে আরও নতুন নতুন খেলা শিখতে পার।

বাবার কথায় মন ভাল হয়ে গেল পিকুর। বলল, তোমার কথামতোই চলব বাবা। সামনের ছুটিতেও গ্রামে আসব আমরা। রাশেদ আর রবিন ভাইয়ার সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াব আমি।

সবার থেকে বিদায় নিলেন জুবায়েদ সাহেব। মনে মনে ভীষণ খুশি হয়েছেন তিনি। অবশেষে সত্যিই ছেলের সুবুদ্ধি হয়েছে। ছেলেকে নিয়ে যে চিন্তায় ছিলেন, তা থেকে মুক্ত হলেন ।

তৃতীয় বর্ষ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

অলঙ্করণ : আইয়ুব আল আমিন