২২ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উত্তাল নদীর বুকে দৃষ্টি নন্দন পদ্মা সেতুর অবয়ব

উত্তাল নদীর বুকে দৃষ্টি নন্দন পদ্মা সেতুর অবয়ব

নিজস্ব সংবাদদাতা, মাদারীপুর ॥ উত্তাল নদীর বুকে দৃষ্টি নন্দন পদ্মা সেতুর অবয়ব। অসাধ্য সাধিত হওয়ায় যাত্রীদের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানোর সুযোগ্য উত্তরসুরি দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা। অধরা স্বপ্ন বাস্তবায়নের এ দৃশ্য দেখে গর্বে বুক ভরে ওঠে। কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌপথে বিভিন্ন নৌযানে পারাপারের সময় যাত্রীদের মুখে শোনা গেলো পদ্মা সেতু সম্পর্কে তাদের অনুভূতির কথা।

মেহেদী হাসান। চাকুরী করেন গাজীপুরের একটি বেসরকারি ট্রেক্সটাইল মিলে। স্ত্রী-সন্তান ও ভাইদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। উত্তাল পদ্মা নদীর মাঝেই তার নজর পড়লো নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর দিকে। পরিবারের সদস্যদের দেখাচ্ছেন গড়ে উঠা পদ্মা সেতুর অবয়ব। তার মতোই চলন্ত লঞ্চের সব যাত্রীর নজর পদ্মা সেতুর দিকে। ঈদ উপলক্ষে দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ যাত্রীর আসা-যাওয়ার পথে ঈদে অফুরন্ত আনন্দ নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। আসা যাওয়ার পথে একে অপরের কাছে নৌযান সম্পৃক্তদের কাছে প্রশ্ন করছেন আগামী ঈদে কি পদ্মা সেতু দিয়ে পার হতে পারবো ? না কি নৌযানে যেতে হবে। কবে পার হবো সেতু দিয়ে। আর যেন তাড়া সইছে না যাত্রীদের। এমনই এক মধুময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে এবারের ঈদ যাত্রা করলেন কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌপথ হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা। তাদের প্রায় সকলের মুখেই শোনা গেলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা। স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে শেখ হাসিনাই এর সবটুকু কৃতিত্বের একমাত্র দাবীদার। এমন অনেক কথা শোনা গেলো কলেজছাত্রী আইরিন আক্তার, মেহেদী হাসান, আবদুল্লাহ, প্রবাসী লিয়াকত হোসেন, প্রদ্যুৎ সরকার, একেএম নাসিরুল হক, জাকির হোসেন, শিবশঙ্কর রবিদাস, মাসুম বিল্লাহসহ অনেক লঞ্চযাত্রীর কণ্ঠে।

লঞ্চ ও ফেরিতে এ নৌপথ পারাপারের সময় যাত্রীদের সাথে আলাপ করে পদ্মা সেতু নিয়ে তাদের স্বপ্নের কথা জানা গেছে, ফেরি যাত্রী মাসুম আবদুল্লাহ প্রাইভেট কারে ভাই-ভাবী ২ ভাতিজাকে নিয়ে গল্প করতে করতে জাজিরায় টোল প্লাজা ঘুরে এসেছেন আগাম স্বপ্ন পূরণে। বায়িং ব্যবসায়ী মাসুম স্বপ্ন দেখেন একদিন গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে বসেই ব্যবসা করবেন। তার মতো এক এক যাত্রীর মুখে এক এক গল্প। পটুয়াখালীর যাত্রী পাপিয়া আক্তার বিউটি স্বপ্ন দেখেন পদ্মা সেতুর সাথে রেললাইন হলে মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টায় বাড়ি থেকে ঢাকায় গিয়ে অফিস করবেন। এমনই হাজারো স্বপ্ন ডানা মেলছে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের সাথে সাথে। এ পথে আসা যাওয়ার সময় লাখো যাত্রীর স্বপ্ন ও আলোচনার স্বাক্ষী এখন পদ্মা নদী ও এপথের নৌযানগুলো। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো ১৩ স্প্যান ও জেগে উঠা প্রায় সবকটি পিলার যেন কথা বলছে যাত্রীদের সাথে। তারা পদ্মা পাড়ি দেয়ার সময় হাজারো ভোগান্তি ভুলে গিয়ে দেখে নিচ্ছেন গড়ে উঠা পিলার ও স্প্যানসহ পদ্মা সেতুর বিশাল কর্মযজ্ঞ। কেউ তুলছেন সেলফি। কেউ আবার অপলক তাকিয়ে আছেন সেতুর দিকে। সবার মুখে মুখে পদ্মা সেতু কেন্দ্রিক গল্প। সবমিলিয়ে এ এক ভিন্নমাত্রার ঈদ যাত্রা পদ্মা নদী ও প্রিয় সেতুটিকে ঘিরে। ফেরি, লঞ্চ ও স্পীডবোট চালকদের কাছে কতই না প্রশ্ন এসকল যাত্রীর। কবে শেষ হবে পদ্মা সেতুর কাজ ? আগামী বছর কি সেতু দিয়ে পার হতে পারবো এমন কৌতুহলী হাজারো প্রশ্ন। শিশু কিশোরদের চোখে-মুখেও হাজারো প্রশ্ন। ঢাকা থেকে পদ্মা নদীতে আসার আগে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট পর্যন্ত নির্মাণাধীন ৬ লেন এক্সপ্রেস হাইওয়ে এবং পদ্মা নদী পার হয়ে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার মধ্যদিয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত অপরূপ সৌন্দর্যখচিত এক্সপ্রেস হাইওয়ে যেন যাত্রা পথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

