১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রেকর্ডের মালায় ভরপুর সাকিব

রেকর্ডের মালায় ভরপুর সাকিব

মিথুন আশরাফ ॥ বিশ্বকাপে এবার নিজেকে অন্যরূপেই হাজির করছেন বিশ্বসেরা ওয়ানডে অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। রেকর্ডের মালাতেও ডুবছেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩২২ রানের টার্গেটে খেলতে নেমে ৫১ বল বাকি থাকতে ৭ উইকেটে জেতার দিনেও সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। ৯৯ বলে ১৬ চারে অপরাজিত ১২৪ রান করে ম্যাচের নায়কও সাকিব। টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরিও করে দেখালেন। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি রান এখন সাকিবেরই। ৪ ম্যাচে ১২৮.০০ গড়ে সোমবার পর্যন্ত ৩৮৪ রান করেছেন। তার অসাধারণ ইনিংসে বাংলাদেশও বিশ্বকাপে পয়েন্ট তালিকার পঞ্চম স্থানে উঠেছে।

সাকিব যেন এমন একটি টুর্নামেন্টের জন্যই অপেক্ষায় ছিলেন। যেখানে নিজে যে সেরা, তা প্রমাণ করা যাবে। সাকিব যে কত বড় মাপের ক্রিকেটার তা প্রমাণও করছেন। সেমিফাইনালের স্বপ্ন লালন করে রাখতে হলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জিততেই হতো। সাকিবের সেঞ্চুরিতে সেই জয় মিললও। বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপে টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি ছিল মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের। গত বিশ্বকাপেই করেছিলেন মাহমুদুল্লাহ। সাকিবও করে দেখালেন।

বিশ্বকাপে টানা দুই সেঞ্চুরি খুব বেশি ক্রিকেটারের নেই। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ব্যাটসম্যান মার্ক ওয়াহ, রিকি পন্টিং (দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে), ম্যাথু হেইডেন, রিকি পন্টিং, পাকিস্তানের সাঈদ আনোয়ার, ভারতের রাহুল দ্রাবিড় ও শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা (টানা চারটি সেঞ্চুরি), বাংলাদেশের মাহমুদুল্লাহই টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন। এবার সাকিবও সেই তালিকায় নাম লেখালেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৮৩ বলে সেঞ্চুরি করেছেন সাকিব। এ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি এটি। বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপে দ্রুততম সেঞ্চুরিও। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আগের ম্যাচেই যে ৯৫ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন, এবার তা ভেঙ্গে দেন। সেই সঙ্গে ইংল্যান্ডের জো রুট ও রোহিত শর্মা সমান দুই সেঞ্চুরিতে সর্বোচ্চ রানও করেছেন। বিশ্বকাপে এখনও বাংলাদেশ আরও চারটি ম্যাচ খেলবে। এক বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান এর আগে ছিল মাহমুদুল্লাহর (৩৬৫)। সাকিব পেছনে ফেলে দিয়েছেন মাহমুদুল্লাহকে।

ওয়ানডেতে ছয় হাজার রানও করে ফেলেছেন সাকিব। তামিম ইকবালের পর দেশের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ৬ হাজার রান করেন সাকিব। এখন সাকিবের রান ১৯০ ইনিংসে ৩৭.৪২ গড়ে ৬১০১ রান। আছে ১৯৯ ইনিংসে বল করে ২৫৪ উইকেটও। ৬ হাজার রান ও ২৫০ উইকেটের মাইলফলকে পা দেন সাকিব। তাতে দ্রুততম ক্রিকেটার হিসেবে এই রেকর্ডও গড়েন। এর আগে শহীদ আফ্রিদি সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে, ২৯৪ ইনিংস খেলে এই রেকর্ডে সবার ওপরে ছিলেন। তারপরই ছিলেন জ্যাক ক্যালিস (২৯৬ ইনিংস) ও সনাথ জয়সুরিয়া (৩০৪ ইনিংস)। আফ্রিদি, ক্যালিস ও জয়সুরিয়াকে পেছনে ফেলে দেন সাকিব। রেকর্ডটি নিজের করে নেন।

বিশ্বকাপে দলের প্রথম চার ইনিংসেই ৫০ উর্ধ ইনিংস খেলা মাত্র চতুর্থ ক্রিকেটার হয়ে গেছেন সাকিব। এর আগে ১৯৮৭ বিশ্বকাপে নভজোত সিং সিধু, ১৯৯৬ বিশ্বকাপে শচীন টেন্ডুলকর ও ২০০৭ বিশ্বকাপে গ্রায়েম স্মিথ প্রথম চার ম্যাচেই পঞ্চাশের বেশি রান করেছিলেন। সাকিব যে ১৯০ ইনিংস খেলে ৬ হাজার রানের মাইলফলকে পা রাখেন, সেটি করতে বীরেন্দর শেবাগ ও শিবনারায়ণ চন্দরপলেরও সমান ইনিংস খেলতে হয়েছিল। কুমার সাঙ্গাকারা, অরবিন্দ ডি সিলভা, যুবরাজ সিংয়েরতো লেগেছিল আরও বেশি ইনিংস। ওয়ানডেতে ২৫০ উইকেট নিয়ে ফেলেছেন সাকিব। মাত্র ১৯৯ ম্যাচে বোলিং করে ২৫০ উইকেট নিয়েছেন যা এরচেয়ে কম ম্যাচ খেলে চামিন্দা ভাস ও কপিল দেবও করতে পারেননি।

