১৬ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাইবার ট্রাইব্যুনালের আদেশে ওসি মোয়াজ্জেম জেলে

 সাইবার ট্রাইব্যুনালের আদেশে ওসি মোয়াজ্জেম জেলে
  • জামিন আবেদন নামঞ্জুর

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দীর ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়ানোর মামলায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ পাঠানো হয়েছে। সোমবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তাকে একটি প্রিজন ভ্যানে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে দুপুরে পুরান ঢাকার বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেনের আদালতে হাজির করা হয়। পরে শুনানি শেষে দুপুর দুইটা ৩৫ মিনিটে আলোচিত এ পুলিশ কর্মকর্তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। একইসঙ্গে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য পরবর্তী তারিখ আগামী ৩০ জুন নির্ধারণ করে আদালত।

বেলা ২ টা ২০ মিনিটে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের কড়া নিরাপত্তায় সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এ সময় তিনি মাথা নিচু করে এজলাসের ভেতর প্রবেশ করেন। আদালতের এজলাসে তোলার পর উপস্থিত আইনজীবীরা মোয়াজ্জেমের হাতে হাতকড়া পরানোর দাবি তোলেন। এরপর পরিদর্শক মোয়াজ্জেম ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেন। পরে তাকে আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয়। জনাকীর্ণ আদালতে তখন শুনানি শুরু হয়। এদিকে সকাল থেকে আদালত চত্বরে পুলিশ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা ভিড় করতে থাকেন। প্রিজন ভ্যানে করে মোয়াজ্জেমকে দুপুর সাড়ে ১২টার পর ঢাকার আদালত চত্বরে আনা হয়। তাকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পরে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সেখানে শুনানির শুরুতে মামলার বাদী সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সাইয়েদুল হক আদালতকে বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম আইনের সেবক হয়েও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাননি। আদালত যেদিন তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে, তারপর তিনি সরাসরি আপনার আদালতে হাজির হতে পারতেন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে পারতেন। কিন্তু ওসি মোয়াজ্জেম তা না করে পালিয়েছিলেন। ব্যারিস্টার সাইয়েদুল হক বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম যে ঘটনা ঘটিয়েছেন তা পুলিশ বাহিনীর জন্য কলঙ্ক। এদিকে জামিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম শামীম আদালতকে বলেন, মামলাটি আজ ওয়ারেন্ট তামিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। সে মোতাবেক ফেনীর সোনাগাজী থানা পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করেছে। আসামি ওসি মোয়াজ্জেম ভিডিওটি নিজের মোবাইলে ধারণ করে তা শেয়ারইট অথবা হোয়াটসএ্যাপের মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটিয়েছেন। তাই আমরা জামিনের বিরোধিতা করেছি। তার জামিন নামঞ্জুর করা হোক। এরপর আদালত ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠায়। মোয়াজ্জেমের পক্ষে আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ আদালতকে বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আইনের আশ্রয় নেয়ার জন্য তার মক্কেল হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ না দিয়ে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছে। ফারুক আহম্মেদ আরও জানান, ওসি মোয়াজ্জেম পলাতক ছিলেন না। পত্রিকা মারফত তিনি জানতে পারেন, তার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এ জন্য আইনের আশ্রয় নেয়ার জন্য হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশে ছিলেন। পালিয়ে বিদেশে যাননি। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। এই মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ৩০ জুন নতুন দিন ঠিক করে ট্রাইব্যুনাল। এর আগে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে আসামি মোয়াজ্জেমকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। এরপর তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।