লঞ্চ যাত্রী প্রবাসী লিয়াকত হোসেন বলেন, ‘আমার বাড়ি মাওয়া ঘাটের কাছে। আমরা এখন স্বপ্ন দেখি পদ্মা সেতু হলে আমাদের এলাকায় এক আমূল পরিবর্তনের। আমরা আশা করেছিলাম আরো আগেই সেতু নির্মাণ শেষ হয়ে যাবে। তবে বর্তমানে সেতুর কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। আমরা চাই আরো দ্রুতগতিতে কাজ শেষ করে আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু যেন সম্পন্ন করা হয়। আর এ জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই।’ তাঁর কারণেই আজ পদ্মা সেতু হচ্ছে।’

ফেরি যাত্রী ব্যবসায়ী মাসুম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমরা দক্ষিণাঞ্চলের যারা কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকা থাকি ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে বাড়ি ফিরতে ঘাটে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। পদ্মার পাড়ে আসলেই ফেরি, লঞ্চ ও অন্য নৌযানের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পদ্মা সেতুই আমাদের দক্ষিণবঙ্গের মানুষের ভোগান্তি লাঘবের একমাত্র মাধ্যম হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ শেষ হলে আমাদের শুধু দূর্ভোগই শেষ হবে না-মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। রাজধানী ঢাকার উপর মানুষের চাপ কমবে। আমার বাড়ি গোপালগঞ্জ। কর্মসংস্থানের জন্য পরিবার পরিজন নিয়ে ঢাকায় থাকি। বিভিন্ন উৎসবে বাড়ি যাই। পদ্মা সেতু হলে আমরা আর ঢাকা থাকবো না। বাড়ি থেকে ঢাকা এসে ব্যবসা করবো। আগে আমরা ভাবতাম পদ্মা সেতু কবে হবে। আর বর্তমানে দেখছি পদ্মা সেতুর সকল পিলার উঠে গেছে। স্প্যানও বসানো হচ্ছে। এখন ভাবি কবে পদ্মা সেতুতে গাড়ি নিয়ে উঠবো। আজই তো আমরা যখন ঢাকা থেকে গাড়ি নিয়ে আসছি তখন পদ্মা সেতুর টোলপ্লাজা দেখে আমরা পরিবারের সকলে আলোচনা করেছি আর কিছুদিন পরে আমরাও পদ্মা সেতুর টোল দিয়ে সেতুর উপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাবো। তাই কবে পদ্মা সেতু হবে এখন আর এ স্বপ্ন দেখিনা-এখন স্বপ্ন দেখি কবে পদ্মা সেতুর উপরে উঠবো।

লঞ্চযাত্রী চাকুরীজীবী কালকিনির মেহেদী হাসান বলেন, ‘পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। লঞ্চে দাঁড়িয়ে দৃশ্যমান পদ্মা সেতু দেখছি আর অবাক হচ্ছি। আর কিছুদিন পরেই আমাদের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণ হবে। ঘাটে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করা ও ঘাটে চরম ভোগান্তির হাত থেকে নিস্তার পাবো। পদ্মা সেতু হলে দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়ন হবে, সোনার বাংলা বাস্তবায়নের আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে। সেতুর নির্মাণ কাজ দেখে মনে হচ্ছে আগামী বছর ঈদে হয়তো সেতুর ওপর দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটাই আমরা আশা করছি।’

কে-টাইপ ফেরি কর্নফুলীর মাস্টার ইনচার্জ শাহীন আলম বলেন, ‘দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য পদ্মা সেতু এখন প্রাণের চেয়েও প্রিয় হয়ে গেছে। বিভিন্ন উৎসবে যাত্রী ও যানবাহনের অনেক চাপ থাকে এই নৌপথে। আবহাওয়া দূর্যোগপূর্ন হলে যাত্রীদের অনেক বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আর তখন ফেরির উপর চাপও অনেক বেশি পড়ে। আমরা কখনো কখনো যানবাহন রেখে শুধুমাত্র যাত্রী পারাপার করি। ফেরিতে পারাপারের সময় দেখি যাত্রীদের নজর শুধুমাত্র নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর দিকেই। নদী পারাপারের পুরো সময়টা পদ্মা সেতু নিয়েই চলে তাদের আলোচনা। যাত্রীরা আমাদের প্রশ্ন করে আপনারা তো নদীতে সব সময় থাকেন ভাই আর কতদিন লাগবে পদ্মা সেতু শেষ হতে।’

শিবচর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আল-নোমান বলেন, ‘পদ্মা সেতুকে ঘিরে মানুষের যে স্বপ্ন আসলে এর পরিধি ব্যাপক। তাদের এই স্বপ্ন অনেক আগের। এক সময় মানুষ হয়তো ভাবতো এই প্রমত্তা পদ্মা নদীর উপর দিয়ে একদিন হয়তো সেতু হবে। মানুষ এখন এই পদ্মা পাড়ি দেওয়ার সময় পদ্মা সেতুর কর্মযজ্ঞ দেখে ভাবে তাদের স্বপ্নের সফল পরিসমাপ্তি বা বাস্তবায়ন শুধু সময়ের ব্যাপার।’