১৮ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সন্তানকে দায়িত্বশীল হতে শেখান

  • প্রত্যাশা নয়

তানভির আহমেদ ॥ ফেসবুকের নিউজফিডে আজকাল একটা পোস্ট খুব দেখা যায়; যে কোন পরীক্ষায় বাবা-মায়ের প্রত্যাশানুযায়ী ফলাফল করতে না পেরে অভিমানে আত্মহত্যা করে ফেলা একটি ছেলের সুইসাইড নোটের কিছু ছবি। জীবনের প্রতি কতটা ক্ষোভ আর অসন্তোষ থাকলে কেউ অল্প বয়সে আত্মহননকে সব যন্ত্রণার সমাধান বলে ভেবে নিতে পারে? জীবনের মূল্য এত কম এই ছেলেমেয়েগুলোর কাছে? নাকি এর দায় খানিকটা বাবা-মা, বড় ভাইবোনদের কাঁধেও বর্তায়?

প্রত্যাশার চাপ দেয়া হচ্ছে কীভাবে?

বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েদের মনস্তত্ত্ব বড়রা কেউ বোঝে না, অথচ তারা সবাই-ই কিন্তু সে বয়সটাকে পার করেই আসে! তাহলে প্যারেন্টিং এর কোন জায়গাটিতে ভুল থেকে যায়? অতিরিক্ত প্রত্যাশা? ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা? প্রতিযোগিতা আর শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ? কিছু কথা বলার আছে এখানে আমার।

শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের যেমনটাই হোক না কেন, বাবা-মা, বড় ভাইবোনদের একটি কথা মাথায় রাখতে হবে যে, ‘পড়াশোনা কখনই কোন প্রতিযোগিতা নয়’। পড়াশোনা হবে পরম আনন্দের আর ভালবাসার। সেখানে প্রতিযোগিতা কেন আসতে যাবে? প্রতিযোগিতা হতে পারে জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার জন্য। কতটা আত্মউন্নয়ন জীবনে ঘটানো গেল, প্রতিযোগিতা হতে পারে সেটা নিয়ে।

আর জীবনযুদ্ধের জয়তো কখনও কোন গ্রেড পয়েন্টে মাপা যায় না। তাহলে কেন শুধু শুধু সন্তানকে তথাকথিত ভাল ফলাফলের প্রত্যাশায় একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিচ্ছেন? মানছি যে যুগের চাহিদা এখন এরকমই। কিন্তু একটা-দু’টো পাবলিক পরীক্ষায় খুব ভাল রেজাল্ট করে ফেলাটাই তো শেষ কথা নয়! জীবনের আরও অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকে। ভাল ফলাফল বা প্রত্যাশিত ফলাফলের আশায় প্রতিযোগিতায় আটকে থাকতে থাকতে যে সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রস্তুতি নেয়ার কথা ভুলেই যাচ্ছেন, তা কি খেয়াল করেছেন কখনও?

একটা সময়ে আমাদের সমাজে ‘লেখাপড়া করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হলে জীবনটাই বৃথা’ এটা প্রায় প্রতিষ্ঠিতই ছিল। কিন্তু দিন বদলেছে তো। এখন তো কাজের প্রচুর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আর সেসব ক্ষেত্রে কাজ করে মানুষ সফলও হচ্ছে! তাহলে কেন ছাঁচে আবদ্ধ হয়ে পথচলা? নিজেদের প্রত্যাশার ঝাঁপি সন্তানের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে বরং তাকে তার প্যাশন খুঁজে পেতে সাহায্য করুন না! প্যাশনটাকে কাজে লাগিয়ে জীবনে কী করে সফল হওয়া যায়, তার প্রস্তুতি তাকে নিতে দিন। বন্ধু হয়ে পাশে থেকে, পিঠ চাপড়ে তাকে বোঝান জীবনের প্ল্যান থাকতে হয় অনেক রকমের। প্ল্যান এ-তে ব্যর্থ হলে প্ল্যান বি নিয়ে কাজ করতে হবে। প্ল্যান বি-তে না হলে প্ল্যান সি, প্ল্যান ডি এমনকি প্ল্যান জেড পর্যন্ত তৈরি করে রাখতে হবে! এটাইতো জীবনের প্র্যাক্টিক্যাল দিক! মুষড়ে পড়ার তো কোন কারণ নেই। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনেই কিছু ধাপ আসে, যেখানে হতাশা আর ক্ষোভ ছাড়া আর কিছুই থাকে না। কিন্তু সেগুলোকে পা দিয়ে মাড়িয়ে সামনে তো এগিয়ে যেতে হয় সব শক্তি নিয়ে! সে শক্তি মা-বাবারা ছাড়া আর কে দিতে পারে, বলুন তো? তা না করে সন্তানকে তার ব্যর্থতা নিয়ে বারবার খুঁচিয়ে তুলে কি কোন লাভ হবে? বোঝার বয়স থেকে তাকে জীবনের প্র্যাক্টিক্যাল বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিন না। জীবন কত মূল্যবান আর জীবনকে এত মূল্যবান করে তুলতে বাবা-মায়ের কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, সেটুকুও তাকে বুঝতে দিন। ব্যর্থতাকে বারবার সামনে তুলে এনে কেন তাকে কষ্ট দেবেন? গুছিয়ে নিয়ে সামনে যাওয়ার শক্তিটুকু তাকে এনে দিন।

আখেরে মিষ্টি ফল নিশ্চয়ই পাবেন। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের ডিজাইন আলাদা আলাদা, জীবনের পরিকল্পনা আলাদা আলাদা। সে পরিকল্পনায় যেন কোন খুঁত না থেকে যায়, সেদিকে মনোনিবেশ করুন। প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিয়ে আর প্রত্যাশার ভার চাপিয়ে দিয়ে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যত আপনি আশা করতে পারেন না। এভাবে কি পারিবারিক সুস্থতা বজায় রাখতে পারা সম্ভব?

দু’-চারটে পাবলিক পরীক্ষায় সোনালি-রুপালি ফলাফল করে কী লাভ, যদি আপনার সন্তান জীবনযুদ্ধেই ফেইল করে বসে? কাজেই সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যত পরিকল্পনার দিকে মন দিন আর তাকে সবদিক থেকে প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করুন। প্রতিযোগিতা ‘জিপিএ ফাইভ’ এর নয়, প্রতিযোগিতা করুন জীবন গঠনের। ব্যর্থতা কিংবা অভিমানে জীবনটাকেই শেষ করে দেয়াটা কতখানি নির্বুদ্ধিতা, তাও তাকে বুঝতে দিন। প্রত্যাশার চাপ না দিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করে সন্তানকেও দায়িত্বশীল হতে শেখান। হ্যাপি প্যারেন্টিং।