১২ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং ঢাকা শহরের যানবাহন

  • প্রকৌশলী নাজমুল আহসান শেখ

প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতি, বিশেষ করে গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী তথ্য-প্রযুক্তি, টেলি কমিউনিকেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির অকল্পনীয় উদ্ভাবন এবং বর্তমান সরকারের প্রযুক্তি বান্ধবনীতির ফসল আমরা যোগাযোগ খাতে দেখতে পাচ্ছি; যা এখন ঢাকাসহ বাংলাদেশেও প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান! মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তা আডাম স্মিথ ১৭৭২ সালে যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে ‘সরকারী ব্যবস্থাপনা বা নীতি নয়, মুক্তবাজার অর্থনীতির অদৃশ্যহাতই নির্ণয় করবে কোন একটি দেশ কি আমদানি বা রফতানি করবে।’

প্রায় আড়াই শতক পর, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই যুক্তি শুধু আমদানি-রফতানি নয়, অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে আজও সমানভাবে প্রযোজ্য! এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির অদৃশ্য হাত, সরকারী দূরদর্শী নীতির সহায়তায় বাংলাদেশ বিশেষত ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। উবার, পাঠাওয়ের মতো গাড়ি এবং মোটরসাইকেল নেটওয়ার্ক সার্ভিস ইতোমধ্যেই ঢাকার প্রধান রাস্তা থেকে রিকশা সরিয়ে দিতে শুরু করেছে।

‘স্মার্ট সার্ভিস’ এই জন্যই বলা হয় কারণ মানুষ নয় প্রযুক্তিই উবার জাতীয় চাহিদাভিত্তিক সার্ভিসকে তার নিকটতম যাত্রীর সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, এই সার্ভিস চালককে তার পরবর্তী গন্তব্যের কাছে অপেক্ষমাণ যাত্রীর সঙ্গেও অগ্রিম যোগাযোগ ঘটায়। যার ফলে একজন যাত্রী নামার পরপরই উবার নিকটতম স্থানে অপেক্ষমাণ যাত্রীকে তুলতে সক্ষম হয়। এর ফলে সময় অপচয়ের পরিমাণ কমে যায়। পরিবহনের ক্ষেত্রে শতকরা কতক্ষণ সময় একটি গাড়ি বা সিট (বাস বা ট্রেনের ক্ষেত্রে) খালি থাকে তা হচ্ছে অপচয়। এই অপচয় যত কম হয় সার্ভিসের দক্ষতা ততই বৃদ্ধি পায়, এর ফলে চালক এবং যাত্রী দুই পক্ষই তার সুফল ভোগ করেন।

প্রথম প্রথম আমার কাছে সম্পূর্ণ ধারণাটাই অকল্পনীয় এবং বিস্ময়কর মনে হতো! আমার কাছে মনে হতো, আমাদের প্রিয় ঢাকা শহর কিংবা বাংলাদেশ’ যেখানে রাস্তা এবং ভবনের ঠিকানার ক্ষেত্রে কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়নি, সেখানে কি এই ধরনের স্মার্ট ট্যাক্সি সার্ভিস কোন দিন কাজ করতে পারবে! ঢাকা শহরকে খুঁজে বের করতে উবার বেশিদিন নেয়নি। আমার বোধোহয় অবাক হবার মতো আরও অনেক কিছু বাকি ছিল! যখন দেখলাম ঢাকার মতো অপরিকল্পিত এবং বিশৃঙ্খল (লোনলি প্লানেট-এর মতে ‘সংগঠিত বিশৃঙ্খল শহর (organi“ed chaotic city) শহরে উবার সার্ভিস চালু হয়েছে! শুধু এই সার্ভিস চালুই নয়, এর সেবা প্রশংসার যোগ্য এবং মূল্যও যথেষ্ট সহনীয়!

