১৬ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মনের রাধা আজ বাধা মানে না গো...

মনের রাধা আজ  বাধা মানে  না গো...
  • বৃষ্টিতে ভিজে বর্ষা বন্দনা

মোরসালিন মিজান ॥ আসছে আষাঢ় মাস, মন তাই ভাবছে-/কি হয়! কি হয়! কি জানি কি হয়...। বাংলা গানের অনন্য সাধারণ শিল্পী আরতি মুখোপাধ্যায়, হ্যাঁ, সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। বৈশাখ এবং জ্যৈষ্ঠ ভালভাবেই পার করেছিলেন তিনি। আষাঢ়ে এসে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান। শনিবার একই রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা গেল বর্ষা উৎসবের আয়োজকদের মধ্যে। তখন আষাঢ়ের প্রথম সূর্য কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে। বৃষ্টি নামি নামি। তবে কি পন্ড হবে বর্ষাবরণ অনুষ্ঠান? নাকি শুধু শুধু দুশ্চিন্তা? এভাবে কিছু সময়ের দোলাচল। সিদ্ধান্তহীনতা। এবং অতঃপর তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই অনুষ্ঠান চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন আয়োজকরা। নবীনা বর্ষার জলে ভিজতে ভিজতে শিল্পীরা গাইলেন। আবৃত্তি করলেন। বাদ গেল না নাচও। পিচ্ছিল মঞ্চে ময়ূরের মতো নেচে দেখালেন শিল্পীরা। সেতারের মতো বাজল বৃষ্টি। জানান দিল- বর্ষা এসেছে। ষড় ঋতুর বাংলাদেশে আষাঢ় ও শ্রাবণ এ দুই মাস বর্ষা কাল। প্রথম মাসের প্রথম দিনে শনিবার প্রিয় ঋতুকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেন রাজধানীর সংস্কৃতিকর্মীরা। পৃথক পৃথক স্থানে বর্ষা উৎসবের আয়োজন করে উদীচী ও সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী। বাংলা একাডেমির খোলা প্রাঙ্গণে মঞ্চ সাজায় উদীচী। সকাল ৭টার কিছু আগে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নারীরা মেঘ রং শাড়িতে সুন্দর সেজে এসেছেন। ছেলেরা পরেছেন পাঞ্জাবি। কেউ মঞ্চের সামনে বসেছেন। কেউ আবার দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলছেন। এরই এক পর্যায়ে বেজে ওঠে সেতার। মুহূর্তেই পরিবেশটা আরও মিষ্টি আরও প্রিয় হয়ে ধরা দেয়। সেতারে বর্ষা উৎসবের শুরু করেন ইবাদুল হক সৈকত। প্রায় ২৫ মিনিট ধরে বাজে মেঘমল্লার। তাতেই বুঝি ডাক পেয়ে যায় বৃষ্টি। নেমে পড়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এ অবস্থায় অনুষ্ঠান ঘোষণার দায়িত্বে থাকা কংকন নাগ কিছুটা হাল ধরার মতো করে বলেন, আমরা খুব সম্ভবত সিক্ত হব। পরে তিনি মঞ্চে ডেকে নেন উদীচীর সঙ্গীত দলকে। সম্মেলক কণ্ঠে তারা গেয়ে যান: হৃদয়-যমুনা আজ কূল জানে না গো/মনের রাধা আজ বাধা মানে না গো...। গানের সঙ্গে যোগ হয়েছিল চমৎকার নৃত্যায়োজন। পরবর্তী গানগুলোর বেশিরভাগই ছিল একক। এদিন একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী সেজুঁতি বড়ুয়া, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রি, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, নাহিয়ান দুরদানা সূচী, মায়েশা সুলতানা উর্বী, মুনমুন খান, রবিউল হাসান, মারুফ ইসলাম ও অনিকেত আচার্য। সকলেই নিজের পছন্দের গানে বর্ষা বন্দনা করেন। আষাঢ়ের রূপ, মানুষের মনের গতি সুরে