১৯ জুন ২০১৯

সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার

দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১৩ জুন বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বাজেট উপস্থাপন করলেন। এ জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানাই। একই সঙ্গে নতুন অর্থমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করে জাতীয় সংসদসহ সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছেন। তবে আগে যা কখনও ঘটেনি, অসুস্থ শরীরে তিনি দীর্ঘ বাজেটের সম্পূর্ণ অংশ পড়তে পারেননি। এই পর্যায়ে অর্থমন্ত্রীর অসমাপ্ত কাজটি গভীর মমতায় সমাপ্ত করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাননীয় স্পীকারের অনুমতিক্রমে প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে বাজেটের অসম্পূর্ণ অংশটুকু পাঠ শেষ করলে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। সংসদ কক্ষজুড়ে তখন উৎসবমুখর পরিবেশ। সংসদের ইতিহাসে এটাও বোধহয় প্রথম। এই রকম ব্যতিক্রমী ঘটনা আগে ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। হাস্যমুখে সাবলীল ভঙ্গিতে অসুস্থ অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে বাজেট পাঠ সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব নিজ হাতে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহমর্মিতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। টেলিভিশনের পর্দায় দেশবাসী এই দৃশ্য দেখে অভিভূত ও মুগ্ধ হয়েছেন। এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিছক দায়িত্ব পালন ছিল না, ছিল অসুস্থ ও অসহায় সহকর্মীর প্রতি অপার ¯েœহের প্রকাশ। এ যেন চিরন্তন মাতৃ চরিত্র দর্শন।

শুরুতেই বলেছি নতুন অর্থমন্ত্রী দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ বাজেট ঘোষণা করেছেন। টাকার হিসাবে যা পাঁচ কোটি তেইশ লাখ এক শ’ নব্বই কোটি। এত টাকা, চট করে মাথায়ও ঢোকে না, মনেও রাখতে পারি না। মধ্যবিত্ত চরিত্র বড়জোর হাজার, লাখ, কোটি টাকা পর্যন্ত হিসাব করতে পারে। অথচ অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ, বড় ব্যবসায়ীরা কী অনায়াসেই না বাজেট পেশ হওয়ার পরে গড় গড় করে ত্রুটি-বিচ্যুতি। ভাল-মন্দ নিয়ে কথা বলেন। সংবাদপত্রে মন্তব্য লেখা শুরু করেন। টক শো মাতিয়ে তোলেন। সাধারণ মানুষ অর্থনীতির ফর্মুলা কম বোঝেন। তারা ভাবেন চাল-ডাল-তেল-নুন নিয়ে। ভাবেন অন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়া ও কমার কথা। ভাবেন ব্যাংকে জমানো সামান্য টাকা আর সঞ্চয়পত্রের ওপর বাজেটের প্রভাব কতটুকু পড়ল, এসব নিয়ে। বছরান্তে জুন মাসে বাজেট পেশের সময় এলেই সাধারণ মানুষ খানিকটা দুশ্চিন্তায় পড়েন। এটা সত্য। তারা ভাবেন কী হয়, কী হয়! সম্বল মোর কম্বল খানার ওপর বাজেটের উটকো টান পড়বে না তো! ঘর ভাড়া, যাতায়াত ব্যয় বাড়বে না তো! চিকিৎসা খরচ, ওষুধের দাম নাগালের ভেতর থাকবে তো! এ রকম নিত্যদিনের বিষয় নিয়েই তাদের ভাবনার জগত। অর্থনীতি বা বাজেট বোঝেন এমন দু’-একজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। সংবাদপত্রও খুঁটিয়ে পড়েছি। না, এবারের বাজেট সাধারণ মানুষকে বিরূপ অবস্থায় ফেলবে এমন কথা তেমন শোনা যায়নি। বাজেটের নেতিবাচক প্রভাবে কাউকে কাছা খুলে পালাতে হবে এমন কথা কেউ বলেননি। তার মানে নতুন অর্থমন্ত্রীর পেশ করা বাজেটে দুশ্চিন্তার তেমন কারণ নেই। নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামাল সফল হিসেবে অভিনন্দন পেতেই পারেন। তবে উৎসে কর দ্বিগুণ করায় সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকরা কিছুুটা হলেও দুশ্চিতায় পড়তে পারেন বলে ধারণা করা যেতে পারে। এর ফলে গ্রাহকরা আগের চেয়ে কম মুনাফা পাবেন। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি দুঃসংবাদ হতে পারে। কিন্তু এখনই তো সব চূড়ান্ত হয়ে যায়নি। সংসদে বাজেট নিয়ে কথাবার্তা হবে, আলোচনা-পর্যালোচনা হবে। তারপর ভাল কিছু পাওয়া যাবেÑ এটাই হোক প্রত্যাশা। তবে এটা নিঃসন্দেহে ভাবা যায় যে, সঞ্চয়পত্রের ব্যাপারে গ্রাহক বা সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হোক তেমন সিদ্ধান্ত সরকার নেবে না। তা ছাড়া শেষ ভরসা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো রয়েছেন।

দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বরাদ্দ অর্থ নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা প্রকাশ্যেই চলে এসেছে। এ ব্যাপারে সাংস্কৃতিক সংগঠন, সংস্কৃতি কর্মীরা সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন পর্যন্ত করে ফেলেছেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রয়োজনে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। সংস্কৃতি কর্মীরা বলছেন সংস্কৃতি চর্চার জন্য বরাদ্দ বাজেট পূর্বের তুলনায় অনেক কমিয়ে দেয়া সমীচীন হয়নি। বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক ও জঙ্গীবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে বরাদ্দ আগের তুলনায় বাড়ানোর দাবি করেছেন তারা। নতুন অর্থমন্ত্রীর দেয়া মূল বাজেটের অন্তত এক শতাংশ সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ করার কথা বলা হয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে।

দাবির যৌক্তিকতা যে আছে তা বোধহয় খোদ অর্থমন্ত্রীও অস্বীকার করবেন না। মুক্তির আন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সবল ভূমিকার কথা প্রগতিপন্থীরা এক বাক্যে স্বীকার করবেন। মানবিক সমাজ গঠনে আগামী দিনেও নিশ্চয় সাংস্কৃতিক কর্মকা-কে পাশ কাটানো যাবে না।

তবে কেন এমন হলো তবে কেন এমন হয়। হয়ত কোথাও বোঝার ভুল অথবা দুয়ে দুয়ে চার না হওয়ার সক্ষমতাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় বলে শুনেছি। এটাও একটা কারণ হতে পারে। ব্যাপারটাকে আগে থেকে গুরুত্ব দেয়া যেতে পারত হয়ত। আমার মনে হয় সময় পার হয়ে যায়নি। সাংস্কৃতিক নেতারা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন। সেখানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী উপস্থিত থাকলে ভাল।

আমি বাজেট বিশেষজ্ঞ নই, অর্থনীতির জটিল সূত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণেও পারদর্শী নই। তবে বাজেটের যে বিষয়গুলো সাধারণ মানুষ ও সমানে প্রভাব ফেলে তা বোধহয় বুঝি। যেমন এবারের পেশকৃত বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ আশাতীতভাবে বেশি হওয়ায় যারযারনাই খুশী হয়েছি। সরকারের চরম নিন্দুকেরাও এ ব্যাপারে খুব একটা কথা বলছেন না। তবে রান্নায় লবণ কম অথবা বেশি ধরার মতো জ্ঞানপাপী লোক এ সমাজে একেবারেই কি নেই! তাদের কথাকে ধর্তব্যের মধ্যে না আনাই ভাল। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাজেটে দশ হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বরাদ্দের ফলে অসংখ্য অসহায়ের মুখে যে হাসি ফুটেছে তা শেখ হাসিনার প্রতি সৃষ্টিকর্তার অশেষ আশীর্বাদ বৈকি! সামাজিক সুরক্ষা খাতের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তা প্রসূত। ১৯৯৮ সালে তিনিই প্রথম বাজেটে বিষয়টিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। শুরু হয়েছিল মাসে ১০০ টাকা করে ভাতা দিয়ে। এখন সেটা মাসে ৪০০ টাকা। ভাতা প্রাপ্তের সংখ্যাও বেড়েছে অনেক গুণ।

সামাজিক সুরক্ষা খাতের আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার, বয়স্ক ভাতাভোগীয় সংখ্যা ৪০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪৪ লাখ, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা ভোগীর সংখ্যা ১৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১৭ লাখ, অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ভাতাভোগী ১০ লাখ থেকে ১৫.৪৫ লাখ, প্রতিবন্ধী ছাত্রদের উপবৃত্তির সংখ্যা ৯০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ইত্যাদি। খতিয়ান দিতে গেলে পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যাবে। শুধু ভাতাভোগীর সংখ্যাই বাড়েনি, বেড়েছে অর্থের পরিমাণও। মোট বাজেটের যা ১৪.২১ শতাংশ। আগেই বলেছি আগের বছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে যা ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি। গণমাধ্যমের সূত্র থেকে জেনেছি যে, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রণোদনার আওতায় এখন দেশের সাড়ে তিন কোটি প্রান্তিক মানুষ। ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনার হাতে প্রোথিত বীজ আজ সার্থক মহীরুহ হয়ে উঠেছে।

আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্তদের মাঝে মানবিক বাংলাদেশ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির কাজটি এখন খুবই জরুরী। বাঙালী জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতির পিতার জীবন দর্শন, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দর্শন, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি শুভ বিষয় সম্পর্কে সচেতন ও যথার্থ শিক্ষিত করাকেও ‘সোনালি যুদ্ধ’র আওতায় আনতে হবে। পেটে ভাত, পরনে কাপড়, মাথার ওপর ছাউনি ইত্যাদির পাশাপাশি সমানভাবে বাড়াতে হবে মনোজগতের উন্নতি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন সফলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গড়ে উঠুক এক অগ্রসর বাঙালী জাতি। তবেই বলা সার্থক হবে ‘সময় এখন আমাদের।’ সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার।

লেখক : নাট্য ব্যক্তিত্ব এবং আহ্বায়ক সম্প্রীতি বাংলাদেশ