যেমন ধরা যাক, দুপুর তিনটার দিকে আপনি রিকশায় বেইলী রোড থেকে এলিফ্যান্ট রোড বাটা সিগন্যাল যাবেন। আপনাকে তিন তিন বার রিকশা দরদাম এবং বদলানো ছাড়াও প্রায় আশি থেকে নব্বই টাকা ভাড়া গুনতে হবে। একই সময়ে উবার জাতীয় সার্ভিসে আপনার ভাড়া লাগবে ১২০ টাকার মতো। এসি গাড়ির আরাম, রোদ-বৃষ্টি মুক্ত, নিরাপদ, দ্রুত আর ধুলাবালি মুক্ত ‘ডোর টু ডোর’ যাত্রার জন্য শতকরা ৩০ ভাগ অতিরিক্ত মূল্য অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। আর আপনার সঙ্গে স্যুটকেস বা মালামাল থাকলে তো কথাই নেই। ধরা যাক, আপনি একজন বা দু’জন এর পরিবর্তে চারজনের পরিবার নিয়ে যাচ্ছেন। তা হলে দুই রিকশা আপনাকে নিতেই হবে। দুই রিকশার তুলনায় মধ্য বা দীর্ঘ দূরত্বে উবার জাতীয় সেবা অবশ্যই সাশ্রয়ী। সঙ্গে আরও পাচ্ছেন এসি গাড়ির আরাম, রোদ-বৃষ্টি মুক্ত, নিরাপদ, দ্রুত আর ধুলাবালি মুক্ত ‘ডোর টু ডোর’ যাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য। যারা একা চলাফেরা করেন তারা প্রশ্ন করতে পারেন, আমি পরিবার পাব কই, আর আমার অতিরিক্ত ৩০ ভাগ ভাড়া দেয়ার ক্ষমতা নেই। তাহলে আপনার জন্য রয়েছে সাশ্রয়ী মোটরসাইকেল সার্ভিস।

চাহিদার সঙ্গে ভাড়া নির্ণয়ের সুফল : দুপুর তিনটা সময়টা উল্লেখ করলাম কারণ ঢাকা শহরে রিকশা, সিএনজি ভাড়ার মতো উবার ভাড়াও চাহিদা এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। পার্থক্যটা হচ্ছে রিকশা বা সিএনজি ভাড়া কখনও কমে না, বরং বৃদ্ধি পায়’ বিশেষত খুব ভোরে বা বেশি রাতে। আগে রাত ১০টার পর নিরাপদে ঘরে ফেরা দুশ্চিন্তার বড় কারণ ছিল, প্রথমত আপনাকে যানবাহন পাওয়ার দুশ্চিন্তা ব্যতীত বেশি ভাড়া দিতে হতো। এই ধরনের চাহিদাভিত্তিক সেবা চালু হওয়ার ফলে আপনি নিরাপদেই যে কোন সময় বাড়ি ফিরতে পারেন সাশ্রয়ে! কারণ রাত যত বাড়তে থাকে, চাহিদা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের চাহিদাভিত্তিক সেবার মূল্যও কমে যায়! ফলে আপনি দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে বাড়ি ফিরতে পারেন। ‘ডোর টু ডোর’ যাত্রার ফলে এখন আর আপনাকে রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রিক্সা বা সিএনজি খুঁজতে হয় না। নিরাপদে আপনার বাসায় বসেই এই সেবা পেতে পারেন।

যাত্রী এবং চালক কর্তৃক পারস্পরিক মূল্যায়ন : এক সময় ছিল সিএনজি চালকদের দৌরাত্ম্য। কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত তাদের অভদ্র আচরণ এবং মিটারের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা ছিল নিয়মিত ব্যাপার। তাদের সঙ্গে কথা বলাও ছিল রীতিমতো বিরক্তিকর, কারণ তারা যাত্রীদের অর্থের বিনিময়ে সেবা প্রদানের চেয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করাতেই ছিল সচেষ্ট। তাই উবারের মতো চাহিদাভিত্তিক সেবা চালু হওয়াতে সিএনজির যাত্রীরা হয়েছেন সবচেয়ে উপকৃত। সিএনজির ভাড়াতেই তারা এসি গাড়ির আরাম, রোদ-বৃষ্টি মুক্ত, নিরাপদ, দ্রুত আর ধুলাবালিমুক্ত ‘ডোর টু ডোর’ সেবার পাশাপাশি মালামাল নেয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গাও পাচ্ছেন। আর সেই সঙ্গে দেখতে পান এক সময়ের দাপটওয়ালা সিএনজি চালকদের অসহায় অবস্থা আর যাত্রীর আশায় তীর্থের কাকের মতো তাদের করুণ চাহনি!