সুরে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। অনুষ্ঠানটিকে বর্ণাঢ্য করে তুলে নৃত্যের পরিবেশনা। নৃত্য নিয়ে মঞ্চে ছিলেন স্পন্দন, স্বপ্নবীণা শিল্পকলা বিদ্যালয় ও উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদের শিল্পীরা। অনুষ্ঠান চলাকালেই নেমেছিল বাদল ধারা। বৃষ্টির চেনা গন্ধের সঙ্গে ভেসে আসছিল বেলি ফুলের ঘ্রাণ। খোঁপায় করে কাঁচা এ ফুল নিয়ে এসেছিলেন তরুণীরা। অনুষ্ঠান উপভোগ করার পাশাপাশি তারা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। অন্যরা একে অন্যের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলেন। চলছিল গল্প আড্ডা। দেখে মনে হচ্ছিল, বর্ষাও কোন না কোন অর্থে মিলনের ঋতু। কাছাকাছি সময়ে চারুকলার বকুল তলায় বর্ষা উৎসবের আয়োজন করে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী। অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টার কিছু পরে। এখানে প্রবেশ করতেই বকুল ফুলের ঘ্রাণ এসে নাকে লাগল। বৃষ্টি ভেজা নরম মাটিতে বকুল বিছানো। গাছে তারও বেশি। আর এর ঠিক নিচে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। চলছে বর্ষা বন্দনা। নৃত্যজনের দুই শিল্পী তখন নাচছিলেন। ‘পাগলা হাওয়ার বাদল- দিনে’ গানের সঙ্গে চমৎকার নাচ। এটি শেষ হতে না হতেই তুমল বৃষ্টি। কিন্তু এক মিনিটও চিন্তিত মনে হলো না আয়োজক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইটকে। বরং তিনি বললেন, এটা বৈরী পরিবেশ নয়। এটাই প্রকৃতি। এটাই তো বর্ষা। বলতে বলতেই মঞ্চ স্থানান্তর করে পাশের ঘোষণা কক্ষে নিয়ে গেলেন তিনি। সেখান থেকে ভেসে এলো সূক্ষ্ম একটি কণ্ঠ। প্রিয়াঙ্কা গোপ নজরুল থেকে গাইলেন- মেঘের হিন্দোলা দেয় পুব-হাওয়াতে দোলা।/কে দুলিবি এ-দোলায় আয় আয় ওরে কাজ-ভোলা...। গান হচ্ছে। সেইসঙ্গে বৃষ্টি। নতুন এবং অদ্ভুত একটা ফিল দেয়। পাশের ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে অনেকেই উপভোগ করলেন এই গান। এমন বৃষ্টি। বৃষ্টিতে ভিজেছিলেন জনপ্রিয় শিল্পী শামা রহমানও। ভিজতে ভিজতেই রবীন্দ্রনাথ থেকে গাইলেন: মেঘের পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে।/আমায় কেন বসিয়ে রাখ একা দ্বারের পাশে...। কণ্ঠে আহা কী জাদু! যেন মধুমাখা। অনুষ্ঠানে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে বহ্নিশিখাসহ কয়েকটি দল। আর লোকগানে মাতিয়ে রাখে স্বভূমি নামের একটি দল। কবিতার ভাষায়ও বর্ণনা করা হয় বর্ষাকে। নির্মলেন্দু গুণের অসাধারণ একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান মাসকুর-এ- সাত্তার কল্লোল। তবে কাকলি সেই সব সময়ের মতোই ‘মেঘবালিকা’ নিয়ে আসেন। কিন্তু সব হচ্ছিল। কিন্তু নাচ? কেমন যেন অপূর্ণতা। ঠিক তখন বৃষ্টি একটু কমলে মূল মঞ্চে ফিরেন শিল্পীরা। বেশ কয়েকটি দল নাচের মুদ্রায় বর্ষা বন্দনা করেন। অনুষ্ঠানে আরও ছিল বর্ষা নিয়ে কথা। স্কুল শিক্ষার্থীদের হাতে বৃক্ষের চারা তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামান। সব মিলিয়ে মনে রাখার মতো একটি দিন। বৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে এমন বর্ষা উৎসব সত্যি কম দেখা গেছে।