১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৭১ এর এই দিনে ॥ সৈয়দ নজরুল ইসলামের চার পূর্বশর্ত ॥ ১৯ জুন, ১৯৭১

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ১৯ জুন দিনটি ছিল শনিবার। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বাস্তবসম্মত, নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে বিশ্বাসী বলে সংঘাত ও রক্তপাতে আগ্রহী নন। বিনা রক্তপাতে যাতে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়, সে জন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম চারটি পূর্বশর্ত দিয়েছেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামের চারটি শর্ত হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বিনাশর্তে মুক্তি, বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানী সমস্ত সৈন্যদের অপসারণ, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি এবং বিগত ২৩ বছরের লুন্ঠিত অর্থসহ বর্তমান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান। এই চার দফার ভিত্তিতে রাজনৈতিক সমাধান হলে স্থায়ী ফল পাওয়া যাবে বলে বাঙালী জাতি বিশ্বাস করে। বাঙালী জাতি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যে জীবন মরণ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক সমাধান সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হলে স্থায়ী ফল বা শান্তি আসতে পারে না। এই দিন কুমিল্লায় মুক্তিযোদ্ধারা মন্দভাগের কাছে পাকবাহিনীর এক প্লাটুন সৈন্যকে এ্যামবুশ করে। এতে পাকবাহিনীর ৯ জন নিহত হয় এবং বাকি সেনারা মন্দভাগ গ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর চৌদ্দগ্রাম ঘাঁটির ওপর পাকবাহিনীর দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য লাকসাম ও ফেনীর দিক থেকে প্রবল আক্রমণ চালায়। দিনব্যাপী যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা চৌদ্দগ্রাম ঘাঁটি পরিত্যাগ করে। এ যুদ্ধে পাকবাহিনীর ২০০ জন হতাহত হয়। অপরদিকে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও চারজন আহত হয়। কুমিল্লা জেলার মিয়াবাজারে বাংলাদেশ বাহিনী হানাদার পাকসৈন্যদের ক্যাম্পে আক্রমণ চালান। বাংলাদেশ বাহিনী এই আক্রমণে বোমা, মেশিনগান, রকেট নিক্ষেপ করেন। উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে প্রায় ৫০ জন পাকসৈন্য নিহত হয় এবং ১৮ জন আহত হয়। লালমাইয়ে বাংলাদেশ বাহিনী গেরিলা তৎপরতা চালিয়ে বিদ্যুৎ লাইনের একটি পাইলন ও ডিনামাইট নিয়ে নিকটবর্তী রেল সেতু উড়িয়ে দিয়েছেন। হানাদার বাহিনী এই যুদ্ধে কামান ও মর্টার ব্যবহার করে। চট্টগ্রামে চাঁদগাজী মুক্তিযোদ্ধা ঘাঁটির ওপর পাকবাহিনী হামলা চালায়। দুটি পদাতিক বাহিনীর ব্যাটালিয়ন পিছন দিক থেকে মুহুরী নদী দিয়ে স্পীডবোটযোগে একটি কোম্পানি ও পাকিস্তানীদের রিয়ার হেড কোয়ার্টার থেকে আরেক দল আর্টিলারি, মর্টার ও অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সাহায্যে ত্রিমুখী আক্রমণ চালায়। এই সংঘর্ষে মুক্তিবাহিনী ক্ষতি স্বীকার করলেও পাকসেনাদের ১৫০ জন নিহত ও অনেক আহত হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের চাঁদগাজী অবস্থান ত্যাগ করে পিছু হটে এবং পাকহানাদাররা চাঁদগাজী দখল করে নেয়। মুক্তিবাহিনী বড়পুঞ্জি সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন রবের নেতৃত্বে এক কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা থানায় পাকবাহিনীর সীমান্ত ঘাঁটি লাঠিটিলা আক্রমণ করে। তুমুল যুদ্ধের পর লাঠিটিলা মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। এ যুদ্ধে চারজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়। অপরদিকে পাকসেনাবাহিনীর ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের একজন হাবিলদার ও একজন সিপাহী মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে। এতে মুক্তিযোদ্ধারা অনেক অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করে। ঢাকার সামরিক গবর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খান করাচীতে বলেন, পাকিস্তান জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব খাঁটি পাকিস্তানী উদ্বাস্তুকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, দুষ্কৃতকারীদের (মুক্তিযোদ্ধা) ধ্বংসাত্মক কাজের ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল লাইনের চারটি প্রধান সেতুর ক্ষতি সাধিত হয়েছে। সেতুগুলো মেরামত ও পুনঃনির্মাণের কাজ শেষ হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ আবার চালু হবে। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাত করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ প্রসঙ্গে পরামর্শ দেন। অধ্যাপক গোলাম আযম রাওয়ালপিন্ডিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, পাকিস্তান শুধু টিকেই থাকবে না, শক্তিশালীও হবে। তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষা করার বিকল্প কিছু ছিল না। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন আসানসোলে এক জনসভায় বলেন, বাঙালী শরণার্থীরা অবরুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের নয়, শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরতে আগ্রহী। ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী বাংলাদেশের শরণার্থী সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৯ লাখ ২৩ হাজার ৪৩৯ জন। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত আবদুস সামাদ আজাদ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘ এক মাস ধরে সফরের পর মাত্র কয়েক দিন আগে বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে ফিরে এসেছেন। আবদুস সামাদ আজাদ গিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শান্তিকামী মানুষ ও সরকারের কাছে বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদারদের ব্যাপক গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও বর্বরতার করুণ চিত্রটি তুলে ধরতে এবং দেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদারদের উৎখাতের জন্য বাংলাদেশের মানুষ আজ যে মরণপণ যুদ্ধে নেমেছে তার প্রতি সক্রিয় সহানুভূতি ও সমর্থন আদায় করতে। আবদুস সামাদ আজাদ বিশ্বশান্তি সম্মেলনের বুদাপেস্ট অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে এই সম্মেলন সার্থক হয়েছে। জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সংগ্রামরত বাংলাদেশের জনগণের ন্যায্য সংগ্রামে এই সম্মেলনে একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। পরিশেষে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আইনসঙ্গত, ন্যায্য সংগ্রাম ও তাঁদের বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মেলনের পক্ষ থেকে ‘ল্যামব্রাকীস’ পদক উপহার দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ব এটাও বুঝতে পেরেছে যে বাংলাদেশে এই বিস্ফোরক পরিস্থিতির সমাধান না হলে সমগ্র বিশ্বে এর বিস্ফোরণ ছড়িয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার শাসনের অবসান ঘটবে। বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানীরা নির্মূল হবে এবং তাদের ধবংসস্তূপের ওপর একটি নতুন জাতির অভ্যুত্থান ঘটবে- এই মূল সত্যটি বিশ্ববাসী আজ উপলব্ধি করেছেন।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com