সাকিবের এমন ইনিংসে বাংলাদেশ নিজেদের ইতিহাসের রেকর্ড রান টার্গেট অতিক্রম করে জিতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচটিতে সাকিবকে দুর্দান্ত সঙ্গ দেন লিটন কুমার দাস। সাকিব আগে পাঁচ নম্বর পজিশনে খেলতেন। এখন সাকিব তিন নম্বর পজিশনে খেলেন। তাতে সফল তিনি। লিটন পাঁচ নম্বরে খেলতে নেমে দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে সাকিবকে সঙ্গ দেন। অপরাজিত ৯৪ রান করেন লিটন। লিটন যখন ব্যাট হাতে নামেন তখন বাংলাদেশের ১৯ ওভারে ৩ উইকেটে ১৩৩ রান ছিল। সেখান থেকে লিটন ও সাকিব ১৮৯ রানের জুটি বেঁধে বাংলাদেশকে জয় এনে দেন। এবার বিশ্বকাপে এটিই সর্বোচ্চ রানের জুটি। এর আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার এ্যারন ফিঞ্চ ও স্টিভেন স্মিথের ১৭৩ রানের জুটিই ছিল এই বিশ্বকাপের সেরা জুটি। সোমবার সাকিব ও লিটন জুটি ছাড়িয়ে গেলেন তাদের। এছাড়া এটি চলতি বিশ্বকাপে চতুর্থ উইকেট জুটিতেও সর্বোচ্চ রান।

ক্যারিয়ারে দ্রুততম ১০০০ রানের মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন সাকিব। ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট হারারেতে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে অভিষেক হয়েছিল সাকিবের। ক্যারিয়ারের প্রথম ১০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করতে সাকিবকে খেলতে হয় ৩৮ ইনিংস। ২০০৮ সালের ১২ মার্চ ঢাকায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচে তিনি এই মাইলফলক স্পর্শ করেন। ১০০১ রান থেকে ২০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করতে সাকিব খেলেন ৩১ ইনিংস। জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ২০০৯ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি এই মাইলফলক স্পর্শ করেন। ২০০১-৩০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করতে সাকিবকে খেলতে হয় ৩৬ ইনিংস। ২০১১ সালের ৯ এপ্রিল ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তিনি এই মাইলফলক স্পর্শ করেন। ৩০০১-৪০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করতে সাকিবকে খেলতে হয় ৩১ ইনিংস। ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একাদশ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ক্যানবেরাতে তিনি এই মাইলফলক স্পর্শ করেন। ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর কিম্বারলিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে তিনি স্পর্শ করেন ৫ হাজার রানের মাইলফলক। এই মাইলফলক স্পর্শ করতে সাকিব খেলেন ৩২ ইনিংস। ২০১৯ সালের ১৭ জুন দ্বাদশ বিশ্বকাপের ২৩তম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সাকিব স্পর্শ করেন ৬ হাজার রানের ল্যান্ডমার্ক। এই মাইলফলক স্পর্শ করতে সাকিব খেলেন মাত্র ২২টি ইনিংস। বাংলাদেশের পক্ষে বর্তমান সর্বোচ্চ ব্যাটিং গড়ও সাকিবের। বাংলাদেশের হয়ে খেলা বর্তমান খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যাটিং গড় সাকিবের। ২০২ ম্যাচে ৩৭.৪২ গড়ে তার মোট রান এখন ৬১০১। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন তামিম ইকবাল। ৩৬.০৫ গড়ে ১৯৭ ম্যাচে ৬৭৪৩ রান সংগ্রহ করেছেন এই মারকুটে ওপেনার।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষায় পড়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই পথ সহজভাবে পাড়ি দেয়া গেছে। সাকিব ও লিটনের জন্যই তা সম্ভব হয়েছে। সাকিব যে ইনিংসটি খেলেছেন তা নিঃসন্দেহে সেরা ইনিংস। এর আগে ২০০৭ সাল থেকে বিশ্বকাপ খেলে একবারও সেঞ্চুরি করতে পারেননি। এবার দুটি ম্যাচে সেঞ্চুরি করলেন সাকিব। বল হাতেও নিয়েছেন ৫ উইকেট। দুই ম্যাচে আবার ম্যাচসেরাও হয়েছেন। বাংলাদেশের কোন অলরাউন্ডার বিশ্বকাপে দুই ম্যাচে ম্যাচসেরা হতে পারেননি। সাকিব হয়েছেন।

নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ জেতার জন্যই নামেন সাকিব। জিতছেনও। সাকিব বললেন, ‘আসলে যুদ্ধটা হয় নিজের সঙ্গে নিজের। তাতে ভেতরে ভেতরে হেরে গেলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। যদিও মন থেকে নিজেকে বলেন যে ‘আমি জিতছি, আমি জিতছি’ তাহলে সম্ভব। হয়তো সবসময় হবে না। তবে বেশিরভাগ সময়ই হবে।’

ব্যাটিংয়ে ক্যারিয়ারে নিজের সেরা সময় পার করছেন বলেই মনে করছেন ওয়ানডেতে নবম সেঞ্চুরি করা সাকিব। জানিয়েছেন, ‘রানের দিক থেকে চিন্তা করলে আমার তো মনে হয় সেরাই। এর আগেও হয়তো ভাল অবস্থায় কখনও কখনও ছিলাম। তবে ভাল অবস্থায় থেকেও সবসময় রান করা যায় না। এখন খুব ভাল যাচ্ছে, সেটিই ধরে রাখতে চাই।’ হাতে যে কয়েকটি ম্যাচ আছে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখলে তো সাঙ্গাকারার পর দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে দেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে টানা তিন ম্যাচে তিন সেঞ্চুরির রেকর্ডটিও সাকিবের দখলে চলে যাবে। রেকর্ডের মালায় ডুবছেন সাকিব। গলায় মালা আরও বাড়বে।