আমাদের কোর্ট রিপোর্টার জানান, বেলা ২টার দিকে সিএমএম কোর্টের হাজতখানা থেকে আবার মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনে প্রিজনভ্যানে করে আনা হয়। এরপর তাকে হাতকড়া ছাড়াই প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে লিফটে করে মহানগর দায়রা জজ আদালত ভবনের ছয়তলায় সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে ওঠানো হয়। মোয়াজ্জেমকে আদালতে ওঠানোর পর তিনি কাঠগড়ার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন তার চোখে কাল সানগ্লাস, মুখে দাঁড়ি, পরনে প্যান্ট এবং গায়ে পোলো শার্ট ছিল। তাকে কিছুটা বিচলিত দেখাচ্ছিল। ট্রাইব্যুনালের ভেতরেও পুলিশ তাকে ঘিরে ছিল। বিচারক আগে থেকেই এজলাসে ছিলেন। তাই মোয়াজ্জেমকে কাঠগড়ায় ওঠানোর দুই মিনিট পরই এ মামলার শুনানি শুরু হয়। প্রথমে আদালতের পেশকার শামীম আল মামুন আসামিকে কাঠগড়ায় উঠতে বললে সে কাঠগড়ায় উঠে দাঁড়ান।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে যা ছিল ॥ একই আদালত গত ২৭ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এ মামলায় দাখিলকতৃ তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ ও আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ওইদিনই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা মামলার ১২৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাদীর দাখিলকৃত মামলায় দুইজন সাক্ষী এবং ঘটনা সংশ্লিষ্টে ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। মামলার ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া সংক্রান্তে বিশেষজ্ঞ মতামত এবং দালিলিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়েছে যে, সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন গত ২৭ মার্চ বেলা ১টা ১৮ ঘটিকার সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল (ঝধসংঁহম এধষধীু অ৮+) দ্বারা থানায় আগত ভিকটিম নুসরাত জাহান রাফির বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করেন, যাতে ভিকটিমের ব্যক্তিগত তথ্য পরিচিতি প্রকাশ পায়। এ অপরাধে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়। এছাড়া ধারণকৃত ভিডিও গত ৮ এপ্রিল শেয়ারইট এ্যাপসের মাধ্যমে সজল নামক ডিভাইসে প্রেরণ করে প্রচার করায় একই আইনের ২৯ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়। অন্যদিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যক্তিগত মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে তা ডিজিটাল বিন্যাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ায় সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় ও আইন শৃঙ্খলার অবনতির উপক্রম করায় একই আইনের ৩১ ধারায় অপরাধ করেছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভিকটিম নুসরাত অল্প বয়সের একটি মেয়ে এং মাদ্রাসার ছাত্রী ছিলেন। এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওসি মোয়াজ্জেমের আরও কৌশলী হয়ে নারী ও শিশুবান্ধব উপায়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন ছিল। সে একজন সু-শৃঙ্খল পুলিশ বাহিনীর সদস্য হয়েও নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভিকটিম নুসরাতের শ্লীলতাহানির ঘটনার বক্তব্য ভিডিও ধারণ ও প্রচার করে অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। যার ফলে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে।

মামলায় যে সকল ধারায় ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন আমলে গ্রহণ করা হয়েছে ওই সকল ধারায় সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদ-ের বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাদী। তিনি বলেন, ৩টি ধারার প্রত্যেকটিতে ৫ বছর করে ১৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এর আগে গত ১৫ এপ্রিল বাদী এ মামলা করলে ট্রাইব্যুনাল পিবিআইকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়। ওসি মোয়াজ্জেম বর্তমানে ফেনী জেলা পুলিশের অস্ত্র শাখায় কর্মরত। নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার পর এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ উঠলে তাকে সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাইবার ট্রাইব্যুনাল পরোয়ানা জারির ২০ দিন পর রবিবার বিকেলে ঢাকার হাইকোর্ট এলাকা থেকে ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় তিন সপ্তাহ লাপাত্তা থাকার পর আগাম জামিন চাইতে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন তিনি। আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে নিয়ে সোনাগাজী থানার পুলিশের একটি দল রাজধানী শাহবাগ থানা এসেছিল। সোমবার সকালে শাহবাগ থানা পুলিশের কাছ থেকে পরিদর্শক মোয়াজ্জেমের দায়িত্ব বুঝে নেয় সোনাগাজী থানা পুলিশ।