চাহিদাভিত্তিক এই যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে বাস বা পরিবহন ধর্মঘটে বিকল্প জরুরী পরিবহন ব্যবস্থা। বাসের তুলনায় এই সেবা ব্যয়বহুল হলেও, বিপদে প্রয়োজনীয় গন্তব্যে যাওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনেকেই সাময়িকভাবে এই সেবা নিয়ে থাকেন। একই এলাকার অফিস যাত্রীদের অনেকেই এখন চারজন মিলে উবারে করেই অফিসে যাতায়াত করেন, ফলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমে যায়, অর্থ এবং জ্বালানি তেলেরও সাশ্রয় হয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে পার্কিংয়ের সমস্যা প্রকট। তাই দেখা যায়, এখন অনেকেই বিয়ে বা অন্য সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য এই সেবা গ্রহণ করে থাকেন। এতে পার্কিং সমস্যা অনেকাংশে লাঘব হয়। আর ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদেরও গভীর রাত পর্যন্ত ডিউটি করতে হয় না।

একইভাবে মানুষ এয়ারপোর্ট বা বাস টার্মিনালে যাওয়ার সময় এই সেবা নেয়ার ফলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা অর্ধেক হয়ে যেতে পারে। কারণ, আপনাকে নামিয়ে সে আরেকজন যাত্রী তুলবে।

স্মার্ট কার্ড এবং জাতীয় পরিচয়পত্র, ফিঙ্গার প্রিন্ট এবং মোবাইল ফোনের সংযুক্তিকরণের সুফল নিরাপদ যাত্রা : বর্তমান সরকার কিছু অত্যন্ত দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছেন যা আমাদের অজান্তেই আমাদের জীবনকে করেছে নিরাপদ। যেমন ‘স্মার্ট কার্ড’, আমাদের যে কোন অপরিচিত মানুষ বা চালককে শনাক্ত করতে সাহায্য করে। মোবাইল ফোনের সিমের সঙ্গে ফিঙ্গার প্রিন্ট সংযুক্ত হওয়ার ফলে এখন চালক এবং যাত্রী উভয়েই নিরাপদ বোধ করেন। তাই বাংলাদেশে এখনও উবার-এ কোন বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এখন পর্যন্ত ঘটেনি। অথচ এক সময় সিএনজির সঙ্গে প্রায়ই ছিনতাই আর মলম পার্টির উৎপাতের কথা প্রতিনিয়ত শোনা যেত!

এই সেবার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে এরই মধ্যে বাংলাদেশে হাজার হাজার স্ব নিযুক্ত বা সেলফ এমপ্লয়েড কর্মসংস্থান হয়েছে এবং প্রতিদিনই এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর ‘পাঠাও’ মোটরসাইকেল সার্ভিসের ফলেও হাজার হাজার তরুণ দেশেই খুঁজে পেয়েছে সম্মানজনকভাবে অর্থ উপার্জনের পথ। এসব যুবক এখন লাখ লাখ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়া বা সৌদি আরবে গিয়ে মনবেতর জীবন-যাপন করার বদলে দেশেই কাজ করাকে অনেক শ্রেয় এবং সম্মানের বলে মনে করছেন।

স্মার্ট ফোনের ব্যাপক প্রচলন এবং এই ধরনের সার্ভিসের প্রচার রিক্সা এবং সিএনজিকে শহরের প্রাণকেন্দ্র বা মূল সড়ক থেকে দূরে সরিয়ে দেবে নিঃসন্দেহে। এই ধরনের সেবা অনুমোদন এবং সহজতর করার ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রার সংযোজন হয়েছে যার রয়েছে বহুমুখী উপকারিতা। এই ব্যবস্থাকে আরও জনপ্রিয় করা এবং উন্নত করার জন্য উবারের মতো সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের রয়েছে চালকদের নিরাপদ ড্রাইভিং এবং উন্নত সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া, যাতে এই সেবা প্রদানকারীদের সিএনজি চালকদের মতো ভাগ্যবরণ করতে না হয়! এই ধরনের নতুন প্রতিযোগিতার ফলে সিএনজি চালকগণ ‘ও ভাই’ নামক সংস্থার মাধ্যমে যাত্রী সেবা দেয়ার চেষ্টা করছেন যা অবশ্যই মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার ইতিবাচক দিক।

লেখক : সদস্য কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

(Victory1971@gmail.com)

নির্বাচিত সংবাদ